ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট কাটিয়ে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ

ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট দূর করে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম। এ জন্য সুশাসন নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণ আদায়, পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণ এবং আমানতকারীদের সুরক্ষা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুর-২-এ বিআইবিএম মিলনায়তনে ১১তম বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ড. এজাজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা শুধু আর্থিক খাতের প্রয়োজন নয়, বরং বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি। দেশের কৃষি, শিল্প, রপ্তানি, প্রবাসী আয় ও ক্ষুদ্র উদ্যোগের বিকাশে ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এসব খাতে কার্যকর অর্থায়ন নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা জরুরি।

ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বিআইবিএমের মহাপরিচালক বলেন, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতের মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। সুশাসনের ঘাটতি, মূলধন ও ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি সংরক্ষণে দুর্বলতা, অর্থ পাচার এবং উৎপাদনশীলতার সীমাবদ্ধতা ব্যাংক খাতকে দুর্বল করে তুলছে।

তিনি বলেন, ব্যাংক খাতের একাংশে তীব্র তারল্যসংকট থাকলেও সামগ্রিক ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শুধু অর্থের জোগান বাড়ানো যথেষ্ট নয়। ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সম্ভাবনাময় বিনিয়োগে অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

সংস্কারের বিষয়ে ড. এজাজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংক তদারকি জোরদার, স্বাধীন ও কার্যকর সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ঋণের প্রকৃত মান নির্ধারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত, খেলাপি ঋণ আদায় এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর কার্যকর সমাধানে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণ ও আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ঋণ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা যাচাই এবং সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণে ডিজিটাল প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রযুক্তি একা ব্যাংক খাতের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। এর পাশাপাশি পেশাগত নৈতিকতা, দক্ষ জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, একটি সুস্থ ও শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত উৎপাদনশীল ব্যবসা, কৃষি এবং কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগে (সিএমএসএমই) দায়িত্বশীল অর্থায়ন বাড়ানো।

বিআইবিএমের ভূমিকা তুলে ধরে মহাপরিচালক বলেন, ব্যাংক খাতের রূপান্তরে গবেষণা, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গঠনমূলক আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। সম্মেলনের আলোচনা থেকে বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি বাস্তবায়নযোগ্য সমাধান বেরিয়ে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান এবং বিআইবিএমের সাবেক ড. মুজাফফর আহমেদ চেয়ার অধ্যাপক ড. বারকাত-এ-খুদা। এ ছাড়া বিআইবিএমের অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবিবসহ ব্যাংকার, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।