সবিশেষ

জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে বুদ্ধদেব বসু

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫০ পিএম

ত্রিশের কবিদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশই একমাত্র কবি যাকে প্রথম জীবনে অনেক ধকল সহ্য করতে হয়েছে সম্পূর্ণ নতুন ভাষায়, নতুন আঙ্গিকে এবং আধুনিকতাবাদী চিন্তা-চেতনায় নতুন কবিতা লেখার জন্যে। যখন তার কবিতাকে অনেকেই কবিতা বলেই মনে করেনি কিংবা চিনতে পারেনি, বা চিনতে চায়নি একমাত্র বুদ্ধদেব বসুই বুঝেছিলেন বাংলা কবিতায় এক নতুন কবির আগমন ঘটেছে এবং তিনিই সর্বপ্রথম সবাইকে জানিয়ে দিলেন, জীবনানন্দ দাশ ‘খাঁটি আধুনিক’ কবি।

১৯৩৬ সালে ধূসর পাণ্ডুলিপি প্রকাশিত হলে বুদ্ধদেব বসু লিখলেন : 
জীবনানন্দ দাশকে আমি আধুনিক যুগের একজন প্রধান কবি বলে মনে করি, এবং “ধূসর পাণ্ডুলিপি” তার প্রথম পরিণত গ্রন্থ। আমাদের দেশে সাহিত্য সমালোচনার আদর্শ এখনো অত্যন্ত শিথিল; প্রতিভা হয় অবজ্ঞাত, তৃতীয় শ্রেণীর কবি অভিনন্দিত হয় অ-সাহিত্যিক কারণে; আমাদের মূল্যজ্ঞানহীন মূঢ়তাকে মাঝে মাঝে নাড়া দেওয়া দরকার। আমাদের মাতৃভাষায় সাহিত্যকে যাঁরা শ্রদ্ধা ক’রে ভালোবাসেন (আশা করি তেমন লোকের সংখ্যা দিন দিনই বাড়ছে), তাঁরা “ধূসর পাণ্ডুলিপি” নিজের গরজেই পড়বেন, কারণ এই বইয়ের পাতা খুললে তাঁরা এমন একজনের পরিচয় পাবেন যিনি প্রকৃতই কবি, এবং প্রকৃত অর্থে নতুন। (কবিতা, চৈত্র ১৩৪৩)

জীবনানন্দের ঝরা পালক প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৭ সালে। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ধূসর পাণ্ডুলিপি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৬ সালে। প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের তেমন প্রশংসা না পাওয়ায় কবি মাঝখানে অনেক সময় নিয়ে বারবার কাটাকুটি, ঘষামাজা করে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। এই বইয়ের কবিতাগুলোয় যে জীবনান্দের স্বকীয়তা ফুটে উঠেছে, তা আমরা সবাই জানি। এই কাব্যগ্রন্থ তিনি বুদ্ধদেব বসুকে উসর্গ করেছিলেন। ধূসর পাণ্ডুলিপি প্রকাশের ক্ষেত্রে বুদ্ধদেব বসু সব দায়িত্বই নিয়েছিলেন। এমনকি এই বই প্রকাশের পর তিনি নিজেই আলোচনা করেছিলেন। ১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথও বইটি পড়ে প্রশংসা করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন—‘তোমার কবিতাগুলো পড়ে খুশি হয়েছি। তোমার লেখায় রস আছে, স্বকীয়তা আছে এবং তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে’। রবীন্দ্রনাথের এই দুটো লাইনের গুরুত্ব যে অপরিসীম তা বলাই বাহুল্য। এই লাইনের মধ্যেই রয়েছে জীবনানন্দের কবিতার নিবিড় অবলোকন। এই মূল্যায়ন জীবনানন্দের জন্য কবি হিসেবে অনেক বড় প্রাপ্তি ছিল।

