মানুষ ভ্রমণ করে নতুন প্রকৃতি দেখতে, অচেনা সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে এবং কর্মব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি কাটাতে। ভ্রমণ নিঃসন্দেহে মানুষের চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু দূরের সৌন্দর্য আবিষ্কারের নেশায় আমরা কি ক্রমে কাছের সৌন্দর্যকে ভুলে যাচ্ছি? পাহাড়, সমুদ্র কিংবা বিদেশের পর্যটনকেন্দ্রের পরিকল্পনায় ব্যস্ত থাকতে গিয়ে নিজের গ্রামের মেঠোপথ, পৈতৃক বাড়ির উঠান, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অপেক্ষা কিংবা দাদা-দাদির স্মৃতিবিজড়িত ঘরটির কথা কি আমাদের মনে পড়ে? বাংলাদেশের পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতায় প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। নগরায়ণ, করপোরেট কর্মসংস্কৃতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বাণিজ্যিক পর্যটন আমাদের অবসরযাপনের ধরন বদলে দিয়েছে। এক সময় ছুটি মানেই ছিল গ্রামের বাড়িতে ফেরা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা ও পারিবারিক বন্ধন নতুন করে অনুভব করা। কিন্তু এখন বহুক্ষেত্রে অন্য চিত্র দৃশ্যমান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ভ্রমণ অনেক ক্ষেত্রে আনন্দের পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কোথায় গেলাম, কোন রিসোর্টে থাকলাম, কত সুন্দর ছবি তুললাম এসবের গুরুত্ব কখনো কখনো অভিজ্ঞতার আনন্দকেও ছাড়িয়ে যায়। ফলে অবসরও এক ধরনের সামাজিক প্রতিযোগিতায় পরিণত হচ্ছে। অন্যদিকে করপোরেট জীবন মানুষকে দক্ষতা ও পেশাগত সাফল্যের শিক্ষা দিলেও তৈরি করেছে সময়ের সংকট ও মানসিক চাপ। এই ক্লান্তি দূর করতে ভ্রমণের প্রয়োজন রয়েছে। তবে সবসময় প্রশান্তির জন্য নতুন গন্তব্য প্রয়োজন হয় না। কখনো বাবা-মায়ের পাশে বসে কথা বলা, পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা কিংবা গ্রামের পরিচিত পরিবেশে কয়েকটি দিন কাটানোই হতে পারে মানসিক পুনর্গঠনের সবচেয়ে সুন্দর উপায়। বাংলাদেশের গ্রাম কেবল একটি ভৌগোলিক জনপদ নয়; এটি আমাদের ভাষা, লোকসংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, পারিবারিক স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের আধার। দাদার হাতে লাগানো আমগাছ, বাবার শৈশবের পুকুর, দাদি-নানির গল্প কিংবা গ্রামের মেঠোপথ সবকিছুর মধ্যে লুকিয়ে থাকে বহু প্রজন্মের ইতিহাস। শহরে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্ম এসব স্মৃতি ও মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ না পেলে একসময় গ্রামের বাড়ি তাদের কাছে কেবল আত্মীয়ের একটি ঠিকানা হয়ে থাকবে। শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হলে মানুষ শুধু একটি জায়গা হারায় না; হারায় নিজের অতীতকে বোঝার গুরুত্বপূর্ণ জানালাও। গ্রামের প্রকৃতি, কৃষিকাজ, পুকুর, পাখি ও ঋতুবৈচিত্র্যের সঙ্গে পরিচিত হয়ে তারা বইয়ের জ্ঞানকে বাস্তব অভিজ্ঞতায় রূপ দিতে পারে। নবীন-প্রবীণ সবার জন্যই বিষয়টি আনন্দ ও মানসিক সঙ্গের উৎস।
