জনতা-অগ্রণীতে বেসরকারি ব্যাংকার নিয়োগে অসন্তোষ

জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে বেসরকারি ব্যাংকের দুই কর্মকর্তাকে মনোনয়ন দেওয়ায় ব্যাংক দুটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন সরকারি ব্যাংকে চাকরি করেও শীর্ষ পদে যাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। তাদের মতে, এ সিদ্ধান্তের ফলে ভবিষ্যতে এমডি পদে নিয়োগ নিয়ে ব্যাংক খাতে লবিং-গ্রুপিং বাড়তে পারে।

সম্প্রতি জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এ অসন্তোষের কথা জানা গেছে। তারা বলছেন, সরকারি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম, ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে এমডি নিয়োগ দেওয়া হলে ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হয়। বাইরে থেকে নিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন এমডিদের ব্যাংকের কার্যক্রম বুঝতে সময় লাগতে পারে। এতে ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

গত ২৬ অক্টোবর জনতা ব্যাংকের এমডি পদে সাউথইস্ট ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) মাহবুব আলম এবং অগ্রণী ব্যাংকের এমডি পদে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদকে মনোনয়ন দেয় সরকার। তাদের তিন বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া হয়। একই দিনে বেসিক ব্যাংকের এমডি পদে জনতা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) নূরুল হুদাকেও তিন বছরের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়।

জনতা ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন চাকরি করার পর অবসরের আগে এমডি হওয়ার প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু বাইরে থেকে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ায় সেই প্রত্যাশা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এতে নতুন এমডিদের সঙ্গে ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়েও সমস্যা তৈরি হতে পারে।

সদ্য বিদায়ী জনতা ব্যাংকের এমডি মজিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ আমার চুক্তি বাতিল করেছে। এটি সরকারের সিদ্ধান্ত। আমার আফসোস নেই। জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ সবারই জানা আছে। এই পরিস্থিতিতে ছোট-বড় খেলাপিদের সঙ্গে ওয়ান-টু-ওয়ান আলোচনা করে ঋণ আদায়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছি। গভর্নর ও সরকার সবাই জানে আমার ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স কেমন। সব মিলিয়ে ব্যাংকের শৃঙ্খলা ঠিক রেখে সামনে এগোনো প্রয়োজন বলে মনে করি।

সরকারি ব্যাংকে দুই দশকের বেশি সময় কাজ করা আরেক কর্মকর্তা বলেন, সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং কাজের ধরনে পার্থক্য রয়েছে। বাইরে থেকে আসা এমডিদের ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম বুঝতে সময় লাগতে পারে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণের চাপে থাকা ব্যাংকগুলোতে এতে ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ মো. মাজেদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারি ব্যাংকের শীর্ষ পদে বেসরকারি ব্যাংকার নিয়োগের সিদ্ধান্ত যথাযথ হয়নি। সরকারি ব্যাংকে পদোন্নতির জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং যোগ্যতার শর্ত পূরণ করতে হয়। বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে।

এদিকে গত ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে রাজনৈতিক প্রভাবের সমালোচনা করেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বিতরণের মাধ্যম হিসেবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কাজে ব্যবহার করা অনুচিত। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের সমান কর্তৃত্ব থাকা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তাও মনে করেন, সরকারের নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা থাকলেও আর্থিক খাতের বৃহত্তর স্বার্থে দলীয়করণ থেকে দূরে থাকা প্রয়োজন। যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তাদের কাজে লাগিয়ে ব্যাংক খাতকে গতিশীল করা জরুরি। তাদের মতে, ব্যাংক খাতের সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে সামগ্রিক অর্থনীতিও উপকৃত হবে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ প্রথম দফায় অগ্রণী ব্যাংকের মো. আনোয়ারুল ইসলাম, বেসিক ব্যাংকের মো. কামরুজ্জামান খান এবং বিডিবিএলের মো. জসীম উদ্দিনের চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করে। দ্বিতীয় দফায় জনতা ব্যাংকের মজিবুর রহমান, রূপালী ব্যাংকের কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম এবং সোনালী ব্যাংকের শওকত আলী খানের চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিলের সিদ্ধান্ত আসে।

তবে পরে সোনালী ব্যাংকের এমডি শওকত আলী খানের চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিলের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়।