রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর ইউরোপের বাণিজ্যপথগুলো ভেঙে পড়ে, শহরগুলো ছোট হয়ে আসে এবং অর্থনীতিও ক্রমে গুটিয়ে যায়। এই অস্থির সময়ে দুনিয়ার দুই মহাশক্তি ছিল বাইজান্টাইন ও পারস্য। তাদের মাঝখানে আরব উপদ্বীপ ছিল বাণিজ্যের এক নীরব সেতু। আর সেই সেতুর কেন্দ্রে ছিল মক্কা। সেখানে বাইজান্টাইন স্বর্ণমুদ্রা দিনার এবং পারসিক রৌপ্যমুদ্রা দিরহাম হাতবদল হতো। কাফেলা যেত সিরিয়া থেকে ইয়েমেন। কিন্তু তখনো ব্যাংক নামের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না।
তাই মানুষের সামনে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন ছিল। সঞ্চয় নিরাপদে রাখা যায় কোথায়? ব্যবসার পুঁজি খাটানো যায় কীভাবে? আর এক শহর থেকে আরেক শহরে অর্থ পাঠানো যায় কেমন করে? আজকের ভাষায় এগুলোই ব্যাংকিংয়ের তিনটি মৌলিক কাজ তথা জমা, বিনিয়োগ ও অর্থ স্থানান্তর।
মক্কার বাজারে এই প্রয়োজন মেটানোর তিনটি পথ চালু ছিল। কেউ বিশ্বস্ত কারও কাছে অর্থ আমানত হিসেবে রাখত। কেউ অন্যের ব্যবসায় পুঁজি দিয়ে লাভের অংশীদার হতো, যা আজকের ভাষায় প্রফিট-শেয়ারিং। আর কেউ সুদে ঋণ দিত। ইসলাম প্রথম দুটি পথ গ্রহণ করেছে। আর তৃতীয়টি নিষিদ্ধ করেছে। কারণ সুদের বোঝা পড়ত দুর্বল ঋণগ্রহীতার কাঁধে, অথচ ব্যবসার ঝুঁকি বহন করত না পুঁজির মালিক। এখান থেকেই ইসলামি অর্থনীতির মূলনীতি গড়ে উঠেছে, লাভ ও ঝুঁকির ন্যায্য ভাগাভাগি।
কোরআন সুদ পরিত্যাগের নির্দেশ দিয়ে বলেছে, ‘হে ইমানদাররা! আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে তা পরিত্যাগ করো, যদি তোমরা ইমানদার হও।’ (সুরা বাকারা ২৭৮)
এই ব্যবস্থার প্রথম ভিত্তি ছিল আস্থা। আর আস্থার সবচেয়ে বড় প্রতীক ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। তার উপাধি ছিল আল-আমিন তথা বিশ্বাসী। মানুষ নির্ভাবনায় তার কাছে সম্পদ আমানত রেখে যেত। হিজরতের রাতেও শত্রুদের গচ্ছিত সম্পদ তার কাছে ছিল। তিনি আলী (রা)-কে দায়িত্ব দিয়ে গেলেন, যাতে সবার আমানত মালিকদের কাছে ফেরত দেওয়া হয়। ইবনে হিশামের বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.) আলী (রা)-কে মক্কায় কিছুদিন অবস্থান করে মানুষের আমানত ফেরত দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ)
আধুনিক ব্যাংকের টিকে থাকা যে বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নির্ভর করে, এখানে তারই প্রথম পাঠ পাওয়া যায়। কোরআন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্রের প্রশংসা করে বলেছে, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত।’ (সুরা কলম ৪)
আমানত থেকে এবার বিনিয়োগের দিকে আসা যাক। খাদিজা (রা.) পুঁজি দিলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ব্যবসা পরিচালনা করলেন। লাভ হলে দুজনে তা ভাগ করে নিলেন। লোকসান হলে পুঁজির ক্ষতি বহন করেন পুঁজিমালিক, আর এতে ব্যবসায়ীর পরিশ্রম বৃথা যায়। এই চুক্তির নাম মুদারাবা। ইবনে হিশামের বর্ণনা অনুযায়ী, খাদিজা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সততা ও আমানতদারিতার কথা শুনে তাকে নিজ পণ্যসহ সিরিয়ায় বাণিজ্যের জন্য পাঠান এবং লাভের নির্দিষ্ট অংশ দেনন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ)
আজকের ইসলামি ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ কাঠামো মূলত এই মুদারাবা নীতির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে ব্যাংক শুধু ঋণদাতা নয়, বরং ব্যবসার অংশীদার। ফলে লাভ ও ক্ষতি উভয় পক্ষের মধ্যে ন্যায়সঙ্গতভাবে বণ্টিত হয়।
তখন ব্যক্তিগত লেনদেনের পাশাপাশি রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও ছিল। বাইতুল মাল ছিল রাষ্ট্রীয় কোষাগার, আজকের ভাষায় পাবলিক ট্রেজারি, এটা কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক নয়। ধনীদের কাছ থেকে আদায়কৃত জাকাত, ওশর ও দান সেখান থেকে অভাবীদের কাছে পৌঁছাত। অর্থাৎ সম্পদ পুনর্বণ্টনের একটি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা তখনই গড়ে উঠেছিল।
ব্যাংকিংয়ের কারিগরি বুদ্ধিমত্তার একটি চমৎকার উদাহরণ পাওয়া যায় সাহাবি যুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা)-এর কাজে। মানুষ তার কাছে অর্থ রেখে যেতে চাইলে তিনি তা আমানত হিসেবে না নিয়ে কর্জ বা ঋণ হিসেবে গ্রহণ করতেন। সহিহ বুখারিতে এসেছে, কেউ অর্থ নিয়ে এসে আমানত হিসেবে রেখে গেলে যুবায়ের (রা) বলতেন, ‘না, বরং এটি আমার কাছে কর্জ হিসেবে থাকবে। কারণ আমি এটি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করি।’ (সহিহ বুখারি ৩১২৯) অর্থাৎ ঋণ খোয়া গেলে ক্ষতিপূরণ পাবে, আর আমানত খোয়া গেলে তুমি ক্ষতিপূরণ পাবে না।
