নিকুঞ্জে চাঁদাবাজির অভিযোগ, সেই ‘মোফা বাবু’ একদিনের রিমান্ডে 

রাজধানীর খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ-২ এলাকায় চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার একাধিক অভিযোগে আলোচিত মো. ইসমাইল হোসেন বাবু ওরফে ‘মোফা বাবু’কে (৩০) চাঁদাবাজির একটি মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। 

পুলিশ আজ পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে শুনানি শেষে আদালত এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

গত ২৩ অক্টোবর শুক্রবার রাত আনুমানিক ১১টা ২০ মিনিটে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন ২৪ অক্টোবর খিলক্ষেত থানায় দায়ের করা মামলাটির নম্বর ১৭। ওই মামলায় অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ তার রিমান্ড আবেদন করে।

দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩৪১, ৩২৩, ৩৮৫, ৫০৬ ও ৩৪ ধারায় দায়ের করা মামলায় বেআইনি সমাবেশ, পথরোধ, মারধর, চাঁদা দাবি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অভিন্ন অভিপ্রায়ে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
পুলিশ ও মামলার নথি সূত্রে জানা গেছে, ‘মোফা বাবু’র স্থায়ী ঠিকানা ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার রামকেশব এলাকায়। সে খিলক্ষেতের টানপাড়া এলাকার ১০ নম্বর সড়কে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করত।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নিকুঞ্জ-২ এলাকায় চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, মারধর এবং প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে অন্তত সাতবার গ্রেপ্তার হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে তার বিরুদ্ধে। ২০২৫ সালের জুলাই ও অক্টোবরে এক ব্যবসায়ীর দোকান ভাঙচুর, চাঁদা দাবি ও মারধরের অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে নিকুঞ্জ-২ এলাকার একটি রেস্তোরাঁর সামনে থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে আটক হওয়ার তথ্যও রয়েছে। এ ছাড়া একাধিকবার সেনাবাহিনীর হাতেও আটক হয়েছে সে। এসব ঘটনা নিয়ে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে ‘মোফা বাবু’র বিরুদ্ধে। স্থানীয়ভাবে সে খিলক্ষেতের ৯৬ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব পদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত আলোচনায় রয়েছে। 

স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ, একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির আশ্রয়-প্রশ্রয়েই নিকুঞ্জ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মোফা বাবুর প্রভাব ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। 

স্থানীয়ভাবে ওই ব্যক্তির নাম নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন বাসিন্দারা। তাদের প্রশ্ন, বারবার গ্রেপ্তার হওয়ার পরও কীভাবে সে এলাকায় ফিরে একই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়? তার পেছনে আরো কারা রয়েছে, তাদের ভূমিকা কী—সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

এদিকে, একাধিকবার গ্রেপ্তার এবং গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও তার বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে কার্যকর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা-কর্মী। 

তাদের দাবি, এ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কিংবা সাংগঠনিকভাবে কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য তাদের জানা নেই।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ‘মোফা বাবু’ গ্রেপ্তার হলে এলাকায় সাময়িক স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর আবারও সে আগের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হচ্ছে।

এর আগে ‘মোফা বাবু’র বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার বিষয়ে জানতে চাইলে খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ সোহরাব আল হোসাইন বলেছিলেন, “চাঁদাবাজের কোনো দল নেই, চাঁদাবাজের একমাত্র পরিচয় সে চাঁদাবাজ ও অপরাধী। 

খিলক্ষেত থানা এলাকায় কোনো রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। অপরাধের সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক না কেন, আইনের চোখে সবাই সমান। প্রভাব বা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অপরাধ পার পাওয়ার দিন শেষ।”

ওসি আরও জানিয়েছিলেন, দায়ের করা মামলার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে আসামির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‘মোফা বাবু’র এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুরের ঘটনায় নিকুঞ্জের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে চাঁদাবাজির অভিযোগের পেছনের প্রকৃত ঘটনা, সম্ভাব্য সহযোগী এবং অপরাধের নেপথ্যে কারও মদদ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।

তাদের মতে, শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট নয়। চাঁদাবাজি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধে সহযোগিতা বা আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে থাকলে তার ভূমিকাও তদন্ত করা জরুরি।

নিকুঞ্জবাসীর প্রত্যাশা, এক দিনের রিমান্ড যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধের নেপথ্যের সহযোগী ও মদদদাতাদেরও শনাক্ত করা হোক। কারণ, চাঁদাবাজি নির্মূল করতে হলে শুধু অপরাধীকে নয়, অপরাধের পেছনের শক্তিকেও আইনের আওতায় আনতে হবে।

রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধের দায়ই হবে বিচারের মাপকাঠি—এমন একটি নিরাপদ ও চাঁদাবাজিমুক্ত নিকুঞ্জই এখন এলাকাবাসীর প্রত্যাশা।