জিপিএ-৫ কমে যাওয়ার নেপথ্যে

চট্টগ্রাম তথা দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কলেজ। এসএসসিতে যেসব শিক্ষার্থী সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়ে থাকে এবং যাদের নম্বর সবচেয়ে বেশি তারাই এখানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু দেশসেরা এই প্রতিষ্ঠানের ১০৩৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৬২৭ জন। বাকি শিক্ষার্থীরাও তো জিপিএ-৫ পাওয়ার কথা ছিল। চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থীদের চিত্র যদি এই হয় তাহলে অন্যান্য কলেজের কী অবস্থা হবে?

বাস্তবে ঘটেছেও তাই, অন্য সব কলেজেই জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা কমেছে। যদিও কলেজের সামগ্রিক পাসের হারে কিংবা শিক্ষা বোর্ডের সামগ্রিক পাসের হারে গত বছরের তুলনায় তেমন কোনো পার্থক্য হয়নি। পার্থক্য হয়েছে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে গত বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৬ হাজার ৯৭ জন কিন্তু এবার তা কমে হয়েছে ২ হাজার ৯২৯ জন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ২৬৯ জন। অপরদিকে গত বছর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ৫২ দশমিক ৫৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করলে এবার তা কমে ৫২ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। জিপিএ-৫ কমে আসার পেছনের কারণ জানতে চাওয়া হয় চট্টগ্রামের সরকারি হাজী মুহম্মদ মহসিন কলেজ থেকে সম্প্রতি অবসরে যাওয়া অধ্যক্ষ প্রফেসর কামরুল ইসলামের কাছে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবার সরকারি মহসিন কলেজ থেকে গড় পাসের হার গত বছরের মতো করলেও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার কমেছে। এবার ১ হাজার ৭০১ জন পরীক্ষা দিয়ে ১ হাজার ৬২৫ জন পাস করা এবং তাদের মধ্যে ৬৩৫ জন জিপিএ-৫ পায়।’

কিন্তু জিপিএ-৫ কমে যাওয়ার পেছনের কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন পরীক্ষা হলের পরিবেশে পরিবর্তন এসেছে। সিসি ক্যামেরার কারণে পরিদর্শকরা যেমন দায়িত্বপূর্ণ আচরণ করছেন তেমনি পরীক্ষার্থীদেরও সতর্ক থাকতে হচ্ছে। এতে পড়ালেখার প্রতি মনোনিবেশ না থাকলে হয়তো পাসের নম্বর তোলা যাবে কিন্তু ভালো নম্বর পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। আর এবারের ফলাফলে তাই দেখা যাচ্ছে।’

মহসিন কলেজের অধ্যক্ষের এই মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা গবেষণা নিয়ে কাজ করা চট্টগ্রাম সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের সহকারী অধ্যাপক ড. শামসুদ্দীন শিশির বলেন, ‘পরীক্ষা হলের পরিবেশের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ক্লাসমুখী হতে হবে। ক্লাসমুখী প্রবণতা না বাড়লে ভালো ফলাফলের হার বাড়বে না। এবার আরও একটি বিষয় ঘটেছে তা হলো ব্যবহারিক নম্বরে নজরদারির বিষয়টি। আগে গড়পড়তা সর্বোচ্চ নম্বর দিয়ে দেওয়ার একটি প্রবণতা ছিল এবং হয়তো তা ঘটেনি।’

ড. শামসুদ্দীন শিশিরের এই বক্তব্যের সূত্রপাত যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, এ বছর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে বিজ্ঞান বিভাগের ২ হাজার ১০৭ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে, কিন্তু গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৪৬ জন। মূলত বোর্ডের ফলাফলে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা তিন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি জিপিএ-৫ পেয়ে থাকে। এবার এখানেও ধস নেমেছে।

ব্যবহারিকে নজরদারি করা হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, তেমন নজরদারির কোনো বিষয় নয়। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় পরীক্ষকরা অনেক দায়িত্বশীল ছিলেন এবং তারা যথাযথ নম্বর দিয়েছেন।

তাহলে সারা দেশে জিপিএ-৫ কমল কেন? আগে কি শিক্ষকরা দায়িত্ববান ছিলেন না? এই প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, এবার আমরা ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষা মূল্যায়ন ইউনিটের মাধ্যমে প্রতি বিষয়ের ৬ জন শিক্ষক দিয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়ন নির্দেশিকা তৈরি করেছি। সেই নির্দেশিকা সব বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের মাধ্যমে পরীক্ষকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। এই নির্দেশিকাকে বলে রুবিক্স। এবারের ফলে এর প্রভাবই পড়েছে। অর্থাৎ, কোন প্রশ্নের উত্তরে কি লিখলে কত নম্বর দেওয়া যাবে সেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এই রুবিক্সের সুফল এবারের ফলাফলে পাওয়া গেছে উল্লেখ করে আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর জেসমিন তাসলিমা বানূ বলেন, ‘এবার যেহেতু অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হয়েছে তাই আমরা উত্তরপত্র মূল্যায়নও অভিন্ন রাখতে চেয়েছি। এই অভিন্ন রাখতে গিয়ে রুবিক্স পদ্ধতির প্রয়োগ এবং এর সুফলও আমরা দেখতে পাচ্ছি। জিপিএ-৫ কম নয়, যথাযথ মূল্যায়নে যারা যে নম্বর পাওয়ার তাই পেয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, আগামীতে আমরা শিক্ষকদের উত্তরপত্র মূল্যায়ন নিয়ে প্রশিক্ষণ দেব। এতে উত্তরপত্র মূল্যায়ন আরও পারফেক্ট হবে এবং তাদের দক্ষতা বাড়বে।

চট্টগ্রামের তিন কলেজে কেউ পাস করেনি : এবারের প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে মেরন সান কলেজ (২ জন), সৃজনী ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ (৫ জন) ও বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ (২ জন) থেকে কেউ পাস করেনি।

শতভাগ পাস করেছে ৬ কলেজে : চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় ২৮৩টি কলেজের মধ্যে ৬টি কলেজ থেকে শতভাগ পাস করেছে। এর মধ্যে বাড়বকু- হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ (১৩৪ জন), ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ (৪৪ জন), আনোয়ারার কাফকো স্কুল অ্যান্ড কলেজ (১৭ জন), বান্দরবান লামার কোয়ান্টাম কসমো কলেজ (৬০ জন), কক্সবাজারের রামু ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজ (৬ জন) ও লিডার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ (৬ জন) থেকে অংশগ্রহণকারী সব পরীক্ষার্থীই পাস করেছেন।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বোর্ডের আওতাধীন ২৮৩টি কলেজের ৯৬ হাজার ৩৩৫ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে ৫০ হাজার ১৬৬ জন। তাদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ হাজার ৯২৯ জন। এদিকে সারা দেশে গত বছর যেখানে ৬৯ হাজার ৯৭ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিল এবার তা নেমে এসেছে ৪০ হাজার ৮৪ জনে।