বিশ্বের ইতিহাসে যুদ্ধ কখনো শুধু সীমান্ত দখল, রাজনৈতিক আধিপত্য কিংবা সামরিক বিজয়ের লড়াই ছিল না; প্রতিটি বড় যুদ্ধের পেছনে রয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক ব্যয়, উৎপাদনব্যবস্থার বিপর্যয়, বাণিজ্যের পরিবর্তন এবং সাধারণ মানুষের দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) ইউরোপের অর্থনীতি ও শিল্পব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে। যুদ্ধ পরিচালনায় বিপুল সরকারি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ, মূল্যস্ফীতি এবং উৎপাদনশীল জনশক্তির ক্ষতি যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনকে কঠিন করে তোলে। জার্মানিসহ পরাজিত দেশগুলোর ওপর ক্ষতিপূরণের চাপ এবং ইউরোপের আর্থিক দুর্বলতা পরবর্তী দশকগুলোর অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার অন্যতম পটভূমি তৈরি করে। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫) মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়গুলোর একটি সৃষ্টি করে। ইউরোপ ও এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল, শিল্পকারখানা, বন্দর, রেলপথ, সেতু ও শহর ধ্বংস হয়ে যায়। যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে রাষ্ট্রগুলো বিপুল ঋণ গ্রহণ করে এবং উৎপাদনের বড় অংশ সামরিক খাতে নিয়োজিত করে। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী মার্শাল পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং নতুন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠনের মাধ্যমে ইউরোপের পুনর্গঠন শুরু হয়। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, যুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে শুধু অর্থ নয়, কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতাও প্রয়োজন।
পরবর্তী সময় কোরীয় যুদ্ধ (১৯৫০-১৯৫৩), ভিয়েতনাম যুদ্ধ (বিশেষত ১৯৫৫-১৯৭৫) এবং আফগানিস্তানের দীর্ঘ সংঘাত রাষ্ট্রীয় বাজেট, অবকাঠামো ও মানবসম্পদে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক ব্যয় দেশটির বাজেট ও মূল্যস্ফীতির বিতর্ককে তীব্র করে। অন্যদিকে আফগানিস্তানের কয়েক দশকের সংঘাত দেশটির উৎপাদন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিনিয়োগব্যবস্থাকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে দুর্বল করে দেয়। এসব যুদ্ধের প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা ছাড়িয়ে অস্ত্রের বাজার, জ্বালানি সরবরাহ, শরণার্থী প্রবাহ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যয়েও ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৯০-১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং ২০০৩ সালে শুরু হওয়া ইরাক যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্ব নতুন করে সামনে আনে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তেলের সরবরাহ ও দামের অনিশ্চয়তা বাড়ায়; একই সঙ্গে সামরিক অভিযান, দখল-পরবর্তী প্রশাসন এবং পুনর্গঠনে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। ২০০১ সালে শুরু হওয়া আফগানিস্তান যুদ্ধও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যয়ের দৃষ্টান্ত। এসব ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ সামরিক ব্যয়ের পাশাপাশি হারানো জীবন, বাস্তুচ্যুতি, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং বিনিয়োগের সুযোগ হারানোর মতো পরোক্ষ ক্ষতি অর্থনৈতিক হিসাবকে আরও বিস্তৃত করে। ২০১১ সালের পর সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ এবং অন্যান্য আঞ্চলিক সংঘাতও অবকাঠামো ধ্বংস, শরণার্থী সংকট ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের বিঘ্ন ঘটিয়েছে। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার ইউক্রেন আক্রমণ এই পুরনো বাস্তবতাকে নতুনভাবে সামনে আনে। তবে আধুনিক বিশ্বে সরবরাহ ব্যবস্থার পারস্পরিক নির্ভরতা বেশি হওয়ায় যুদ্ধের অভিঘাত দ্রুত আন্তর্জাতিক জ্বালানি, খাদ্য, সার, পরিবহন ও আর্থিক বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে যুদ্ধরত দেশগুলোর বাইরেও আমদানিনির্ভর অর্থনীতি ও সাধারণ ভোক্তারা মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ বহন করেন।
যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য শুধু অস্ত্র কেনা বা ধ্বংস হওয়া ভবন পুনর্নির্মাণের ব্যয়ে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে হারানো উৎপাদন, ঋণের বোঝা, মানবসম্পদের ক্ষয় এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সুযোগ নষ্ট হওয়া। তাই শান্তি প্রতিষ্ঠা কেবল মানবিক বা রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, দারিদ্র্য হ্রাস এবং টেকসই উন্নয়নেরও অপরিহার্য শর্ত। জ্বালানি, খাদ্য ও সারের মূল্যবৃদ্ধি থেকে পুনর্গঠন ব্যয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য দিচ্ছে গোটা বিশ্ব। কোভিড-১৯ মহামারী বিশ্ব অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলেছিল। উৎপাদন ও কর্মসংস্থান কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন, ঋণের চাপ এবং মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে দেশগুলো যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, তখন ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ নতুন সংকট তৈরি করে। যুদ্ধের অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে জ্বালানি, খাদ্যশস্য, সার ও শিল্পের কাঁচামালের আন্তর্জাতিক বাজারে। ফলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হয়, বাড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং চাপে পড়ে উন্নয়নশীল দেশগুলো। বিশ্বব্যাংকের ২০২২ সালের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ছিল আনুমানিক ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। যুদ্ধের আগেই ২০২২ ও ২০২৩ সালে প্রবৃদ্ধি কমে যথাক্রমে ৪ দশমিক ১ ও ৩ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। মহামারীর পুনঃপ্রাদুর্ভাব, সরবরাহ সংকট এবং নীতিগত সহায়তা প্রত্যাহারের পাশাপাশি যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
জ্বালানি ও খাদ্যবাজারে অস্থিরতা : রাশিয়া তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিভিন্ন ধাতুর গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। ইউক্রেনও গম ও ভুট্টাসহ কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও সরবরাহ পথের অনিশ্চয়তায় এসব পণ্যের দাম ও বাণিজ্যে অস্থিরতা দেখা দেয়। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পের ব্যয় বাড়ে; সারের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। শেষ পর্যন্ত এসব চাপ ভোক্তাদের ওপরও পড়ে। চার পক্ষের অর্থনৈতিক ব্যয়ের চিত্র যুদ্ধের আর্থিক মূল্য বোঝার জন্য প্রত্যক্ষ ক্ষতি, পুনর্গঠন ব্যয়, সামরিক ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক সহায়তাকে আলাদা করে দেখা জরুরি। নিচের পরিসংখ্যানগুলো বিভিন্ন সময়ের মূল্যায়ন; এগুলো একই সময়সীমার বা একই ধরনের ব্যয়ের হিসাব নয়। দেশ বা অঞ্চলপ্রধান অর্থনৈতিক ব্যয় ও আর্থিক হিসাবে দেখা যায় ইউক্রেন যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে জিডিপি প্রায় ২০ শতাংশ কমে যাওয়ার চিত্র বিভিন্ন প্রাথমিক মূল্যায়নে উঠে আসে। ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি ও পুনর্গঠনের প্রয়োজন নিয়ে বিশ্বব্যাংক, ইউরোপীয় কমিশন, জাতিসংঘ ও ইউক্রেন সরকারের যৌথ মূল্যায়নে পরবর্তী ১০ বছরে প্রয়োজন ধরা হয় ৫২৪ বিলিয়ন ডলার। এই হিসাব ২০২৫ সালের , তা ইতিমধ্যে ব্যয় হওয়া অর্থ নয়।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, সামরিক ব্যয় ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের পরিবর্তন রাশিয়ার অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে। তেল-গ্যাসের রপ্তানি বিকল্প বাজারে সরিয়ে কিছু আয় ধরে রাখা গেলেও প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল ব্যয় অন্যান্য সরকারি খাতের জন্য আর্থিক সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৫ সালের জানুয়ারির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে ইউক্রেনকে প্রায় ৬৯ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে; এর মধ্যে ২০২২ সালের পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর দেওয়া সহায়তাও অন্তর্ভুক্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইইউ ও এর সদস্য দেশগুলো ইউক্রেনের জন্য আর্থিক, সামরিক ও মানবিক সহায়তা এবং শরণার্থীদের সহায়তাসহ ২২৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে। ইউক্রেনের পুনর্গঠন ব্যয়ই যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বোঝার ব্যাপকতা তুলে ধরে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের মূল্যায়নে এই প্রয়োজন ৪৮৬ বিলিয়ন ডলার ছিল; ২০২৫ সালের মূল্যায়নে তা বেড়ে ৫২৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত সর্বশেষ যৌথ মূল্যায়নে পরবর্তী দশকের পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন আরও বেড়ে প্রায় ৫৮৮ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে যুদ্ধের প্রভাব বিভিন্ন পথে পৌঁছায়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গম, সার ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়ে এবং বিনিময় হার, মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদন ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সুদের হার বাড়লে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ গ্রহণও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো খাদ্য ও জ্বালানির জন্য আয়ের বড় অংশ ব্যয় করে। তাই এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি তাদের প্রকৃত আয় ও জীবনযাত্রার মানকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং রয়েছে মানবিক বিপর্যয়ের দীর্ঘমেয়াদি মূল্যও। যুদ্ধের ক্ষতি শুধু ধ্বংস হওয়া অবকাঠামো বা সরকারি ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাস্তুচ্যুতি, কর্মসংস্থান হারানো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিঘ্ন এবং মানুষের মানসিক আঘাত দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিতে পারে। ইউক্রেনের বাড়িঘর, পরিবহন, জ্বালানি ও শিল্প অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে বিপুল অর্থ প্রয়োজন হওয়ায় দেশটির উন্নয়ন অগ্রাধিকারও দীর্ঘ সময় ধরে পুনরুদ্ধারকেন্দ্রিক থাকতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, খাদ্য ও জ্বালানির বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা জরুরি। বাংলাদেশের জন্যও জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার, কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কোভিড-১৯ দেখিয়ে দিয়ে গেছে, একটি বৈশ্বিক সংকট দ্রুত অন্য দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। যুদ্ধের মূল্য শুধু যুদ্ধরত দেশগুলোর নয়; এর অভিঘাত লাগে আন্তর্জাতিক বাজার, সরকারি বাজেট এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ে। আমরাও এর বাইরে নই। এর মাশুল নানাভাবে গুনতে হয়েছে এবং হচ্ছে। শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করা এ কারণে শুধু রাজনৈতিক প্রয়োজন নয়, বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্যও অপরিহার্য শর্ত।
লেখক : কমনওয়েলথ স্কলার। অর্থনীতি ও সমাজ বিশ্লেষক। অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।