দেশে পেঁয়াজ, আলু, ধান, ডাল জাতীয় শস্য এবং আম যে পরিমাণে উৎপাদন হয় তার প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ নষ্ট হয় (উৎপাদন পরবর্তী ক্ষতি)। অর্থের হিসেবে এ ক্ষতির পরিমাণ কমপক্ষে ২০ হাজার কোটি টাকা। এরমধ্যে শুধুমাত্র পেঁয়াজেই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। ফসলের ক্ষতি কমাতে এবার বাণিজ্যিকভাবে বিকিরণ প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করল কৃষি বিভাগ। বিজ্ঞানীদের মতে নির্দিষ্ট মাত্রায় বিকিরণ পদ্ধতিতে পেঁয়াজের সংরক্ষণ ক্ষমতা ৬ মাস, রসুনে ১২ মাস, আলু ৬ মাস, পেঁপে ১৫ দিন থেকে ৪ সপ্তাহ, স্ট্রবেরি ৫ দিন থেকে ৩ সপ্তাহ, আম ও কলা ১০ দিন থেকে ৩ তিন সপ্তাহ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।
গতকাল শনিবার গাজীপুরের ভবানীপুরে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) আঞ্চলিক গবেষণা স্টেশনে নবনির্মিত গামা ইরেডিয়েশন (বিকিরণ প্রযুক্তি) সেন্টারের উদ্বোধন করা হয়েছে। বিনা নির্মিত এই সেন্টারে বিকিরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষিপণ্যের দ্রুত পচন রোধ করে শেলফ লাইফ বৃদ্ধি, জীবানুমুক্ত করা এবং গুণমান ঠিক রাখাই মূল উদ্দেশ্য। যা দেশে পণ্যের সরবরাহ শক্তিশালী করার পাশপাশি রপ্তানি বাজারেও চাহিদা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানিরা।
কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিনার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে প্রতি বছর যে পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয় তা থেকে অন্তত ৪ থেকে ৫ লাখ টন নষ্ট হয়ে যায়। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। চাহিদার বিপরীতে যথেষ্ট পেঁয়াজ উৎপাদন হলেও এভাবে ক্ষতি হওয়ায় প্রতি বছর পেঁয়াজ আমদানি করে চাহিদা সামাল দিতে হয়। তবে বিকিরণ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এই ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ। গবেষণার তথ্য বলছে, শুধু পেঁয়াজই নয়, প্রতি বছর আলু, ধান, ডাল জাতীয় পণ্যের উৎপাদন পরবর্তী বড় একটি অংশ নষ্ট হয়ে যায়। আমের ক্ষেত্রে এই পরিমাণটা সবচেয়ে বেশি। উৎপাদিত আমের অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। সবজিতে এই ক্ষতির পরিমাণ কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত।
শুধু উৎপাদিত কৃষি পণ্যই নয়, প্যাকেটজাত কৃষিপণ্য ও খাদ্যদ্রব্যে নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় গাম-রে, এক্স-রে, কিংবা ইল্কেট্রন বিম প্রয়োগ করা হয়। এতে করে পণ্যে থাকা ক্ষতিকর পোকা ও কীটপতঙ্গ, পরজীবী, রোগজীবাণু এবং অণুজীব ধ্বংস হয় এবং এর পচন রোধ হয়। এতে সংরক্ষণের সময়কাল বৃদ্ধি পায় এবং ফসলের সংগ্রহোত্তর ক্ষতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে আনা যায়।
বিনার তথ্য বলছে, এই প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে বিশে^র বিভিন্ন দেশের ন্যায় এখন বাংলাদেশেও খাদ্য নিরাপত্তা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের পথ তৈরি হলো। পাশাপাশি বিশ^বাজারে কৃষিপণ্য রপ্তানিতে একটি গতি আসবে। কারণ আমদানিকারক দেশগুলোর কৃষিপণ্য আমদানির অন্যতম একটি শর্তই ছিল এই প্রযুক্তির ব্যবহার।
জানা গেছে, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (বিএইসি) অধীনন্থ পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (এইআরই) দুটি গামা বিকিরণ প্ল্যান্ট ব্যবহার হচ্ছে সাভারে। এখানে রপ্তানিমুখী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওষুধ ও মসলা জাতীয় পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাণিজ্যিকভাবে সীমিত পরিসরে সেবা দেওয়া হয়। কিন্তু দেশে কৃষিপণ্য ও খাদ্যদ্রব্যে প্রযুক্তিটির ব্যবহার নেই।
প্রতিবেশী দেশ ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে এই প্রযক্তির ব্যবহার প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় ১১৫ কোটি টাকার অর্থায়নে গাজীপুরের তিন একর জমির পের বিনার আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্রে ৫০০ কেসিআই ক্ষমতাসম্পন্ন এই সেন্টারটি স্থাপন করা হয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে এই কেন্দ্রটি ব্যবহার হবে। এতে প্রতি বছর ৮৫ হাজার টন পণ্যে বিকিরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব।
প্রযুক্তির ব্যবহারে কোন পণ্য কত দিন সংরক্ষণ করা যাবে : বিনার বিজ্ঞানীরা জানান, নির্দিষ্ট মাত্রায় বিকিরণ পদ্ধতির পেঁয়াজে নির্দিষ্ট মাত্রায় বিকিরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করার মাধ্যমে ৬ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। একইভাবে রসুনে ১২ মাস, আলু ৬ মাস, পেঁপে ১৫ দিন থেকে ৪ সপ্তাহ, স্ট্রবেরি ৫ দিন থেকে ৩ সপ্তাহ, আম ও কলা ১০ দিন থেকে ৩ তিন সপ্তাহ পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়। এ ছাড়া শাক-সবজির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোয়ারেন্টাইনের শর্ত পরিপালন হয়, যা রপ্তানিতে বড় ভূমিকা পালন করবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশীদ বলেন, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণক্ষমতা (সেলফ লাইফ) বাড়ানো, জীবাণুমুক্তকরণ এবং গুণগত মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এর মাধ্যমে দেশের কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, দেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। বর্তমান সরকার কৃষিপণ্যকে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে কাজ করছে। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আমের গুণগত মান ভালো। গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব আমের সংরক্ষণক্ষমতা বাড়ানো ও জীবাণুমুক্ত করা সম্ভব হলে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির পরিমাণ বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি চীন থেকে আসা একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের আম আমদানিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁঠালেরও ব্যাপক চাহিদা ও খাদ্যগুণ রয়েছে। তবে এসব পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা জরুরি। এ লক্ষ্য পূরণে গামা ইরেডিয়েশন সেন্টার সময়োপযোগী উদ্যোগ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিনা মহাপরিচালক ড. সারফুল হক ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ডা. এসএম রফিকুল ইসলাম, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান, বাংলাদেশে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রতিনিধি ডা. জিয়াওকুন শি প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।