ইরানের দিকে ঝুঁকছে ওয়াশিংটনের মিত্ররা!

পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তায় এত দিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রধান ভরসা হিসেবে দেখেছে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো। কিন্তু এখন সেই ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর একের পর এক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ আরব মিত্ররা। আর এই বাস্তবতায় অঞ্চলটির নিরাপত্তা সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস মিলছে। যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম-অধ্যুষিত মিত্ররা এখন সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে ইরানকে নিয়েই একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার পথ খুঁজছে। এই কূটনৈতিক তৎপরতায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে সৌদি আরবের অবস্থানে। যুদ্ধের আরও প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যেই দেশটি প্রথমবারের মতো তেহরানের সঙ্গে সরাসরি উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় অংশ নিয়েছে। পাশাপাশি কাতার, ওমান ও ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার পুরনো প্রস্তাব নতুন করে সামনে এনেছে।

তবে এই উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো স্থিতিশীলতার পথ খুলে দেবে, নাকি যুদ্ধের বিস্তার ঠেকানোর সাময়িক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হয়েই থাকবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বিশ্লেষকদের মধ্যে। বিশেষ করে ইরানের কঠোর অবস্থান, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ এই আলোচনার ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে রেখেছে। গত সোমবার উপসাগরীয় অঞ্চলের কূটনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। সৌদি আরবের বাদশাহর ছোট ছেলে ও দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমানকে তেহরানে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মহসিন রেজাইসহ দেশটির অন্য নেতাদের সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠক করেন। সফরে খালিদের সঙ্গে ছিলেন মক্কা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশীদার পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক ও গোয়েন্দা প্রধানরা। ইরান এবং মক্কা চুক্তির সদস্য দেশগুলোর মধ্যে এটিই প্রথম সরাসরি উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ। বৈঠকে আলোচনা অব্যাহত রাখার বিষয়ে নীতিগত সমঝোতা হয়। পরদিন মঙ্গলবার উভয় পক্ষের নেতৃত্ব সেই সমঝোতায় অনুমোদন দেয়।

ইরানের সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, বৈঠকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার এবং হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তেহরানের বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে দেশটির মন্ত্রিসভাও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির গুরুত্ব তুলে ধরে। সৌদি মন্ত্রিসভার মূল্যায়নে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে মক্কা চুক্তি ইতিমধ্যে ‘কেন্দ্রীয় ভূমিকা’ পালন করেছে। একই সঙ্গে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার প্রতিও সমর্থন জানানো হয়।

এই সরাসরি যোগাযোগকে স্বাগত জানালেও এর কার্যকারিতা নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মূল প্রশ্ন, আলোচনার টেবিলে বসার অর্থ কি এই যে ইরান উপসাগরীয় রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর ওপর নতুন হামলা বন্ধ করবে? ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের ডিস্টিংগুইশড মিডল ইস্ট ফেলো বারবারা সøাভিনের মতে, আলোচনার ফলে হামলা কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ইরান এ বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দিতে রাজি হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের সিনিয়র রেসিডেন্ট স্কলার হুসেইন ইবিশও খুব বেশি আশাবাদী নন। তার মূল্যায়নে, বড় ধরনের নতুন উত্তেজনা ঠেকানোর ক্ষেত্রে তেহরানের এই বৈঠক নির্ণায়ক হয়ে উঠবে এমন সম্ভাবনা কম। কারণ, সত্যিকার অর্থে উত্তেজনা কমাতে হলে ইরানকে তার কয়েকটি চরম অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে।

কাতারের নতুন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ইরানের : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাত থামাতে শান্তিচুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিল মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার। তবে তেহরান ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। যুদ্ধবিরতি সংলাপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তেহরানের এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে বলেছেন, কাতারের প্রস্তাব ‘অগ্রহণযোগ্য’। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে ওই ইরানি কর্মকর্তা বলেন তেহরানের কাছে কাতার নতুন শান্তিচুক্তির যে খসড়াটি পাঠিয়েছে, সেটি নতুন কোনো শান্তি-প্রস্তাবনা নয় এবং সেখানে এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো তেহরানের পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব। তিনি আরও বলেন, পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান নমনীয় হবে না। নতুন প্রস্তাবনায় এটিকেই বিরোধের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, রয়টার্সকে বলেছেন ওই কর্মকর্তা। ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে অভ্যন্তরীণ এবং বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়।