মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা এক বিশাল বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছেন। গতকাল শনিবার দুপুর ২টা ৩০-এর দিকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের জেরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে প্রায় তিন ঘণ্টা যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। আন্দোলনকারী শ্রমিকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে গেলে পুলিশের সঙ্গে তাদের ব্যাপক সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস (টিয়ার শেল) ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের ঘটনায় বেশ কয়েকজন শ্রমিক ও পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ওই এলাকার বেশ কয়েকটি কারখানা সাময়িক ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, গতকাল দুপুরে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার ‘ইন্টারস্টপ অ্যাপারেলস’সহ আশপাশের কয়েকটি তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে জড়ো হতে থাকেন। শ্রমিকদের মূল দাবি, বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সংগতি রেখে তাদের ন্যূনতম মাসিক মূল বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। দুপুরের শিফট শেষে বা মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পরপরই শ্রমিকরা কারখানা থেকে বেরিয়ে এসে পল্লী বিদ্যুৎ মোড়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের ওপর অবস্থান নেন। মুহূর্তের মধ্যে হাজারো শ্রমিক রাস্তায় নেমে এলে যান চলাচল পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে।

অবরোধের খবর পেয়ে শিল্প পুলিশ ও কালিয়াকৈর থানা-পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ প্রথমে শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে শ্রমিকরা তাদের দাবিতে অনড় থেকে স্লোগান দিতে থাকেন এবং সড়ক ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায়ে বিকেল ৪টার দিকে পুলিশ শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিপেটা শুরু করলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।

উত্তেজিত শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুঁড়তে শুরু করেন। চন্দ্রা এলাকাটি মুহূর্তের মধ্যে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে এবং মহাসড়ক সচল করতে মুহুর্মুহু কাঁদানে গ্যাসের সেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুঁড়ে শ্রমিকদের ধাওয়া করে। শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গলি এবং আশপাশের শপিং মল ও ভবনের আড়ালে অবস্থান নিয়ে পাল্টা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। এই ত্রিমুখী সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া বিকেল ৫টা ৩০ পর্যন্ত দফায় দফায় চলে।

ঘটনায় ব্যাপক জনভোগান্তি হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় তিন ঘণ্টা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোর বন্ধ থাকায় চন্দ্রা মোড়কে কেন্দ্র করে উভয়পাশে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। শত শত দূরপাল্লার বাস, ঢাকামুখী ট্রাক এবং সাধারণ যানবাহন রাস্তায় আটকে পড়ে। নারী, শিশু ও বয়োবৃদ্ধ যাত্রীরা চরম দুর্ভোগের শিকার হন। অনেকে বাধ্য হয়ে বাস থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হন।

এদিকে চন্দ্রা এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম অবনতি হওয়ায় এবং অনাকাক্সিক্ষত সহিংসতা এড়াতে পল্লী বিদ্যুৎ ও চন্দ্রা জোনের অন্তত পাঁচ থেকে ছয়টি বড় পোশাক কারখানা বিকেলের শিফটের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।

মজুরির বৃদ্ধির দাবি ও আন্দোলন পরিস্থিতির বিষয়ে বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিগত সময়ে ৫ বছর পর মজুরি বোর্ড গঠন করা হতো। কিন্তু নতুন আইনে ৩ বছর পর পর মজুরি বোর্ড গঠনের কথা বলা হয়েছে। সরকারও আইনগতভাবে সে দিকে যাচ্ছে। এর আগে শ্রমিক আন্দোলন একটি গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে আমরা দেখি। কারণ তাদের দাবি ও প্রস্তাব কারখানা মালিক ও সরকারের কাছে সরাসরি পৌঁছানোর মাধ্যম অনেক ক্ষেত্রে থাকে না। সেক্ষেত্রে শ্রমিক সংগঠন বা ইউনিট তাদের কর্মসূচির মাধ্যমে দাবি উত্থাপন করে থাকে। এক্ষেত্রে জনভোগান্তি আমরা কামনা করি না। এ ছাড়া সরকারের সঙ্গে মালিক ও শ্রমিক পক্ষের আলাপ আলোচনা শুরু হয়েছে, আগামীকাল (আজ) মজুরি বোর্ড গঠন হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে সব পক্ষের প্রতিনিধিদের আলোচনা, পর্যালোচনার ভিত্তিতে একটি মজুরি কাঠামো ঠিক হবে। তবে- আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় সময় উপযোগী বেতন কাঠামো যাতে গঠন হয়। যা শ্রমিকদের স্বস্তি দিবে। পাশাপাশি- শ্রমিক ভাই-বোনদের প্রতি আহ্বান থাকবে, যাতে কোনো চক্রের সড়যন্ত্রে যুক্ত না হয়। যৌক্তিক দাবিকে একটি পক্ষ রক্তাক্ত আন্দোলনে রূপ দিতে কাজ করছে। যা দেশ ও অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি কারখানা মালিক ও শ্রমিক নেতাদের প্রতি আহ্বান থাকবে, শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবির আন্দোলন যাতে কোনো মহল অন্য খাতে প্রভাবিত করতে না পারে।