এ কথা সবারই জানা যে, বুদ্ধদের বসুর আগে তাকে নিয়ে বা তার কবিতা নিয়ে কেউ কোনো প্রশংসার বাণী তো দূরের কথা, তার সহকর্মীরা পর্যন্ত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে। এ সবের কারণ হলো, তিনি ছিলেন দূরবর্তী সময়ের সচেতন কবিব্যক্তিত্ব। তার কালের সেই জনপ্রিয় কবি-পুরোহিতদের কেউ কেউ কবেই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছেন, বেঁচে আছেন তিনি, আজও, সাবলীল অহংকারে, কবিতার বরপুত্র হিসেবে। বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দের কবিতা নিয়ে খুবই উচ্ছ্বসিত ছিলেন। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত জীবনানন্দ দাশকে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য কবি মনে করেননি। এমনকি তার কবিতা তিনি ‘পরিচয়’ পত্রিকায় না ছেপে ফিরিয়েও দিয়েছেন। অন্যদিকে বুদ্ধদেব বসু তার কবিতা শুধু ছাপেনইনি, তার কবিতার মৌলিক ও ব্যতিক্রম প্রয়াসকে তিনি চিহ্নিত করে দেখিয়ে দিলেন জীবনানন্দ দাশ সত্যিকারের আধুনিক কবি ‘খাঁটি বাঙালি কবি’। জীবনানন্দ দাশের কবিতার প্রতি, মানুষ জীবনানন্দের প্রতি তার যে ভালোবাসার একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল, তা আমরা তার এই মন্তব্য থেকে বুঝে নিতে পারি :
... এই রকম আক্রমণের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যে ছিলেন জীবনানন্দ, তাতে আমার যেমন উত্তেজনা হতো নিজের বিষয়ে মন্তব্য পড়েও তেমন হতো না; যেহেতু তার কবিতা আমি অত্যন্ত ভালোবেসেছিলুম, আর যেহেতু তিনি নিজে ছিলেন সব অর্থে সুদূর, কবিতা ছাড়া সব ক্ষেত্রে নিঃশব্দ, তাই আমার মনে হতো তার বিষয়ে বিরুদ্ধতার প্রতিরোধ করা বিশেষভাবে আমার কর্তব্য। (জীবনানন্দ দাশ, কবিতা, পৌষ ১৩৬১)

কবি জীবনানন্দ দাশের ‘আকাশলীনা’ নামের একটি কবিতা আছে যার ভাষিক আয়োজন অত্যন্ত পরিচিত এবং স্বচ্ছতায় উন্মুখর হওয়া সত্ত্বেও কবিতাটির মধ্যে অনেকখানিই না-বোঝার ব্যাপার রয়ে যায়, কিন্তু তা আমাদের কবিতার রসাস্বাদনের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় না।
সুরঞ্জনা, ওইখানে যেওনাকো তুমি,
বোলোনাকো কথা ওই যুবকের সাথে;
ফিরে এসো সুরঞ্জনা:
নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে;
... ...
(আকাশলীনা)

এ প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বসুর বক্তব্য :
ষোল লাইনের এই কবিতাটি পড়ে আমরা ঠিক বুঝতে পারি না, এর নায়িকা মৃতা না বিশ্বাসঘাতিনী না কি কবিরই অপগত যৌবনের বেদনা এতে ধ্বনিত হচ্ছে—তা বোঝার প্রয়োজনও করেও না; কেননা ঐ ফিরে এসো আহ্বানের মধ্যেই অভাবের শুদ্ধ বেদনা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। (বুদ্ধদেব বসু অনূদিত কালিদাসের মেঘদূত-এর ভূমিকা, সংস্করণ ১৯, কলিকাতা পৃ. ৫১)।

উক্ত ভূমিকায় তিনি আরও বলেছেন :
কবিতার কাছে আমাদের গভীরতম আকাঙ্ক্ষা এই যে তার একটি অংশ হবে অন্ধকার—obscure—যাকে আমরা কখনো বুঝে উঠতে পারব না বলেই যাতে আমাদের আনন্দ কখনো নিঃশেষ হবে না। (ঐ পৃ: ৬৮)। 

আধুনিক বাংলা কবিতার ভূমিকায় বুদ্ধদেব বসু আধুনিক কবিতার চারিত্র্যলক্ষণ আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন :
‘আশা আর নৈরাশ্য, অন্তর্মুখিতা বা বহির্মুখিতা, সামাজিক জীবনের সংগ্রাম আর আত্মিক জীবনের তৃষ্ণা, এই সবগুলো ধারাই খুঁজে পাওয়া যাবে শুধু ভিন্ন কবিতে নয়, কখনো হয়তো বিভিন্ন সময়ে একই কবির রচনায়। জীবনানন্দ দাশ সেই কবি যাঁর কবিতায় এইসব অনুষঙ্গের সন্ধান মেলে সময়ের ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে।’

