বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শুধু আলোচনাতেই

সর্বোচ্চ আদালতে বিচার বিভাগকে সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথককরণের রায় হয়েছিল ২৭ বছর আগে। সরকারের নথিপত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার বিভাগ পৃথক হয় ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর। কিন্তু ‘বাস্তবতা হলো, আগে কথা হলেও কয়েক দশক ধরে ‘রাজনৈতিক’ সিদ্ধান্তের বেড়াজাল থেকে মুক্ত হতে পারেনি রাষ্ট্র পরিচালনার তিনটি অপরিহার্য বিভাগের একটি বিচার বিভাগ তথা অধস্তন আদালত। মামলার জট ও বিচারপ্রত্যাশীদের অনিঃশে^ষ দুর্ভোগ নিয়ে যত কথা উঠে, তার সঙ্গে উঠে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রসঙ্গ। বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থাকলেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার আলোচনা এখন ‘নিশ্চল’ বা গতিহীন।

প্রাপ্ত পরিসংখ্যান বলছে, উচ্চ ও অধস্তন আদালতে মামলা বেড়ে এখন তা ৫০ লাখ ছুঁই ছুঁই। এর মধ্যে অধস্তন আদালতে ৪১ লাখের বেশি দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন। অথচ প্রতিবছর উচ্চ ও অধস্তন আদালতে উল্লেখযোগ্য হারে মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে, কিন্তু ‘জটের স্রোত থামছে না। দুই যুগের বেশি সময় আগে ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সরকারিভাবে পৃথককরণের ঘোষণা হয়। কিন্তু ‘আপিল বিভাগের রায় ও ১৯ বছর আগে সরকারি সিদ্ধান্ত প্রায় কাগজে কলমেই রয়ে গেছে। অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা মূলত নির্বাহী বিভাগ তথা আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকায় বিচার বিভাগ নিয়ে এখনো চলছে ‘দ্বৈত শাসন’ নীতি।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর বিচার বিভাগ নিয়ে আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম। কিন্তু ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার বিচার বিভাগ নিয়ে তাদের প্রতিশ্রুতি ও নির্বাচনী ইশতেহার থেকে সরে এসেছে। বিচার বিভাগ নিয়ে আলোচনা অতলে চলে গেছে।’ তিনি বলেন, বিচার বিভাগে সবচেয়ে বড় সংকট প্রয়োজনের অনুপাতে বিচারক নেই। যারা আছেন তাদের অনেককে এজলাস ভাগাভাগি করে বিচারকাজ করতে হয়। এতে বড় রকমের সমস্যায় পড়ছেন বিচারপ্রত্যাশীরা। শরীফ ভূঁইয়া বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের হাতে পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা থাকলে অনেক সমস্যার সমাধান হতো। কিন্তু ‘নিকট ভবিষ্যতে সরকার এ নিয়ে ভাববে, সে সম্ভাবনাও এখন আর দেখা যাচ্ছে না।’

সুপ্রিম কোর্ট থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, ২০০৭ সালে উচ্চ ও অধস্তন আদালতে বিচারাধীন দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা ছিল সাড়ে ১৫ লাখের মতো। আর গত জুন পর্যন্ত দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালতগুলোতে ৪৮ লাখ ৫৫ হাজার ২৪৪ মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে অধস্তন আদালতে বিচারাধীন ৪১ লাখ ৪২ হাজার ৭৭ মামলা। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ৩৮ হাজার ৬৫১টি এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৬ লাখ ৭৪ হাজার ৫১৬ মামলা বিচারাধীন। অর্থাৎ বিচার বিভাগ পৃথককরণের পর ১৯ বছরে তিনগুণের বেশি মামলা বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল এ মামলার জট নিরসনে যত সংখ্যক বিচারক প্রয়োজন তার অর্ধেকও নেই। আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অধস্তন আদালতে বিচারক আছেন প্রায় ২ হাজার ৩৭৫ জন। এদের মধ্যে প্রেষণে সুপ্রিম কোর্টসহ বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত আছেন প্রায় আড়াইশ বিচারক। অর্থাৎ অধস্তন বিভিন্ন আদালতে ২ হাজার ১০০ বিচারক সামলাচ্ছেন ৪১ লাখের বেশি মামলা।

হতাশার ১১৬ অনুচ্ছেদ ও সচিবালয় :

সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে অধস্তন আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতিদান ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) শৃঙ্খলা বিধানের বিষয়টি রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। মূলত সাচিবিক এ কাজগুলো করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। বহুদিন ধরেই সংবিধানের এ বিধানকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অন্তরায় মনে করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বিচার সংশ্লিষ্টরা। এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সাংবিধানিক বৈধতা ও ২০১৭ সালে প্রণীত বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (ডিসিপ্লিনারি) রুলস নিয়ে প্রশ্ন তুলে রুল দেয় হাইকোর্ট।

গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ এক রায়ে বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করে। পাশাপাশি ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত দেয় হাইকোর্ট। একই রায়ে হাইকোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেয় যে, রায়ের আদেশপ্রাপ্তির তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বাধীন পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মূলত এ রায়ের আলোকে ওই বছরের ৩০ নভেম্বর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ শিরোনামে একটি অধ্যাদেশ জারি করে তখনকার অন্তর্বর্তী সরকার। এতে অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ক্ষমতা চলে আসে সুপ্রিম কোর্টের হাতে।

অন্যদিকে হাইকোর্টের রায়ের অনুলিপি প্রকাশ হয় একই বছরের ৭ এপ্রিল। যদিও এর আগে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে একটি ভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। সেখানে প্রেষণে বিচারিক কর্মকর্তাদেরও নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের এ যাত্রা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। চলতি বছরের ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল’ পাস করে সরকারি দল বিএনপি। বিলুপ্ত হয়ে যায় সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। এর কিছুদিন পর আইন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে সচিবালয়ের ১৫ বিচারিক কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগে সংযুক্ত করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট আবেদন হলেও অদ্যাবধি এর শুনানি শুরু হয়নি। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ জুন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়ে আপিল শুনানির দিন ধার্য করে আপিল বিভাগ। তবে, এখন পর্যন্ত আপিলের শুনানি শুরু হয়নি।

হাইকোর্টে ১১৬ অনুচ্ছেদের বৈধতা ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বাতিলের বিরুদ্ধে রিটকারীর পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির দেশ রূপান্তরকে বলেন, অধস্তন আদালতের সংকট নিরসনে অন্তত ৫ হাজার বিচারক প্রয়োজন, যেটি সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় থাকলেই সম্ভব হবে। তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগ নিয়ে হাইকোর্টের রায় অকার্যকর করার মাধ্যমে পৃথককরণ সম্পূর্ণ বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। এতে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে চলে গেছে। ফলশ্রুতিতে বিচার বিভাগের স্বাধীনভাবে কার্যসম্পাদন ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’ যত দ্রুত সম্ভব পৃথক সচিবালয় সংক্রান্ত মামলার আপিল ও অন্য শুনানি শুরুর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষ শুনানিতে আগ্রহ দেখায় না। বরং শুনানির জন্য তালিকায় এলেও তারা সময়ের আরজি জানায়। রাষ্ট্রপক্ষের এ ধরনের আচরণ পরিবর্তন হওয়া উচিত।’

বিচার বিভাগের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলেও সাড়া মেলেনি। অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিচার বিভাগ এখনো নির্বাহী বিভাগ থেকে পুরোপুরি পৃথক হয়নি, এটা ঠিক। কিন্তু বিচার বিভাগ  নিয়ে যেসব কারণে প্রশ্ন জাগে, সে ধরনের ব্যত্যয় আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখিনি।’ তিনি বলেন, ‘আসলে বিচার বিভাগকে যতই স্বাধীন করা হোক না কেন, বিচারকদের মানসিকতারও পরিবর্তন করতে হবে।’ 

আক্ষেপের মাসদার হোসেন মামলার রায় :

১৯৯৫ সালে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বেতন গ্রেড একধাপ নামিয়ে আনার জেরে হাইকোর্টে রিট মামলা হয়। এতে বিচারকদের প্রশাসনের ক্যাডারভুক্ত (বিসিএস) করার বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করেন তখনকার বিচারক মাসদার হোসেনসহ অন্য বিচারকরা। সরকারের সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে রুল দেয় হাইকোর্ট। ১৯৯৭ সালের ৭ মে রুল মঞ্জুর করে রায় দেয় হাইকোর্ট। পাশাপাশি জুডিশিয়াল সার্ভিসকে স্বতন্ত্র সার্ভিস করতে আদেশ হয়। পরে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ জুডিশিয়াল সার্ভিসকে স্বতন্ত্র সার্ভিস ঘোষণা করার রায় বহাল রাখে। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা রক্ষায় ১২টি নির্দেশনা দেয় আপিল বিভাগ। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৮ নম্বর নির্দেশনাটি ছিল বিচার বিভাগকে জাতীয় সংসদ এবং প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাখার। জানতে মাসদার হোসেন মামলা অন্যতম বাদী অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ (বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী) এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।