প্লাস্টিক দূষণ রোধে বদলাচ্ছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

প্লাস্টিক দূষণ রোধে শুধু ব্যবহারের পর বর্জ্য সংগ্রহ কিংবা পরিচ্ছন্নতা অভিযান যথেষ্ট নয়। উৎপাদনের শুরু থেকে পণ্যের ব্যবহার, বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ ও পুনঃচক্রায়ন—প্রতিটি পর্যায়ে দায়িত্বশীল ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এ জন্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নির্ধারণ, শিল্পকারখানায় সম্পদের অপচয় কমানো, স্থানীয় পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের উদ্যোগে এবং জাতিসংঘের শিল্প উন্নয়ন সংস্থার (ইউএনআইডিও) কারিগরি সহায়তায় ‘বাংলাদেশে টেকসই প্লাস্টিক ব্যবহার ও সামুদ্রিক বর্জ্য প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ’ প্রকল্পের আওতায় এসব কার্যক্রম চলছে। নরওয়ে সরকার ঢাকার রয়্যাল নরওয়েজিয়ান দূতাবাসের মাধ্যমে প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। প্রকল্পের লক্ষ্য উৎপাদন থেকে ব্যবহার-পরবর্তী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয় ও সক্ষমতা তৈরি করা।

উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারিত দায়িত্ব বা ইপিআর নির্দেশিকা তৈরি এ প্রকল্পের বড় অর্জন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ১৩ আগস্ট নির্দেশিকাটি গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে সরকার। এর মাধ্যমে প্লাস্টিক পণ্যের উৎপাদক, আমদানিকারক ও ব্র্যান্ড মালিকদের ব্যবহারের পর সৃষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বশীল করার কাঠামো তৈরি হয়েছে। তবে নির্দেশিকা প্রকাশের পাশাপাশি এর বাস্তব প্রয়োগ, তদারকি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, উৎপাদন পর্যায়েও সম্পদের অপচয় কমানোর উদ্যোগ রয়েছে। ইউএনআইডিওর প্রকল্প-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, রিসোর্স এফিশিয়েন্ট অ্যান্ড ক্লিনার প্রোডাকশন (আরইসিপি) এবং ডিজাইন ফর এনভায়রনমেন্ট (ডিএফই) পদ্ধতির আওতায় ৪০টি কারখানা মূল্যায়ন করা হয়েছে। ২৮টি প্লাস্টিকশিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিচ্ছন্ন ও সম্পদ-সাশ্রয়ী উৎপাদন নিয়ে কাজ হয়েছে। এ ছাড়া ৮০ জনের বেশি পেশাজীবীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য উৎপাদনে কাঁচামাল, পানি ও জ্বালানির অপচয় কমানো এবং পণ্যের নকশা এমনভাবে তৈরি করা, যাতে ব্যবহার শেষে উপকরণ পুনঃচক্রায়ন করা সহজ হয়।

ইউএনআইডিওর বাংলাদেশের ন্যাশনাল এক্সপার্ট এস এম আরাফাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্লাস্টিক দূষণ রোধে চারটি ধাপে কাজ করা হয়েছে। প্রথমত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসার জন্য ইপিআর নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছে। মানুষ যত্রতত্র ময়লা ফেলছে। কোনোভাবেই এটা শৃঙ্খলায় আনা যাচ্ছে না। এজন্য কক্সবাজারে একটা মডেল তৈরি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, প্লাস্টিক উৎপাদনকারী ২০টি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। যেখানে আমরা ভালো ফল পেয়েছি। সিরাজগঞ্জে চিকিৎসাবর্জ্যের জন্য একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেটি অন্য এলাকাতেও বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। প্লাস্টিক দূষণ রোধে স্কুল পর্যায়ে সব বাচ্চাকে এখন থেকে সচেতন করে প্রস্তুত করতে হবে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উৎপাদন পর্যায়ের পাশাপাশি বর্জ্য সংগ্রহেও বিভিন্ন এলাকায় কার্যক্রম চালানো হয়েছে। প্রকল্পের হালনাগাদ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের তালিকা অনুযায়ী, পরিমাণ উল্লেখ থাকা ৫১টি কার্যক্রমে মোট ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮৬৫ দশমিক ১৩ কেজি বর্জ্য সংগ্রহের হিসাব রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ১৮৭ টন। তালিকায় কক্সবাজারের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাছ অবতরণকেন্দ্র ও সমুদ্রসৈকতসহ বিভিন্ন স্থানের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালী, আনোয়ারার পারকি, সন্দ্বীপ এবং ভোলার মনপুরা ও চরফ্যাশনসহ বিভিন্ন এলাকা, বাজার ও পরিবহনকেন্দ্রেও কার্যক্রম হয়েছে।

সংগ্রহের পর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে সিরাজগঞ্জের উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। গত ১২ জুলাই উদ্বোধন করা জেলাভিত্তিক চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে জেলার নয়টি উপজেলার ২১০টির বেশি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছে বলে ইউএনআইডিও জানিয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে এতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন অংশীজন যুক্ত রয়েছে। কেন্দ্রীয় কমন ট্রিটমেন্ট ফ্যাসিলিটিতে বছরে প্রায় ৯৫০ টন সংক্রামক চিকিৎসাবর্জ্য শোধনের সক্ষমতা রয়েছে।

এ উদ্যোগে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন এবং কেন্দ্রীয় স্থাপনায় শোধনের ব্যবস্থাকে একটি কাঠামোর আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে। ইউএনআইডিওর তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ৮৫০ জনের বেশি স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীকে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত সেবা, বর্জ্য পৃথকীকরণ, সংগ্রহের ধারাবাহিকতা ও পরিচালনার তথ্য দিয়ে এর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে হবে। চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনার এই উদ্যোগ প্লাস্টিক বর্জ্য পুনঃচক্রায়নের হিসাব নয়; বরং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সংগ্রহ থেকে নিরাপদ শোধন পর্যন্ত সমন্বিত ব্যবস্থার একটি উদাহরণ।

প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, পুনঃচক্রায়ন খাতের সক্ষমতা বাড়াতেও অনানুষ্ঠানিক ও আধা-আনুষ্ঠানিক পুনঃচক্রায়ন খাতের ১৪০ জনের বেশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সক্ষমতা উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে। এ খাতের কর্মীদের দক্ষতা ও নিরাপদ কর্মপদ্ধতি উন্নয়নের পাশাপাশি বর্জ্য পৃথকীকরণ ও পুনঃচক্রায়নের উপযোগী উপকরণ সংগ্রহের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার তথ্য সংরক্ষণ ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে ‘প্লাস্টিকপাথ’ নামে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের নেতৃত্বে ইউএনআইডিওর কারিগরি সহায়তায় তৈরি এ প্ল্যাটফর্মে নীতি, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও অংশগ্রহণের বিভিন্ন বিভাগ রয়েছে। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২১-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও বার্ষিক তথ্য পর্যবেক্ষণের ডিজিটাল কাঠামোও এতে যুক্ত করা হয়েছে।