পর্যটন অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। হোটেল, রিসোর্ট, ট্রাভেল এজেন্সি ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম মানুষের ভ্রমণ-আকাক্সক্ষাকে কেন্দ্র করে নতুন বাজার তৈরি করেছে। এতে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু আনন্দের প্রতিটি অভিজ্ঞতা যে অর্থ ব্যয় করে অর্জন করতে হবে, এমন ধারণা তৈরি হওয়া উচিত নয়। গ্রামের পুকুরঘাট, শীতের সকালের কুয়াশা, উঠানের গাছের ছায়া কিংবা পরিবারের সবাইকে নিয়ে গল্প করার আনন্দ কোনো পর্যটন প্যাকেজে কেনা যায় না। অন্যদিকে উৎসবের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে ফেরা স্থানীয় বাজার, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কারিগরদের অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করতে পারে। তাই প্রশ্নটি পর্যটন বনাম গ্রাম নয়, বরং আমাদের অবসর ব্যয়ের কতটা নিজস্ব সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিসরে পৌঁছাচ্ছে। গ্রামীণ জীবন মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত করে। ধানক্ষেত, নদী, বৃষ্টির গন্ধ, পাখির ডাক কিংবা সরিষার ফুলে ভরা মাঠ আমাদের শেখায় প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের মূল্য। গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখলে উন্নয়ন সম্পর্কেও উপলব্ধি গভীর হয়। বোঝা যায়, উন্নয়ন শুধু আয় বা অবকাঠামো নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীবনমান, সামাজিক নিরাপত্তা ও পরিবেশের ভারসাম্য। তবে সবাই ইচ্ছা করলেই গ্রামের বাড়িতে ফিরতে পারেন না। কারও পৈতৃক বাড়ি নেই, কারও বাবা-মা প্রয়াত, কারও পারিবারিক সম্পর্ক জটিল কিংবা আর্থিক ও পেশাগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কে কোথায় কোথায় ছুটি কাটাচ্ছেন, তা দিয়ে কারও পারিবারিক মূল্যবোধ বিচার করা উচিত নয়। প্রয়োজন ভ্রমণের স্বাধীনতা ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।
ছুটির পরিকল্পনায় পরিবারকে গুরুত্ব দেওয়া, শিশুদের পূর্বপুরুষ ও গ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করা, প্রবীণদের জীবনের গল্প সংরক্ষণ, স্থানীয় উৎপাদকদের সহযোগিতা এবং দূরে থেকেও নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা এসব ছোট উদ্যোগ পারিবারিক বন্ধনকে শক্তিশালী করতে পারে। কর্মক্ষেত্রেও পারিবারিক দায়িত্ব পালনের উপযোগী অবসর সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। রবীন্দ্রনাথের বহুল পরিচিত পঙ্্ক্তিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/একটি ধানের শিষের উপরে/একটি শিশিরবিন্দু।’ বিশ্ব দেখা থেকে বিরত থাকা নয়, বরং দূরের সৌন্দর্যের পাশাপাশি কাছের সৌন্দর্যকেও চিনতে শেখাই এই উপলব্ধির মূল কথা। আধুনিকতা মানে অতীতকে ভুলে যাওয়া নয়, অগ্রগতি মানে সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়। শেকড়ের সঙ্গে প্রজন্মের পরিচিতি যেন হারিয়ে না যায়। প্রজন্মের মধ্যে এই বোধ প্রোথিত করা খুব দরকার। আজ যে শিশু দাদির মুখে গল্প শোনার সুযোগ হারাচ্ছে, আগামীকাল সে হয়তো নিজের সন্তানের কাছে সেই গল্পগুলো বলার মতো কাউকে খুঁজে পাবে না। বিশ্বের মানচিত্রে আমাদের নতুন নতুন গন্তব্য যুক্ত হোক, কিন্তু জীবনের মানচিত্র থেকে গ্রামের বাড়ি, পারিবারিক উঠান আর শেকড়ের ঠিকানাটি যেন মুছে না যায়। কারণ সব যাত্রার উদ্দেশ্য নতুন কোথাও পৌঁছানো নয়। কিছু যাত্রার উদ্দেশ্য হলো, নিজের কাছে ফিরে আসা।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ, ঢাকা।
sadat.biology95@gmail.com