জীবনানন্দ দাশকে যতটা না মেধায় তার চেয়ে বেশি বোধের উচ্চমাত্রার এক গভীর ভাবুক হিসেবে ভাবা যায়। এক ‘বিপন্ন বিস্ময়’ তার মনোজগতের আলো-অন্ধকারের স্বরূপকে যেমন চিহ্নিত করে, তেমনি তার বোধের অন্যরকম বিস্তৃতি তার কবিতার বহুমাত্রিক দিকবলয়ের স্মারক হিসেবে আমাদের কাছে প্রতিভাত হয়। তার মৌলিকতা সেখানে, যেখানে তিনি তথাকথিত আধুনিকদের পশ্চিমী নির্ভরতার কাঠামো থেকে পরিশেষে বেরিয়ে এসে কবিতায় নিয়ে আসলেন এক মুক্ত আবেশ; দেখা গেল স্বদেশের, স্বমহিমার আলো ও বাতাস এবং কবিতার চেহারায় ফুটে উঠল এক সবিশেষ বাংলার মুখ। নির্জনতার মধ্যে অবগাহন করে তিনি খুঁজতেন কবিতার নিবিড় নীরব পথ। জীবনের অপরাপর বিষয়-আশয় তার কাছে তুচ্ছ বলে মনে হতো। বুদ্ধদেব বসু বলছেন :
‘...এই দূরত্ব তিনি শেষ পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন। তিন বা চার বছর আগে সন্ধ্যেবেলা লেকের দিকে তাঁকে বেড়াতে দেখতাম, আমি হয়তো পিছনে চলেছি, এগিয়ে গিয়ে কথা বললে তিনি খুশিও হতেন, অপ্রস্তুতও হতেন, আলাপ জমতো না, তাই আবার দেখতে পেলে আমি ইচ্ছে করে পিছিয়েও পড়েছি কখনো কখনো, তাঁর নির্জনতা ব্যাহত করিনি।’ (কালের পুতুল)।

তিনি যে বড় কবি, সে-ব্যাপারে কোনো সন্দেহই থাকে না যখন বুদ্ধদেব বসু বলেন :
‘এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে চলতিকালের কাব্যরচনার ধারাকে তিনি গভীরভাবে স্পর্শ করেছেন, সমকালীন ও পরবর্তী কবিদের উপর তার প্রভাব কোথাও-কোথাও এমন সূক্ষ্মভাবে সফল হয়ে উঠেছে যে বাইরে থেকে হঠাৎ দেখে চেনা যায় না।’ (কালের পুতুল)।

বুদ্ধদেব বসু তাকে ‘বাংলা কাব্যের ঐতিহ্য স্রোতের মধ্যে একটি মায়াবী দ্বীপের মতো’ মনে করেছেন যা ‘বিচ্ছিন্ন ও উজ্জ্বল’। সেই মায়াবী দ্বীপ আজ ফলে-ফুলে, গন্ধরস ছড়িয়ে আমাদের কাব্যপ্রেরণাকে যেমন উসকে দেয়, তেমনি আক্রান্তও করে। তার কবিতার রহস্যদ্যুতিতে আমরা চমকিত হই, ভেবে ভেবে অস্থির হই সেই রহস্য উদ্ঘাটনে। জীবনানন্দ যে তার কবিতার জন্য নিজস্ব ভাষা তৈরি করে নিয়েছেন—এমন মন্তব্য বুদ্ধদেব বসু অনেক আগেই করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর তিনি বললেন :
এ-কথা সত্য যে গম্ভীর ভাবের কবিতায় দেশজ ও বিদেশি শব্দের এমন স্বচ্ছন্দ, সংগত ও প্রচুর ব্যবহার জীবনানন্দর আগে অন্য কোনো বাঙালি কবি করেননি। (কবিতা, পৌষ, ১৩৬১)