এতে দুটি সুবিধা ছিল। প্রথমত, আমানতের অর্থ ব্যবহারের অধিকার গ্রহীতার থাকে না, কিন্তু কর্জ হিসেবে গৃহীত অর্থ তিনি ব্যবসায় খাটাতে পারতেন। দ্বিতীয়ত, কর্জ মানেই ফেরত দেওয়ার দায়িত্ব। ফলে জমাদানকারীর অর্থ আরও নিরাপদ থাকত। এর সঙ্গে আজকের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট বা চলতি হিসাবের ধারণার একটি আদি রূপ খুঁজে পাওয়া যায়।
একই হাদিসে যুবায়ের (রা)-এর ঋণের পরিমাণও উল্লেখ আছে। বর্ণনায় এসেছে, তার ঋণের হিসাব করে দেখা যায় তা বাইশ লাখ। (সহিহ বুখারি ৩১২৯) অর্থাৎ তার কাছে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছিল, যা সেই যুগের প্রেক্ষাপটে একটি বিশাল জমা-ভিত্তি ছিল।
এরপর আসে অর্থ স্থানান্তরের সমস্যা। খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগেই এর সমাধানের সূচনা দেখা যায়। ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, মক্কায় কেউ ইবনে আব্বাস (রা)-এর কাছে দিরহাম জমা দিলে তিনি তা গ্রহণ করে একটি স্বীকারপত্র লিখে দিতেন, যাতে অর্থ প্রাপ্তির কথা উল্লেখ থাকত। সেই পত্র নিয়ে মানুষ কুফায় গিয়ে নগদ অর্থ উত্তোলন করতে পারত। (আল-মাবসুত) এটি আজকের ব্যাংক ড্রাফট, প্রমিসরি নোট বা হুন্ডির আদি রূপ বলে বিবেচনা করা যায়।
আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা)-এর ক্ষেত্রেও একই ধরনের পদ্ধতি চালু ছিল। ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি মক্কায় অর্থ গ্রহণ করে স্বীকারপত্র পাঠাতেন এবং ইরাকে তার ভাই মুসআব সেই পত্রের ভিত্তিতে নগদ অর্থ পরিশোধ করতেন। ফলে পথিমধ্যে ডাকাতি বা নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যেত। একই পরিবারের দুই ভাই দুই প্রান্তে বসে এই লেনদেন পরিচালনা করতেন, যা আধুনিক ব্যাংকের শাখা-নেটওয়ার্কের একটি আদি রূপ বলে মনে করা যায়।
এখানে মক্কার জমাদানকারী এবং ইরাকের অর্থগ্রহীতার মাঝখানে ভরসার ভিত্তি ছিল দুটি বিষয়। লিখিত স্বীকারপত্র এবং সেই পত্রের পেছনে থাকা ব্যক্তির সততা। অর্থাৎ প্রযুক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আগে এই ব্যবস্থার প্রাণ ছিল আস্থা।
সময়ের সঙ্গে এই ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত হয়। উমাইয়া যুগে, বিশেষ করে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের আমলে দূরবর্তী অর্থ স্থানান্তর আরও সংগঠিত রূপ পায়। পরবর্তীকালে হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম শতকে হুন্ডি এবং মুদ্রা বিনিময় বা ফরেক্স ব্যবসা ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়। আজ আমাদের হাতে স্মার্টফোন, মোবাইল ব্যাংকিং এবং এক ক্লিকে সীমান্ত পেরোনো লেনদেনের সুবিধা রয়েছে। কিন্তু একটু থেমে ভাবলে দেখা যায়, এই সবকিছুর শিকড় পোঁতা আছে অনেক পুরনো এক মাটিতে। মক্কার বাজারে একটি কাগজের টুকরো, কিছু মানুষের সততা এবং পারস্পরিক ভরসা, সেদিন এটুকুই ছিল পুরো ব্যবস্থার প্রাণ।
ব্যাংকিংয়ের ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যায়, অর্থনৈতিক লেনদেনের মৌলিক প্রয়োজনগুলো বহু শতাব্দী ধরেই মানুষের জীবনের অংশ। সময়ের সঙ্গে লেনদেনের পদ্ধতি বদলেছে, প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে, গড়ে উঠেছে আধুনিক ব্যাংকব্যবস্থা। কিন্তু আমানত রক্ষা, বিনিয়োগে ন্যায়সংগত অংশীদারত্ব এবং নিরাপদে অর্থ স্থানান্তরের প্রয়োজন আজও একই রয়ে গেছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগের লেনদেনের চর্চায় এসব প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি সততা, দায়িত্বশীলতা ও ন্যায়বিচারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ইসলামি অর্থনীতির মূল শিক্ষা হলো, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মুনাফা অর্জন বৈধ, তবে তা হতে হবে ন্যায়সংগত উপায়ে। সুদ পরিহার, ঝুঁকির ন্যায্য বণ্টন এবং মানুষের সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে এই শিক্ষা বাস্তবায়িত হতে পারে।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়