একটি শিশু দেখতে খুব সুন্দর। কেউ তার প্রশংসা করলেন। এরপর শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ল। পরিবারের কেউ বললেন, বদনজর লেগেছে। আবার কারও ব্যবসা ভালো চলছিল। হঠাৎ বিক্রি কমে গেল। তখন অনেকে ভাবলেন, নিশ্চয়ই কারও নজর লেগেছে। আমাদের সমাজে এমন ধারণা বেশ প্রচলিত। কিন্তু বদনজর সম্পর্কে ইসলাম কী বলে? সত্যিই কি বদনজর লাগে? এর কোনো নির্দিষ্ট লক্ষণ আছে কি? বদনজর থেকে বাঁচার উপায় কী? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে ফিরে তাকাতে হবে কোরআন ও হাদিসের দিকে।
বদনজরের পরিচয় : ইসলামি পরিভাষায় বদনজরকে ‘আল-আইন’ বলা হয়। সাধারণভাবে কারও দৃষ্টির কারণে অন্য ব্যক্তির ক্ষতি হওয়ার বিষয়টিকে বদনজর বলা হয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বদনজরের প্রভাব বাস্তব।’ (সহিহ মুসলিম ২১৮৭)
তবে বদনজরে আক্রান্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত করার জন্য কোরআন ও সহিহ হাদিসে এমন কোনো নির্দিষ্ট লক্ষণ তালিকা নেই, যা দেখে নিশ্চিতভাবেই বলা যাবে, তিনি বদনজরের শিকার হয়েছেন।
হঠাৎ অসুস্থ হওয়া, শিশুর কান্নাকাটি, ঘুমের সমস্যা কিংবা ব্যবসায় লোকসান, এসবের কোনোটি বদনজরের কারণে হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। অন্য কোনো কারণেও হতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও বাস্তব কারণ অনুসন্ধান করতে হবে।
বদনজরের ঘটনা : বদনজর সম্পর্কে সাহাবিদের জীবনের একটি ঘটনা সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। সাহল ইবনে হুনাইফ (রা.) একবার গোসল করছিলেন। তার শরীর দেখে আমির ইবনে রাবিয়া (রা.) প্রশংসাসূচক মন্তব্য করে বলেন, তিনি এমন সুদর্শন সুপুরুষ কখনো দেখেননি। এরপর সাহল (রা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন।
ঘটনাটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জানানো হলে তিনি সাহল (রা.)-এর কাছে আসেন। বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন, তোমাদের কেউ কেন তার ভাইকে হত্যা করার মতো কাজ করে? তুমি বরকতের দোয়া করলে না কেন?
এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) বদনজরের প্রতিকার হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অজু করতে নির্দেশ দেন। সেই অজুর পানি সাহল (রা.)-এর শরীরে ঢালার পর তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ ৩৫০৯)
ঘটনাটি থেকে বোঝা যায়, অন্যের ভালো কিছু দেখে প্রশংসা করার সময় তার জন্য বরকতের দোয়া করা উচিত। তবে শুধু প্রশংসার পর কেউ অসুস্থ হলেই তাকে নিশ্চিত বদনজরের শিকার বলা যাবে না।
কোরআন ও হাদিসের বর্ণনা : সুরা ফালাকের পঞ্চম আয়াতে হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়ার বিষয়টি এসেছে। সহিহ মুসলিমের হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বদনজরের প্রভাব বাস্তব বলে উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বদনজরের ক্ষেত্রে রুকইয়াহ (ঝাড়ফুঁক) করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। (সহিহ বুখারি ৫৭৩৮)
প্রশংসায় বদনজর : কারও সৌন্দর্য, সন্তান, সম্পদ বা সাফল্যের প্রশংসা করলেই বদনজর লাগে, এমন কথা বলা যায় না। সামাজিক মাধ্যমে কারও ছবি দেখে প্রশংসা করলেও একই কথা প্রযোজ্য। তবে অন্যের ভালো কিছু দেখে তার জন্য বরকতের দোয়া করা উত্তম। যেমন বলা যায়, ‘আল্লাহ বরকত দিন।’ সাহল ইবনে হুনাইফ (রা.)-এর ঘটনাতেও রাসুলুল্লাহ (সা.) বরকতের দোয়া করার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
বদনজর থেকে বাঁচতে করণীয় : বদনজর থেকে সুরক্ষা চাওয়ার জন্য কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত আমল করা যায়। তিন কুল অর্থাৎ সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়–ন। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস পড়ে দুই হাতে ফুঁ দিতেন। এরপর শরীরের যতটুকু সম্ভব হাত বুলিয়ে নিতেন। (সহিহ বুখারি ৫৭৪৮) পাশাপাশি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে, দোয়া করতে হবে এবং অন্যের প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে বদনজর থেকে রক্ষার জন্য একটি দোয়া পড়তেন। দোয়াটি হলো, ‘আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি, মিন কুল্লি শাইতানিও ওয়া হাম্মাহ, ওয়া মিন কুল্লি আইনিল লাম্মাহ।’ অর্থাৎ আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালেমার দ্বারা প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং প্রত্যেক কুদৃষ্টির অনিষ্ট থেকে পানাহ চাচ্ছি। (সহিহ বুখারি ৩৩৭১)
বদনজর লাগলে যা করবেন : বদনজরের ক্ষেত্রে রুকইয়াহ করার নির্দেশ সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে এসেছে। রুকইয়াহ বলতে কোরআনের আয়াত ও শরিয়তসম্মত দোয়া পড়ে আল্লাহর কাছে আরোগ্য চাওয়াকে বোঝানো হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে বদনজরের ঘটনায় অজুর পানি ব্যবহারের নির্দেশও বর্ণিত হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, প্রতিটি অসুস্থতার ক্ষেত্রে কাউকে সন্দেহ করে তার অজুর পানি সংগ্রহ করতে হবে। কাউকে বদনজরের জন্য দায়ী করার আগে সতর্ক থাকা জরুরি। প্রমাণ ছাড়া কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করা উচিত নয়। অসুস্থ হলে চিকিৎসকের পরামর্শও নিতে হবে।
শিশুর কপালে কালো টিপ : অনেক পরিবার শিশুর কপালে কালো টিপ দেয়। তাদের ধারণা, এতে বদনজর থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। কিন্তু কালো টিপ দিলেই বদনজর কেটে যায়, এমন দাবির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। বদনজর থেকে সুরক্ষা চাওয়ার ক্ষেত্রে কোরআন তেলাওয়াত, দোয়া ও শরিয়তসম্মত রুকইয়াহর ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
বদনজর ও জাদু : বদনজর ও জাদু এক নয়। হাদিসে বদনজরের প্রভাব স্বীকৃত হয়েছে। অন্যদিকে সুরা ফালাকের চতুর্থ আয়াতে গ্রন্থিতে ফুঁ দেওয়া (জাদুকর) ব্যক্তিদের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়ার বিষয়টি এসেছে।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে বদনজর ও জাদুর অনিষ্ট থেকে বাঁচার তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : ধর্মীয় নিবন্ধকার