লালনগীতিতে ফুটে উঠল বাংলার অভিন্ন ঐতিহ্য

ঢাকায় কিংবদন্তি বাউল সাধক, দার্শনিক ও গীতিকার ফকির লালন শাহের জীবন ও কর্ম স্মরণে অনুষ্ঠিত হয়েছে সাংস্কৃতিক আয়োজন ‘লালন সন্ধ্যা ২০২৬’। শনিবার (৩১ অক্টোবর) ঢাকার আবদুল গণি রোডের ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশনের ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র (আইজিসিসি)।

অনুষ্ঠানে বাউল গান, বাঁশির সুর, সমবেত লালনগীতি এবং আধুনিক সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে লালন শাহের সংগীত ও দর্শনের চিরন্তন আবেদন তুলে ধরা হয়। ঐতিহ্যবাহী সংগীতের শিকড় থেকে আধুনিক পরিবেশনার বিবর্তনও স্থান পায় এই আয়োজনে। পাশাপাশি বাংলার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে ৭০০-এর বেশি অতিথির উপস্থিতিতে মিলনায়তন পূর্ণ হয়ে যায়। এতে ভারত ও বাংলাদেশের অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি লালনসংগীতের প্রতি মানুষের দীর্ঘদিনের আগ্রহের প্রতিফলন ঘটে।

WhatsApp Image 2026-10-31 at 10.23.08 PM

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী ফকির লালন শাহকে মানবতার আলোকবর্তিকা হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, সমুদ্রে পথ হারানো কোনো জাহাজ যেমন দিকনির্দেশনা পেতে আলোকবর্তিকা খোঁজে, তেমনি লালন শাহের দর্শনও মানবতাকে পথ দেখায়। তার সর্বজনীন মানবতাবাদ ও অন্তর্ভুক্তির দর্শন তুলে ধরে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, লালন শাহ ভারত ও বাংলাদেশের বন্ধুত্বেরও একটি সেতুবন্ধ।

দিনেশ ত্রিবেদী লালন শাহের দর্শনের বর্তমান সময়েও প্রাসঙ্গিকতা এবং বাংলার সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে তার অবদানের কথা তুলে ধরেন। লালনগীতিতে প্রকাশিত মানবতাবোধ এবং সামাজিক ও ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে ওঠার বার্তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে বাংলার অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে বাউলধারার ভূমিকা এবং ভারত-বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক জোরদারে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত বাউল ও লোকসংগীতশিল্পী শফি মণ্ডলের নেতৃত্বে একটি বাংলাদেশি বাউল দল ঐতিহ্যবাহী বাউল গান পরিবেশন করে। ফকির লালন শাহের মরমি দর্শনে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত এই শিল্পীরা তাঁদের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে গ্রামীণ বাংলার বাউলসংগীতের আধ্যাত্মিক দিক তুলে ধরেন।

এরপর বাঁশি পরিবেশন করেন কিংবদন্তি লোকসংগীতশিল্পী ও ‘লালনসংগীতের রানি’ হিসেবে পরিচিত প্রয়াত ফরিদা পারভীনের স্বামী গাজী আবদুল হাকিম। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশের পরিচিত লোক ও ঐতিহ্যবাহী সংগীতশিল্পী নাসরিন আখতার বিউটি। তাঁদের পরিবেশনায় ধ্রুপদি রাগসংগীত ও বাংলা লোকসংগীতের মেলবন্ধন ঘটে।

WhatsApp Image 2026-10-31 at 10.23.07 PM

এরপর অচিন পাখি সাংস্কৃতিক একাডেমির শিক্ষার্থীরা সমবেত কণ্ঠে লালনগীতি পরিবেশন করেন। লালন শাহের কালজয়ী গানগুলোর এই সম্মিলিত পরিবেশনা মিলনায়তনে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে সাড়া ফেলে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সংগীত ঐতিহ্য এবং সমকালীন সমাজেও লালনগীতির প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানের পরবর্তী পর্বে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ব্যান্ড লালন সংগীত পরিবেশন করে। নিগার সুলতানা সুমির নেতৃত্বে দলটি লালনগীতির ঐতিহ্যবাহী সুরের সঙ্গে আধুনিক সংগীতের সমন্বয় ঘটায়। তাদের পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। এতে নতুন প্রজন্মের কাছে লালনসংগীতের অনুপ্রেরণা এবং এর গভীর দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের বিষয়টি ফুটে ওঠে। প্রাণবন্ত মঞ্চ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শেষ হয় সন্ধ্যার আয়োজন।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর, সংসদ সদস্যরা, জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন ধারার বিশিষ্ট শিল্পী, সাবেক রাষ্ট্রদূত ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। এ ছাড়া ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, তরুণ সংস্কৃতিপ্রেমী, ব্যবসা ও শিক্ষাঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা, সম্পাদক, গণমাধ্যমকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজনেরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সাবেক আইসিসিআর বৃত্তিপ্রাপ্তদের পাশাপাশি তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো।