চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় পরিচালিত কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টারের সেবা অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছেন রোগীরা। ভারতের স্যান্ডোর মেডিকেল অথরিটির সঙ্গে চুক্তি শেষ হলে বিকল্প ব্যবস্থার নামে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে বাড়তি খরচ, সেবার মানের তারতম্য ও সময়সূচির সংকটে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল চারটায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের এস রহমান হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি ও আশঙ্কার কথা জানান কিডনি রোগীরা। ‘ডায়ালাইসিস সেন্টার (পিপিপি) রক্ষা কমিটি, চমেক হাসপাতাল’ ব্যানারে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে রোগীদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন শুভ ভট্টাচার্য। এ সময় কালচারাল ফোর্স বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি মো. নজরুল হোসেন শুকরিয়া ও কিডনি রোগী উৎপল দাশ বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কিডনি রোগী কল্যাণ সংস্থার প্রতিনিধি মো. আব্দুল আলী।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, স্যান্ডোরের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে তিন থেকে চার মাসের জন্য রোগীদের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করানোর পরিকল্পনার কথা জানানো হচ্ছে। তবে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতি সেশনে ডায়ালাইসিসের খরচ সাড়ে তিন হাজার থেকে সাত হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সরকারি ভর্তুকি দেওয়া হলেও এই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা সাধারণ রোগীদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে।
চমেক হাসপাতালের স্যান্ডোর ডায়ালাইসিস সেন্টারে বর্তমানে মাত্র ৬২১ টাকায় প্রতি সেশন ডায়ালাইসিস করানো সম্ভব হচ্ছে, যা রোগীদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছিল। এই সেবা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে নিয়মিত চিকিৎসা চালানো সিংহভাগ রোগীর পক্ষেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
রোগীদের আশঙ্কা, মূল খরচের বাইরে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেনসহ অন্যান্য সহায়ক সেবার জন্য আলাদা বিল পরিশোধ করতে হতে পারে। এছাড়া ডায়ালাইসিস চলাকালে কোনো রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সিসিইউ, আইসিইউ কিংবা এইচডিইউ চিকিৎসার যে প্রয়োজন পড়ে, তার মোটা অঙ্কের খরচ রোগীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করবে। পাশাপাশি বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলে চিকিৎসা ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।
সংবাদ সম্মেলনে রোগীরা উল্লেখ করেন, মাত্র তিন থেকে চার মাসের সাময়িক সেবার জন্য কোনো বেসরকারি হাসপাতাল নতুন ডায়ালাইসিস মেশিন বা অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করবে না। ফলে হাসপাতালগুলোকে তাদের বিদ্যমান মেশিনে নিয়মিত রোগীদের নির্ধারিত সূচির বাইরে, এমনকি গভীর রাতেও নতুন রোগীদের ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা করতে হতে পারে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়বে চট্টগ্রাম জেলা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের ওপর। কক্সবাজার, সাতকানিয়া, ফেনী ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকা থেকে আসা রোগীরা সময়মতো সিডিউল না পাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন। রাতে যাতায়াত ও চিকিৎসা নেওয়া তাদের জন্য চরম শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্ভোগের কারণ হবে। একই সঙ্গে রোগীদের স্বজনদেরও চিকিৎসা শেষে পরদিন স্বাভাবিক কর্মস্থলে যোগ দিতে মারাত্মক সমস্যায় পড়তে হবে।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সেবার মান ও ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক তারতম্য রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে স্যান্ডোরের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনায় সাশ্রয়ী খরচে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের হঠাৎ বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন হাসপাতালে ছড়িয়ে দেওয়া হলে তারা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন, যা চিকিৎসার সমঅধিকারের পরিপন্থী।
রোগীরা জানান, চমেক হাসপাতালের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের নিজস্ব ইন-হাউস ডায়ালাইসিস ইউনিটে মাত্র ১৮টি মেশিন রয়েছে। কিন্তু সেখানে অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা সেই সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। নতুন রোগীদের জন্য সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে ডায়ালাইসিসের সুযোগ বা নির্দিষ্ট সময় পাওয়া বেশ কঠিন এবং দীর্ঘ সময় সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
চমেক হাসপাতালের পরিচালকের উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেড় হাজার শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিনিয়ত চার হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যমান সরকারি কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত রোগীর চাপ বাড়লে সাধারণ রোগীদের ডায়ালাইসিসের সুযোগ পাওয়া আরও দুর্লভ হয়ে উঠবে। সংবাদ সম্মেলনে চমেক হাসপাতালের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগীদের ১০টি তিক্ত অভিজ্ঞতার বিবরণও তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে রোগীরা সুস্পষ্টভাবে জানান, স্যান্ডোরের পরিবর্তে অন্য যেকোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তাদের কোনো আপত্তি নেই। তারা চান, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় পরিচালিত এই ডায়ালাইসিস প্রকল্পটি যেন কোনো অবস্থাতেই বন্ধ না হয় এবং সাশ্রয়ী খরচে রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ অব্যাহত থাকে।