দীপ রিমান্ডে, ৫ প্রশ্নের বেড়াজালে হত্যারহস্য

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কেএম তাহসিফ সাউরি হত্যার ঘটনায় তার ‘বন্ধু স্থানীয় ছোটভাই’ আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে নৌপুলিশ। গতকাল শনিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াসের আদালত এ আদেশ দেয়। এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন অভিযুক্ত দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।

তদন্তসূত্রে জানা যায়, রিমান্ডে দীপের কাছ থেকে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হবে। সেগুলোর উত্তর পাওয়ার পর দীপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। তদন্ত সংস্থা দীপের কাছে জানতে চায় ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত তাহসিফ ও দীপ কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন? তাহসিফের মোটরসাইকেল টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় কেন এবং কীভাবে গেল? তাদের সঙ্গে অন্য কেউ ছিল কি না, থাকলে তাদের পরিচয় কী? তাহসিফের মৃত্যু পানিতে ডুবে, শ্বাসরোধে, না কি অন্য কোনো কারণে হয়েছে? তাকে কোথায় এবং কী পরিস্থিতিতে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে? রাত ১টা ৩৫ মিনিটে পাঠানো ভয়েস মেসেজটি কে পাঠিয়েছিল এবং তখন তাহসিফ কোথায় ছিলেন? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সংস্থাটি দীপের জবানবন্দি, দুজনের মোবাইলের কল রেকর্ড, লোকেশন ডেটা, সিসিটিভি ফুটেজ, মোটরসাইকেলের ফরেনসিক পরীক্ষা এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করা হবে।

তাহসিফের বাবা কেএম এনায়েতুল করিম গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর উত্তরখান থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেছেন। পরে ওই মামলায় দীপকে সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। মামলার এজাহার ও পুলিশের রিমান্ড আবেদনে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার আগের ঘটনা, বন্ধুর সঙ্গে বের হওয়া, পরিবারের সঙ্গে শেষ যোগাযোগ এবং তুরাগ নদ থেকে মরদেহ উদ্ধারের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। মামলায় দীপকে আসামি না করার বিষয়ে জানতে চাইলে তাহসিফের বাবা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ হত্যাকা-ের পেছনে কে আছে, সেটা তো আমি জানি না। তাহলে আমি কীভাবে একজনকে দোষী সাবস্ত করব? তদন্ত সংস্থা সুষ্ঠু তদন্ত করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করবে বলে বিশ্বাস করি।

এজাহারে শেষ রাতের ঘটনা : মামলার এজাহারে বাদী কেএম এনায়েতুল করিম উল্লেখ করেন, তাহসিফকে গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার পর দীপ নামে এক জুনিয়র বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যান। রাত গভীর হলেও ছেলে বাসায় না ফেরায় তার মা বারবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। ফোনে কথা হলে তাহসিফ কিছুক্ষণের মধ্যে বাসায় ফেরার কথা জানান। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফের ফোন থেকে ম্যাসেঞ্জারে তার মায়ের ফোনে একটি ভয়েস মেসেজ আসে। সেখানে বলা হয়, ‘রওনা দিয়েছি, আসছি।’ কিন্তু এরপর রাত পেরিয়ে পর দিন বিকেল হলেও তিনি বাসায় ফেরেনি। পর দিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে উত্তরখান থানা এলাকার নৌপুলিশ রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের কথা পরিবারকে জানায়।

এজাহারে হত্যা ও আলামত গোপনের ধারা : মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে তাহসিফের বাবা এজাহারে সরাসরি দীপ কিংবা অন্য কাউকে হত্যার জন্য দায়ী করেননি। তিনি মূলত ছেলের মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটন এবং সুষ্ঠু তদন্তের আবেদন করেছেন। বাবার দেওয়া আবেদন এজাহার হিসেবে গ্রহণ করে পুলিশ দন্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারা যুক্ত করেছে। ৩০২ ধারায় হত্যা, ২০১ ধারায় অপরাধের আলামত গোপন বা বিনষ্ট এবং ৩৪ ধারায় অভিন্ন অপরাধমূলক অভিপ্রায়ে একাধিক ব্যক্তির অপরাধের বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পরিবারের আবেদনে নির্দিষ্ট কাউকে অভিযুক্ত না করা হলেও পুলিশ হত্যার অভিযোগে মামলা রুজু করেছে।

যে কারণে দীপকে রিমান্ডে চেয়েছে পুলিশ : তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আবেদনে পাঁচটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাহসিফ হত্যার পেছনের মূল রহস্য ও হত্যার উদ্দেশ্য উদ্ঘাটন; হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত অজ্ঞাতপরিচয় অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার; হত্যাকান্ডের প্রয়োজনীয় আলামত উদ্ধার; তাহসিফের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল উদ্ধার এবং হত্যাকান্ডের প্রকৃত স্থান ও কোথায় সংঘটিত হয়েছে তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা। রিমান্ড আবেদনে পুলিশ দাবি করেছে, প্রাথমিক তদন্তে দীপের হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়া ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন এবং অন্যদের শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে বলে জানানো হয়। শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিউকিউটর আজিজুল হক দিদার রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। আইনজীবী মনিরুল ইসলাম ও মুতাসিম বিল্লাহ আসামি দীপের পক্ষে শুনানি করেন। তারা আদালতকে জানান, দীপের সঙ্গে নিহতের ছয় বছরের সম্পর্ক। ইতিমধ্যে দুই দিন ধরে তিনি পুলিশের হেফাজতে আছেন। আমরা মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার। আমরা তার (দীপ) জামিন চাইনি। তবে জিজ্ঞাসাবাদ যাতে ‘সতর্কতার’ সঙ্গে করা হয়, সেই নিবেদন করছি।

মাঝরাতে কোথায় যান তারা : তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ঘটনার দিন তাহসিফ ও দীপের যাতায়াতের স্থান। এর আগে দীপ দাবি করেছিলেন, তারা একসঙ্গে রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খেয়েছেন। পরে উত্তরা হাউজ বিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান তিনি। কিন্তু পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় তাহসিফের সঙ্গে যাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। পিবিআইয়ের অনুসন্ধানে দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টঙ্গীর ওই এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া পিবিআই কর্মকর্তারা দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করেন। সেখানে তাহসিফের যাতায়াত, মোটরসাইকেল রেখে আসার কারণ এবং তাদের সঙ্গে অন্য কেউ ছিল কি না, এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে।

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে তার সঙ্গে সর্বশেষ বের হওয়া বন্ধু দীপ। তবে পরিবারের এজাহারে তার বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ না থাকলেও পুলিশের সন্দেহের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। চার দিনের রিমান্ডে দীপের বক্তব্য, উদ্ধার হওয়া আলামত এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফল মিলিয়ে মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য কী উন্মোচিত হয়, এখন সেদিকেই নজর তদন্তসংশ্লিষ্টদের।

এদিকে তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুতে গভীর উদ্বেগ ও শোক প্রকাশ করছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানায় সংগঠনটি।