ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্যে বিব্রত সরকার

‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্যের পর পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকিরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। সোমবার এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ‘ক্রসফায়ার’। একই অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও তিনি আপত্তিকর মন্তব্য করেন। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে শুধু প্রতিবাদ নয়, সরকারের ভেতরেও শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।

গতকাল একটি গণমাধ্যমকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘সরকার তো ক্রসফায়ার চায় না; বরং সরকার ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স।’ আইজিপি অসতর্কতাবশত এমন কথা বলেছেন উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা ঠিক হয়নি, উচিত হয়নি। উনি (আইজিপি) সহজ-সরল মানুষ। আইনের কঠোর প্রয়োগের বিষয়ে বলতে গিয়ে অসতর্কতাবশত বলে ফেলেছেন।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হতে দেবে না, এ বিষয়ে সরকার অত্যন্ত কঠোর। আইনের শাসন সরকারের প্রধান লক্ষ্য এবং আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।’

এদিকে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলে আইজিপির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন এ কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সস্তা বাহবা ও ক্রেডিট নেওয়ার জন্য আইজিপির দেওয়া বক্তব্য দেশের ক্ষতি করবে এবং সরকারকে বিব্রত ও ভীত করবে। তবে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন আইজিপির বক্তব্যকে সমর্থন দিয়ে বলেছে, জননিরাপত্তার জন্য এটি সময়োপযোগী বক্তব্য।

কোনো গণতান্ত্রিক সরকার কখনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা গুমকে সমর্থন করতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, ‘জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার এ ধরনের বেআইনি পথ বেছে নেওয়াকে সমর্থন করে না। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই কেবল সাজা বা আইনিব্যবস্থা নিশ্চিত করে, কোনো বেআইনি হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে নয়।’ গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরে সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। ব্রিফিংয়ে তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ড. মো. আলম মোস্তফা উপস্থিত ছিলেন।

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘একটি সরকার যদি বিচারবহির্ভূতভাবে মানুষকে হত্যা করে, তবে রাষ্ট্র আর রাষ্ট্র থাকে না, মাস্তানে পরিণত হয়। অতীতে যারা এসব কাজে যুক্ত ছিল, রাষ্ট্রকে তারা মাস্তানে পরিণত করেছিল। বর্তমান সরকারের রাতের আঁধারে নির্বাচন করে ক্ষমতা ধরে রাখার কুমতলব নেই। তাই সরকার এমন কিছু করবে না, যাতে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়।’ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের উদ্দেশে তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘কাগজে-কলমে আদেশ হলেও কোনো বেআইনি নির্দেশ পালন করতে তারা বাধ্য নন।’

আইজিপির ক্রসফায়ার-সংক্রান্ত বক্তব্যের ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য কি না এবং এ জন্য তার জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, পুলিশ সদর দপ্তর পরবর্তী সময়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে। সেখানে আইজিপি তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন কেন এবং কী উদ্দেশ্যে তিনি কথাগুলো বলেছেন। তিনি অবশ্যই এমনটি বোঝাতে চাননি। সাংবাদিকদের নিয়ে আইজিপির বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে জাহেদ উর রহমান বলেন, এ ক্ষেত্রেও বক্তব্যটি সাধারণীকরণ করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে। এ বিষয়েও আইজিপির বক্তব্য রয়েছে। এ নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা কেটে যাওয়া উচিত। কারণ, আইজিপি এসব বক্তব্যের কোনোটিই নিজের অবস্থান হিসেবে ধরে রাখেননি, বরং সেখান থেকে সরে এসেছেন।

একপর্যায়ে সাংবাদিকরা ইশরাক হোসেনের ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, সেখানে দুঃখ প্রকাশের পরও জনচাপের মুখে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পদ থেকে সরে যেতে হয়েছে। অথচ আইজিপির ক্ষেত্রে সরকার তুলনামূলকভাবে নমনীয় অবস্থান নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, ঘটনাটি ঘটেছে মাত্র আগের দিন। আইজিপির ব্যাপারে যদি অন্য কোনো সিদ্ধান্ত থাকার প্রবণতা থাকে, প্রধানমন্ত্রী তো দেশে নেই। এটা উনি বিবেচনা করবেন, উনি কী করবেন। এ ব্যাপারে সরকারের ফাইনাল অবস্থান কী হবে? এটা নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিবেচনা করবেন এবং উনি উনার সফর শেষ করার পর হবে। কেউ যখন নিজের কোনো অবস্থানে অটল না থাকেন এবং বক্তব্য ঠিক হয়নি বলে মেনে নেন, তখন তার প্রতি বেশি কঠোর হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয়।

সরকারকে বিব্রত ও ভীত করবে রিজভী : বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সস্তা বাহবা ও ক্রেডিট নেওয়ার জন্য আইজিপির দেওয়া বক্তব্য দেশের ক্ষতি করবে এবং সরকারকে স্বস্তির বদলে বিব্রত ও ভীত করবে। পুলিশ বাহিনীতে অনেক সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা রয়েছেন, তাদের নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে দিলে সমাজ থেকে অপরাধ দূর করা সম্ভব।’ মঙ্গলবার দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ফ্রি চিকিৎসাসেবা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

জননিরাপত্তায় সময়োপযোগী পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন : আইজিপির বক্তব্যকে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের যথাযথ বাস্তবায়ন, অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তায় পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর সময়োপযোগী আহ্বান হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএসএ)। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এ কথা জানায় সংগঠনটি। এতে বলা হয়, ৫ আগস্ট-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে দেশের পরিবর্তিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মব কালচারের মধ্যে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের আইন প্রয়োগে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বক্তব্যটি প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের আলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। তাদের মতে, আইনের সীমার মধ্যে থেকে পরিস্থিতি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পুলিশ সদস্যদের পেশাগত আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিশ্চিত করাই ওই বক্তব্যের মূল তাৎপর্য।

প্রচলিত বিধিবিধানের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি মানবাধিকার, সাংবিধানিক অধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পুলিশ অঙ্গীকারবদ্ধ। পুলিশের আইনানুগ কঠোরতাকে নেতিবাচকভাবে দেখা এবং অপরাধ দমনে নিষ্ক্রিয়তাকে দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের ওপর ১৭৬টি হামলার ঘটনায় চারজন নিহত এবং ৩৭০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। এ পরিসংখ্যান পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা ও উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরে। পুলিশ সদস্যরা যাতে আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করে নির্ভয়ে, নিরপেক্ষভাবে এবং পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

আইনের শাসনের পরিপন্থী : ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। একই সঙ্গে বক্তব্যটি নিঃশর্তভাবে প্রত্যাহার এবং এ বিষয়ে আইজিপির প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। গতকাল দেওয়া এক বিবৃতিতে সুজনের চেয়ারপারসন বিচারপতি এম এ মতিন ও প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে ক্রসফায়ারের মতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কা তুলে ধরা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও অনভিপ্রেত। বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে থাকা একজন কর্মকর্তার এমন বক্তব্য আইনের শাসন, সাংবিধানিক অধিকার ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধার পরিপন্থী। এটি নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে।

‘দুঃসাহস কোথা থেকে আসে’ : জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন বলেছেন, একটি স্বাধীন দেশের পুলিশ প্রধান কীভাবে এমন বক্তব্য দেওয়ার দুঃসাহস দেখান? সরকার কি বিচারবহির্ভূত হত্যার অনুমতি দিতে পারে? আর সরকার অনুমতি দিলেই কি পুলিশ একজন নাগরিককে হত্যা করার অধিকার পেয়ে যায়? পুলিশের দায়িত্ব অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা, হত্যা করা নয়। সরকারও আইনের ঊর্ধ্বে নয়।