১৯৬০ সালে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত মারা গেলে বুদ্ধদেব বসু তার কবিতার মূল্যায়ন করতে গিয়ে জীবনানন্দ দাশকেও পাশাপাশি এনেছিলেন। তিনি লিখলেন :
জীবনানন্দ ও সুধীন্দ্রনাথ : এই দুই নাম উচ্চারণ করা মাত্র আধুনিক বাংলা কবিতার দুই বিপরীত প্রান্ত ঘোষিত হয়ে গেল—যেন অনতিক্রম্য ব্যবধান।... এই দুইজন, পরস্পরের দিকে পিঠ ফিরিয়ে, স্থাপত্য-খোদিত অর্ধ-দেবতার মূর্তির মতো, আমাদের সমস্ত আধুনিক কবিতাকে দুই প্রান্তে ধারণ করে আছেন, তাঁদের দিকে তাকিয়ে আমরা নতুন করে গর্বিত হতে পারি বাংলা আমাদের মাতৃভাষা বলে, নতুন করে প্রণত হ’তে পারি ঈশ্বরের কাছে, যেহেতু মানুষের পাপ ক্ষালনের জন্য মানুষের মুখেই কবিতা তিনি দিয়েছেন। (সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, সঙ্গ : নিঃসঙ্গতা রবীন্দ্রনাথ-১৯৬৩)।

‘শিল্পীর স্বাধীনতা’ প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন :
আমি বলতে চাই যে, শিল্পী স্বভাবতই ব্রাত্য; কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ে ভর্তি হওয়া, কোনো সংঘবদ্ধ মতবাদ গ্রহণ করে সেই মতেই নৈষ্ঠিকতা বাঁচিয়ে চলা—এটা তার প্রকৃতির পক্ষে অনুকূল নয়। অন্য সমস্ত চিন্তার ধারা বর্জন করে তিনি যদি একান্তভাবে একটিমাত্র মতবাদে দীক্ষা নেন—সে-মতবাদের নিজস্ব মূল্য যা-ই হোক না—তাহলে তার দৃষ্টি ব্যাহত হবার, ব্যক্তি সংকুচিত হবার আশঙ্কা থাকে। তাহলে, খুব সম্ভব, তার অভিজ্ঞতাগুলোকে আপন প্রেরণায় সুস্থির এবং সুপক্ব হতে না-দিয়ে, তিনি তাদের কেটে-ছেঁটে শাস্ত্রের মাপে মিলিয়ে নিতে চাইবেন। ফলত, তার বাণীর লক্ষ্য হবে—সমগ্র মানবাত্মা নয়, নিদিষ্ট একটি গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়। শিল্পীর পক্ষে এর মানে বৈকল্য বা বিকৃতি। (সাহিত্যচর্চা, ১৯৯২ পৃ:১৪৪)

জীবনানন্দ দাশ ছিলেন সেই ব্রাত্য, যার কবিতা সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে সমগ্র মানবাত্মাকে ধারণ করেছে এবং তিনি মতবাদের খণ্ড আবহে আটকে থাকেননি, যদিও একটি বিশেষ সময়ে কমিউনিস্টদের খ্যাপামিতে একটি বিশেষ দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন যা বুদ্ধদেব বসু পছন্দ করেননি। মহাপৃথিবী প্রকাশের সময়ও বুদ্ধদেব খুব একটা খুশি হতে পারেননি। তিনি লিখেছেন :
“মহাপৃথিবী”র প্রথম কবিতা ‘বনলতা সেন’ এবং ‘এক পয়সায় একটি’ গ্রন্থমালার অন্তর্গত “বনলতা সেন”-এর সবগুলি কবিতাই এ-বইয়ে স্থান পেয়েছে। অথচ “বনলতা সেন” বইখানার প্রচার এখনো বন্ধ হয়নি, কাজেই জীবনানন্দর নতুন কবিতা পড়বার আশায় যারা “মহাপৃথিবী” খুলবেন তাঁরা রীতিমতো নিরাশ হবেন।... আমার মতে “ধূসর পাণ্ডুলিপি” প্রকাশের পর জীবনানন্দ যে-সব কবিতা লিখেছেন ও সাময়িক পত্রে ছাপিয়েছেন তার মধ্যে বিশিষ্টতম কবিতাগুলি নিয়ে “বনলতা সেন” গ্রথিত হয়েছিল। “মহাপৃথিবী”তে কোনো নতুন সুর লাগেনি; বস্তুত এ-বই ভিন্ন নামে “বনলতা সেন”-এরই পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ।

