এইচএসসিতে বিপর্যয়

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:১৬ এএম

দেশের উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার নেমে এসেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। গত ২২ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। একই সঙ্গে বেড়েছে শতভাগ অকৃতকার্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। এবারের এইচএসসির ফল খারাপ হতে পারে এমন ইঙ্গিত গত বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে যে প্রশ্ন রয়েছে, এবারের ফল তা আরও জোরালো করেছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা ও পাঠ্যবইয়ের ওপর দখল কতটা রয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

ফলে বড় ধস : এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেন ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। গত বছর এই হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশীয় পয়েন্ট। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ফল বিশ্লেষণ করলে পরিস্থিতির আরও স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। এসব বোর্ডে পাসের হার ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ। কৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৪১ হাজার ২৪৯ জন। এর আগে ২০০৪ সালে ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৪৮১ পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হন ২ লাখ ৩০ হাজার ৭৮৭ জন এবং অকৃতকার্য হন ২ লাখ ৫২ হাজার ৬৯৪ জন। পাসের হার ছিল ৪৭.৭৩ শতাংশ।

অকৃতকার্যের ৬৯ শতাংশই মানবিকের : এ বছর এইচএসসিতে সবচেয়ে খারাপ ফল করেছেন মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে যত শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন, তাদের প্রায় ৬৯ শতাংশই মানবিক বিভাগের। শিক্ষা বোর্ড থেকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ মিলিয়ে মোট ৫ লাখ ৭ হাজার ২৮১ পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। এর মধ্যে মানবিক বিভাগেরই ৩ লাখ ৫১ হাজার ৪২৪ জন। অর্থাৎ মোট অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীর ৬৯ দশমিক ২৭ শতাংশ মানবিকের।

ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে মোট ১ লাখ ৬৭ হাজার ১৬৬ জন পরীক্ষায় অংশ নেন। তাদের মধ্যে পাস করেছেন ৮৪ হাজার ৮৬৪ জন। গড় পাসের হার ৫০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। বিজ্ঞান ও গার্হস্থ্য বিজ্ঞান বিভাগের ২ লাখ ৭৩ হাজার ৬২৯ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ২ লাখ ৭৪ জন। এই বিভাগে গড় পাসের হার ৭৩ দশমিক ১২ শতাংশ।

২৯৩ প্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করেননি : এবারের ফলাফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। ৯ হাজার ৩৯০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শতভাগ পাস করেছে মাত্র ১৩৯টি প্রতিষ্ঠান। বিপরীতে ২৯৩টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করেননি। গত বছরের তুলনায় শতভাগ অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি।

ইংরেজি-আইসিটির ফলে ধস : এবার ফলাফলে ধসের পেছনে বড় কারণ ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া। এ দুই বিষয়ে মোট ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। এর মধ্যে ইংরেজিতে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন।

পাসের হারে সবচেয়ে কম বরিশাল : ১১টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাসের হারে শীর্ষে অবস্থান করছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড, পাসের হার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। আর পাসের হারে পিছিয়ে আছে বরিশাল শিক্ষা বোর্ড, পাসের হার ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

এক মাসের মধ্যে পরীক্ষার সুযোগ : সর্বোচ্চ এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া পরীক্ষার্থীরা এক মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবেন। এবারে এক ও দুই বিষয়ে ফেল করা পরীক্ষার্থী ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন। বর্তমানে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় কোনো পরীক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হলে তাকে এক বছর পর (পরের বছরের পরীক্ষায়) আবার পরীক্ষায় বসতে হয়।

পাসের হারে ছাত্রীরা, জিপিএতে ছাত্ররা এগিয়ে : পাসের হারে ছাত্রীরা এগিয়ে, যা ৫৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। আর ছাত্রদের পাসের হার ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অন্যদিকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে ছাত্র ২০ হাজার ৩৬৩ জন, আর ছাত্রী ১৯ হাজার ৭২১ জন।

জিপিএ-৫ কমেছে ক্যাডেট কলেজে : গত বছর দেশের ১২টি ক্যাডেট কলেজের মধ্যে ১০টির সব পরীক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেলেও এবার সেই সংখ্যা কমে ছয়টিতে নেমে এসেছে। এবার ক্যাডেট কলেজের ৫৭৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫৪৩ জন জিপিএ-৫ পেয়েছেন। এর মধ্যে ছয়টি ক্যাডেট কলেজের সব পরীক্ষার্থীই জিপিএ-৫ পেয়েছেন। কলেজগুলো হলো বরিশাল, সিলেট, রংপুর, রাজশাহী, মির্জাপুর ও ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ।

মাদ্রাসায় ৩,২৫০ জিপিএ-৫, কারিগরিতে ৮৮৬ : এবার মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩ হাজার ২৫০ জন, পাসের হার ৬১ দশমিক ০৭ শতাংশ। কারগরি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৮৮৬ জন। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে গত বছর পাসের হার ছিল ৭৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। আর জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৪ হাজার ২৬৮ জন। অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার গত বছর ছিল ৬২ দশমিক ৬৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ১ হাজার ৬১০ জন।

কেন এমন ফল? : এবারের ফলকে বিপর্যয় বলতে নারাজ বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, যার যা প্রাপ্য তাকে তা দেওয়া হয়েছে। আপনি কলেজগুলোতে গেলে দেখবেন গড়ে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস করে না। পড়াশোনা না করলে তো ফল খারাপ হবেই। তা ছাড়া গত দুই বছর মূল্যায়নে কড়াকড়ি আরোপ করলেও একই সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানের উন্নয়ন হয়নি।

এবারের ফলকে ভয়াবহ বিপর্যয় হিসেবে দেখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মজিবুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১২ বছর পড়াশোনা করে অর্ধেক পরীক্ষার্থী ফেল করবে, এটা হতে পারে না। এর পেছনে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষকদের শেখানোর পদ্ধতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান সবকিছুই দায়ী। কোভিডের সময় শিক্ষার্থীরা যে পড়াশোনা বিমুখ হয়েছিল তা কাটিয়ে উঠতে আমাদের কোনো উদ্যোগ ছিল না।

এই ফলকে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী সবার সম্মিলিত ব্যর্থতা হিসেবে অবহিত করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং এমপিও ধরে রাখতে নম্বর বাড়িয়ে দিতেন শিক্ষকরা, আর ক্রেডিট নিতে কৃত্রিমভাবে নম্বর বাড়িয়ে দিতে উৎসাহ দিত সরকার। কিন্তু এবার যে ফল হয়েছে তা নিয়ে আমাদের সিরিয়াস ভাবতে হবে।

ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন শতভাগ নির্মোহভাবে করা হয়েছে। পূর্বের সময়ে খাতা মূল্যায়নে কৃত্রিম জিপিএ-৫ বা পাসের হার বৃদ্ধির প্রবণতা পরিহার করে শতভাগ মেধানির্ভর ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে।

এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শেখায় যে ঘাটতি ছিল, সেটা পরিলক্ষিত হয়েছে। আগামী দিনে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। গতবারের চেয়ে পাসের হার আরও কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রথমত এই কমে যাওয়াটা গ্রহণযোগ্য নয়। শিখনপদ্ধতিতে ঘাটতি রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে যে ঘাটতি রয়েছে, সেটা পুনর্নির্ধারণ করতে হবে এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে, এটা তাদের দায়িত্ব।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত