জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পেছানোর সিদ্ধান্ত অনুমোদন পেয়েছে। এই অতিরিক্ত সময়কে কাজে লাগাতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কার্যকর ভূমিকা, বাজেট পরিকল্পনায় স্বচ্ছতা, সরকারি পরিকল্পনার সমন্বয় এবং বহুপক্ষীয় অংশীদারত্বের মাধ্যমে জাতীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও সিটিজেনস প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
রবিবার (১ নভেম্বর) রাজধানীতে সিপিডির কার্যালয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ: জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ও আমাদের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তকে আমরা ইতিবাচক সুযোগ হিসেবে দেখছি। তবে এটি যেমন একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত, তেমনি নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেও বাংলাদেশকে ব্যতিক্রমী কৃতিত্ব দেখাতে হবে।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সময়ের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের সময়সীমা দেশের রাজনৈতিক চক্রের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা, দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিষয়টি শুধু কারিগরি, আমলাতান্ত্রিক বা প্রশাসনিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হবে।
এলডিসিভুক্ত দেশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পাওয়া বিশেষ সুযোগ-সুবিধা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ রূপরেখা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, আগামী বাজেটে কোন কোন খাতে কী পরিমাণ সহায়তা বা ভর্তুকি কমানো হবে, তা স্পষ্ট করতে হবে। পাশাপাশি সম্ভাবনাময় কোন খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে বেশি সহায়তা দেওয়া হবে, সেটিও নির্ধারণ করতে হবে। পুরো সংস্কার কর্মসূচি জনসমক্ষে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে।
নীতিনির্ধারণে সমন্বয়ের অভাবের বিষয়টি তুলে ধরে ড. দেবপ্রিয় বলেন, বর্তমানে অ্যাকশন প্ল্যান, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, ত্রিবার্ষিক বাজেটারি কাঠামো, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এবং বিভিন্ন খাতভিত্তিক সরকারি পরিকল্পনা কার্যকর রয়েছে। এসব পরিকল্পনার মধ্যে দ্রুত ও কার্যকর সমন্বয় না হলে নীতিগত বিভ্রান্তি তৈরি হবে। এতে পরবর্তী সময়ে কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও কঠিন হবে।
এলডিসি উত্তরণকে জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ প্রক্রিয়ার মালিকানা পুরো সরকার ও দেশের। জাতীয় পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বেসরকারি খাত, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী গোষ্ঠী, দেশীয় বিশেষজ্ঞ সমাজ ও গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
পরিকল্পনার পাশাপাশি বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে ড. দেবপ্রিয় বলেন, অতীতে আমরা পরিকল্পনা প্রণয়ন ও কথা বলার ক্ষেত্রে যতটা পারদর্শিতা দেখিয়েছি, বাস্তবায়নে ততটা সফল হতে পারিনি। এ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়। আগামী তিন বছরে জাতিসংঘের সিদ্ধান্তকে বাস্তবে সফল করতে জাতীয় পর্যায়ে ব্যতিক্রমী দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে।
সংলাপে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এ সময় সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ, সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা আলোচনায় নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।