অতঃপর তিনি কিছুটা প্রসন্ন চিত্তে একটি কবিতা নিয়ে তাঁর মুগ্ধতার কথা ব্যক্ত করেছেন :
“বনলতা সেন”-এর কবিতাগুলি বাদ দিলে এ-বইয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কবিতা ‘আট বছর আগের একদিন’, যেটি প্রথম বেরিয়েছিল সাত বছর আগে  ‘কবিতা’য়, সে-সময়ে কবিতাটি পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম, সে-মুগ্ধতা আজো ফিকে হয়নি। (কবিতা, চৈত্র, ১৩৫১)।

মহাপৃথিবীর কবিতা নিয়ে বুদ্ধদেব বেশ কড়া স্বরে সমালোচনা করেছিলেন; এই সমালোচনায় কবিচিত্ত যে অস্থির হয়ে উঠেছিল, তা বলাই বাহুল্য। বুদ্ধদেব কখনোই পছন্দ করেননি জীবনানন্দর প্রতিভা সমাজ-ইতিহাস কিংবা রাজনীতির দোলাচলে ঘুরপাক খাক। জীবনানন্দের পরবর্তী পর্যায়ের কবিতাগুলো খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। কবিতা যে কেবল একজন বিশেষ মানুষের পছন্দের ব্যাপার নয়, তা জীবনানন্দের কবিতা প্রসঙ্গে যেমন, অন্য কবির কবিতার ক্ষেত্রেও তেমনই সত্য। ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত An acre of  Green Grass: A Review of Modern Bengali Literature গ্রন্থে বুদ্ধদেব বসু লিখলেন :
He is important because he has brought a new note in our poetry, a new tone of feeling, and has turned out ears to a subtlemelody drawn from apparently conventional patterns of verse, for despite the material seductions of Modern Bengali, he has confined himself throughoutto a single metrical norm, and that the oldest. (Modern Bengali poetry).

বুদ্ধদেব বসু আধুনিক বাংলা কবিতা সংকলনে মহাপৃথিবী পরবর্তী কয়েকটি কবিতা নির্বাচন করেছিলেন। কারণ সেই কবিতাগুলোর প্রতি তার দুর্বলতা ছিল। জীবনানন্দ দাশ সাময়িকভাবে হয়তো ‘রাজনৈতিক ও সামাজিক জটিলতার বাস্তব বিশ্বে বসবাস করা শুরু করেছিলেন নানা বাস্তবতার চাপে, বিশেষ করে বামপন্থিদের পুনঃপুন সমালোচনায়। কিন্তু এ-ও সত্যি যে এতে তার লাভ হয়েছিল, তার পরবর্তী কবিতার সুতোগুলো আরও শক্ত হয়েছিল। বুদ্ধদেব বসু জোর দিয়ে সে-কথা না বললেও তিনি তা যে অনুধাবন করেননি, সে-কথা আমরা কীভাবে বলি। বরং জীবনানন্দের ‘কালচেতনা’ তাকে মহাকালের দিকে ধাবিত করেছে, কালোত্তীর্ণ কবিতা লেখার বিস্তীর্ণ প্রান্তরে দাঁড় করিয়েছে জীবনের শেষ প্রান্তের দিনগুলোতেও। আর যে কথা না বললেই নয়, তা হলো, বুদ্ধদেবের সে সময়ের মূল্যায়ন জীবনানন্দ দাশকে কবি হিসেবে বৃহত্তর পাঠক সমাজে পরিচিত করিয়েছিল। তিনি কবিতার যে নতুন পথে পা বাড়িয়েছিলেন, তা গড় কবিতা-পাঠকদের কাছে ছিল অনেকখানিই অচেনা। বুদ্ধদেবের মূল্যায়ন ছাড়া কবি হিসেবে স্বীকৃতি পেতে জীবনানন্দ দাশকে হয়তো আরও অনেককাল অপেক্ষা করতে হতো।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত