আমাদের জীবনে নানা কারণে দুশ্চিন্তা আসে। কোনো কিছুতেই মন শান্ত হয় না। চারপাশে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা কাজ করে। জমে থাকা কষ্ট, অপূর্ণতা ও অনিশ্চয়তা মনকে ভারী করে তোলে। এমন সময়ে মহান আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে পারলে তা প্রশান্তি ও আত্মশুদ্ধির পথ খুলে দেয়। রাতের নীরবতায় তাহাজ্জুদের নামাজে দাঁড়িয়ে বান্দা তার রবের কাছে নিজের মনের কথা বলতে পারে, ক্ষমা চাইতে পারে এবং জীবনের কল্যাণ প্রার্থনা করতে পারে।
তাহাজ্জুদ নফল নামাজ ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগে আদায় করতে হয়। এ নামাজের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করুন। এটি আপনার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত। আশা করা যায়, আপনার রব আপনাকে প্রশংসিত স্থানে প্রতিষ্ঠিত করবেন।’ (সুরা ইসরা ৭৯)
রাতের ইবাদতে আত্মনিয়োগকারী মুমিনদের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদের পার্শ্বদেশ শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের রবকে ডাকে ভয় ও আশা নিয়ে।’ (সুরা সাজদাহ ১৬)
আয়াতটি রাতের ইবাদতে মুমিনের আন্তরিকতা, আল্লাহর প্রতি ভয় এবং তার রহমত লাভের প্রত্যাশাকে তুলে ধরে। এ ছাড়া মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা রাতের সামান্য অংশই ঘুমিয়ে কাটাত। আর রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত।’ (সুরা জারিয়াত ১৭-১৮) এসব আয়াত রাতের ইবাদত, অনুতাপ ও আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।
রাতের নিস্তব্ধতায় সেজদায় অবনত হয়ে বান্দা যখন নিজের দুঃখ-কষ্ট, দুর্বলতা ও অপূর্ণতার কথা মহান আল্লাহর কাছে তুলে ধরে, তখন তার হৃদয়ে প্রশান্তি নেমে আসে। যে কষ্ট কারও কাছে প্রকাশ করা যায় না, তা মহান আল্লাহর কাছে খুব সহজেই বলা যায়।
বর্তমান সময়ে পড়াশোনা, কর্মজীবন, পারিবারিক দায়িত্ব ও নানা দুশ্চিন্তায় মানুষ ব্যস্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবিরাম ব্যস্ততা এবং অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করার প্রবণতাও অনেকের মানসিক অস্থিরতা বাড়িয়ে তোলে। এসবের ভিড়ে নিজের আত্মিক অবস্থার খোঁজ নেওয়ার সময়টুকুও হারিয়ে যায়। তাহাজ্জুদ আমাদের সেই আত্মিক জগতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।
জীবনের বৈধ প্রয়োজন, পরীক্ষায় সফলতা কিংবা পারিবারিক কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা যায়। কিন্তু এসব চাওয়ার ঊর্ধ্বে থাকা উচিত তার সন্তুষ্টি অর্জনের আকাক্সক্ষা। তাহাজ্জুদের প্রকৃত শিক্ষা হলো নিজের ভুল উপলব্ধি করা, গুনাহ থেকে ফিরে আসা এবং চরিত্র সংশোধনের চেষ্টা করা।
জীবনের সব সমস্যার সমাধান তাৎক্ষণিকভাবে মিলবে, এমন নিশ্চয়তা না থাকলেও তাহাজ্জুদ মানুষকে ধৈর্য, আত্মসমালোচনা এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরতার শিক্ষা দেয়। আমরা অনেক সময় নিজের কষ্ট আড়াল করি, দুর্বলতা লুকাই। অথচ আল্লাহর সামনে নিজের অসহায়ত্ব স্বীকার করতে কোনো সংকোচ নেই।
তাই জীবনের ব্যস্ততা, হতাশা কিংবা অস্থিরতার ভিড়ে রাতের কিছুটা সময় আল্লাহর জন্য রাখা হোক। প্রার্থনায় উঠে আসুক কৃতজ্ঞতা, অনুশোচনা, ক্ষমা প্রার্থনা ও কল্যাণের আকাক্সক্ষা।
লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়