ঢামেক হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের ধর্মঘটের নেপথ্যে কমিশন বাণিজ্য!

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সুবিধার্থে ‘অ্যাপভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস’ সেবা চালু করা হয়েছিল। যে কোম্পানি এই অ্যাপ সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করত, তারা ১ হাজার টাকার ভাড়া ২ হাজার ৫০০ টাকা নিত। ৮ হাজার টাকার ভাড়ার জায়গায় নেওয়া হতো ১৪-১৫ হাজার টাকা। অ্যাপ নিয়ন্ত্রণকারী ওই কোম্পানির কাছ থেকে মাসিক প্রায় ১৫ লাখ টাকার কমিশন পেতেন ঢামেক হাসপাতালের বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির কয়েকজন নেতা। সম্প্রতি নতুন পরিচালক আসার পর জরুরি বিভাগের সামনে থেকে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের পার্কিং তুলে দেওয়া হয়। এতে অ্যাপের মাধ্যমে রোগী বহন কমে যায় এবং বাড়তি টাকা আদায় করতে পারছিলেন না অ্যাম্বুলেন্স মালিকরা। এর পরই অবস্থান ধর্মঘটের ঘোষণা দেন অ্যাম্বুলেন্স মালিকরা। মূলত পার্কিং ব্যবস্থার দাবির আড়ালে, রোগীর গলাকাটা ‘অ্যাপভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস’ চালুর পাঁয়তারা করছে মালিক সমিতি। এমনকি অবস্থান ধর্মঘট পালনে যে অর্থ খরচ হয়েছে, তা অ্যাপ নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ব্যয় করেছে বলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

এদিকে গতকাল বুধবারও অর্ধবেলা ধর্মঘট পালন করেছেন অ্যাম্বুলেন্স মালিকরা। বিকেল ৩টার দিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির নেতারা এ বিষয়ে আলোচনায় বসেন। এতে আগামী সাত দিনের জন্য ধর্মঘট স্থগিতের সিদ্ধান্ত হয়। সন্ধ্যা থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। তবে চলমান ধর্মঘটের কারণে হাসপাতালে আসা রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।

গতকাল সকালের দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ ও ২ নম্বর ভবনের সামনে অনেক রোগী ও তাদের স্বজনদের অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। জরুরি বিভাগের সামনে রোগী সীমা আক্তারের ভাই রেজাউল করিম অ্যাম্বুলেন্সের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। রেজাউল বলেন, ‘মঙ্গলবার মাওয়া রোডে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আমার বোন। ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসার পর তাকে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যেতে পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। তবে ২-৩ ঘণ্টা চেষ্টা করেও অ্যাম্বুলেন্স জোগাড় করতে পারিনি। ৯৯৯ এ কল করেছিলাম। তবুও পাইনি। শেষে জরুরি বিভাগের সামনে থাকা ঢাকা মেডিকেলের সরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালক আমাদের জানান, তিনি সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে পঙ্গু হাসপাতালে দিয়ে আসতে পারবেন। এরপর সেই গাড়িতে করেই এখান থেকে নিয়ে যাচ্ছি।’

সাভার থেকে আসা স্ট্রোকের রোগী শাহীন গাজীকে অপেক্ষা করতে দেখা যায় জরুরি বিভাগের সিঁড়ির ওপর ট্রলিতে শুয়ে। তার ছোট ভাই শামীম গাজী বলেন, ‘এমআরআই করার জন্য লালবাগ ইবনে সিনা হাসপাতালে যেতে হবে। তবে আধাঘণ্টা অপেক্ষা করেও অ্যাম্বুলেন্স খুঁজে পাচ্ছি না।’

বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির এক সদস্য (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, হাসপাতালের সাবেক পরিচালক রোগীর সুবিধার জন্য অ্যাপভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু করেছিলেন। তবে মালিক সমিতির সিন্ডিকেট মিলে সেই অ্যাপে ভাড়ার মূল্যতালিকা অনেক বেশি করেছিল। ১ হাজার টাকার ভাড়া অ্যাপের দোহাই দিয়ে আদায় করা হতো ২৫শ টাকা। আর ৮ হাজার টাকার ভাড়া আদায় করা হতো ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা। সেই অ্যাপ থেকে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতিসহ কয়েকটি সিন্ডিকেট নির্দিষ্ট একটি কমিশন আদায় করত। যা প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। মাসে দাঁড়ায় ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা। হাসপাতালে নতুন পরিচালক আসার পর সেই অ্যাপ সার্ভিস বন্ধ করে দিয়েছেন। এ জন্য সিন্ডিকেটের টাকাও বন্ধ হওয়ায় দিশাহারা যুবদলের নামধারী ইমন-বাদল সিন্ডিকেট।

আরেক অ্যাম্বুলেন্স মালিক বলেন, হাসপাতাল চত্বরে পার্কিংয়ের দাবিটি মূলত এদের আইওয়াশ। মূল দাবিটি সেই গলাকাটা অ্যাপভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু করা। এখন হাসপাতালের ভেতরে পার্কিং করতে পারলে পরে আবার অ্যাপ চালু করতে পারবে। তাই এত পাঁয়তারা করছে। তারা রাজনৈতিক পদধারী। এ জন্য যেসব অ্যাম্বুলেন্স মালিক এই দাবি দাওয়ার বিপক্ষে, তারা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস দিতে পারছেন না। এই ধর্মঘট কর্মসূচির যত খরচ রয়েছে, সবই বহন করছে সেই অ্যাপ কোম্পানির লোকজন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই ধর্মঘট কর্মসূচির মূলে রয়েছেন বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. বাদল এবং ঢামেক হাসপাতাল বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইমন আলী। বাদল ঢাকা মেডিকেল ইউনিট যুবদলের সভাপতি, ইমন সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী। অ্যাপভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস থেকে পাওয়া মাসিক ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকার ভাগ বাটোয়ারাও তারাই করতেন।

এদিকে বিকেল ৩টার দিকে এ নিয়ে পরিচালকের কক্ষে আলোচনায় বসেন মালিক সমিতির নেতারা। আলোচনার পর আগামী সাত দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেন বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. বাদল মাদবর। তিনি বলেন, ‘বিকেলে হাসপাতাল প্রশাসন ও শাহবাগ থানার ওসির সঙ্গে আমাদের মিটিং হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দাবি মেনে নেওয়ার জন্য ৭ দিনের সময় বেঁধে দিয়েছি। এর মধ্যে দাবি বাস্তবায়ন না হলে পুনরায় কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’

অন্যদিকে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মো. ফরহাদ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, সরকারি জায়গায় বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স রাখার বিধান নেই। তবে অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের ব্যবসা করতে নিষেধ করা হচ্ছে না, তাদের হাসপাতালের বাইরে অবস্থান করতে হবে। বিষয়টি দেখার জন্য শাহবাগ থানার ওসিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে এমনটি আলোচনা হয়েছে। রোগী সেবার জন্য আরও অ্যাম্বুলেন্স যুক্ত করার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।