কেনাকাটা থেকে বাজেট, সব কাজেই দক্ষ হচ্ছে এআই

মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজ সম্পাদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সক্ষমতা বাড়ছে বলে দাবি করেছে প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ওপেনএআই। কেনাকাটা, ব্যক্তিগত বাজেট তৈরি, শিশুর জন্য উপযুক্ত স্কুল খুঁজে বের করা কিংবা খাবারের পরিকল্পনা তৈরির মতো কাজে আগের চেয়ে ভালো করছে প্রতিষ্ঠানটির এআই মডেল।

সোমবার (২ নভেম্বর) এ ধরনের বাস্তব জীবনের কাজ সম্পাদনে এআইয়ের সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য নতুন একটি মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রকাশ করেছে ওপেনএআই। একই সঙ্গে নিজেদের মডেলের পারফরম্যান্সের তথ্যও তুলে ধরেছে প্রতিষ্ঠানটি।

ওপেনএআইয়ের দাবি, তাদের জিপিটি-৬ অ্যাস্ট্রা মডেল নতুন জায়গায় যাওয়ার পর সন্তানের জন্য উপযুক্ত কিন্ডারগার্টেন খুঁজে বের করার পরীক্ষায় ৯৩ দশমিক ১ শতাংশ নম্বর পেয়েছে। বন্যার প্রস্তুতিতে কমিউনিটির স্বেচ্ছাসেবকদের ব্যবস্থাপনার কাজে পেয়েছে ৯৮ শতাংশ নম্বর। আর ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হিসেবে সম্প্রতি শনাক্ত হওয়া একজন অভিভাবকের জন্য খাবারের পরিকল্পনা তৈরির পরীক্ষায় মডেলটির সাফল্যের হার ৯০ দশমিক ৪ শতাংশ।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

এমন সময়ে ওপেনএআইয়ের এই উদ্যোগ সামনে এলো, যখন মেটা, অ্যানথ্রোপিক ও গুগলের সঙ্গে এআই প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তব জীবনের বিভিন্ন কাজ মানুষের হয়ে সম্পন্ন করতে সক্ষম এআই এজেন্ট তৈরিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। একই সঙ্গে এআইয়ের নিরাপত্তা এবং বিপুল বিনিয়োগ থেকে মুনাফা অর্জন নিয়েও চাপের মুখে রয়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো।

তবে দৈনন্দিন কাজের ক্ষেত্রে চ্যাটজিপিটি কতটা কার্যকর, তা যাচাই করতে প্রথমে নতুন পরীক্ষাপদ্ধতি তৈরি করতে হয়েছে ওপেনএআইকে। প্রতিষ্ঠানটির গবেষক জেনি ইয়াং সিএনএনকে বলেন, বিপুলসংখ্যক মানুষ বিভিন্ন কাজে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করছেন। তাই তারা কীভাবে এটি ব্যবহার করছেন এবং সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তিটির উন্নতি কতটা হচ্ছে, তা বোঝা জরুরি। পাশাপাশি কোন কোন ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি রয়েছে, সেটিও চিহ্নিত করতে চান তারা।

যেভাবে তৈরি হলো মূল্যায়ন পদ্ধতি

এআই মডেলের সক্ষমতা যাচাইয়ে নির্দিষ্ট মানদণ্ড বা বেঞ্চমার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব পরীক্ষার ফলাফল কাজে লাগিয়ে এআই প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মডেলকে প্রশিক্ষণ দেয় এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করে। গত বছর উৎপাদন, সরকারি কার্যক্রম, অর্থনীতি ও বিক্রয়সহ বিভিন্ন খাতে এআইয়ের কর্মদক্ষতা যাচাইয়ে ‘জিডিপিভ্যাল’ নামে একটি বেঞ্চমার্ক প্রকাশ করেছিল ওপেনএআই।

নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির লক্ষ্য হলো, শুধু লেখা বা উপস্থাপনা তৈরির মধ্যেই চ্যাটজিপিটির ব্যবহার সীমাবদ্ধ না রেখে ব্যবহারকারীর হয়ে বাস্তব কাজ সম্পাদনে সক্ষম একটি সহকারী হিসেবে গড়ে তোলা।

তবে দৈনন্দিন জীবনের কাজের ক্ষেত্রে এআইয়ের দক্ষতা পরিমাপ করা সহজ নয়। কারণ, বাজার করা কিংবা সন্তানের জন্য উপযুক্ত কিন্ডারগার্টেন নির্বাচন করার মতো কাজের ধাপ ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অনেক বিস্তৃত। এসব কাজের সাফল্য মূল্যায়নের মানদণ্ডও অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।

এ জন্য প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিকসের ‘আমেরিকান টাইম ইউজ সার্ভে’ এবং যুক্তরাজ্যের ‘মাল্টিন্যাশনাল টাইম ইউজ সার্ভে’র মতো জরিপ বিশ্লেষণ করে ওপেনএআই। এসব জরিপে মানুষ দৈনন্দিন জীবনের বেশির ভাগ সময় কীভাবে ব্যয় করেন, তার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তবে ঘুমানো বা খাওয়ার মতো অনেক কাজ এআইয়ের সহায়তায় সম্পন্ন করা সম্ভব নয় বলে সেগুলো বাদ দিতে হয়।

এরপর চ্যাটজিপিটির ব্যবহারকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, কোন কোন কাজে তারা এআই সহকারীর সাহায্য চান।

প্রায় চার হাজার মানুষের ওপর জরিপ চালায় প্রতিষ্ঠানটি। তাদের মধ্য থেকে প্রায় ১০০ জনকে নির্দিষ্ট কিছু কাজের তালিকা তৈরি করতে বলা হয়। পাশাপাশি কাজগুলো সম্পন্ন করতে এআইকে কী ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য বা প্রেক্ষাপট দিতে হবে এবং কাজের সফলতা কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, সেই মানদণ্ডও তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয়।

প্রস্তাবিত কাজ সম্পর্কে ব্যবহারকারীদের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করেছে ওপেনএআই। যেমন, আর্থিক পরিকল্পনা নিয়ে এআইয়ের সক্ষমতা যাচাইয়ের পরীক্ষার প্রস্তাব দিতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির একাধিক বছর আর্থিক পরামর্শকের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হতো।

জেনি ইয়াং বলেন, পরীক্ষার জন্য কাজ প্রস্তাবকারীদের এমন প্রমাণ দিতে হয়েছে, যাতে বোঝা যায় তারা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ অথবা সঠিক ফলাফল কেমন হওয়া উচিত, সে সম্পর্কে তাঁদের পরিষ্কার ধারণা রয়েছে।

পুরোনো মডেলের তুলনায় এগিয়ে জিপিটি-৬ অ্যাস্ট্রা

অ্যাপার্টমেন্ট খোঁজা থেকে শুরু করে পরিবারের অসুস্থ সদস্যের যত্ন নেওয়া—বিভিন্ন ধরনের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ওপেনএআইয়ের নতুন পরীক্ষায়। এসব ক্ষেত্রে মডেলটি কতটা দক্ষ, তা যাচাই করতে ওয়েবসাইট ব্যবহার, ব্যবহারকারীর চ্যাট ইতিহাস থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য বের করা এবং ব্যক্তির চাহিদা ও প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়েছে।

ওপেনএআইয়ের পরীক্ষার ফল অনুযায়ী, দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কাজসংক্রান্ত নির্দেশনা অনুসরণে গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত জিপিটি-৬ অ্যাস্ট্রা মডেল সামগ্রিকভাবে ৮০ শতাংশ নম্বর পেয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত জিপিটি-৫.২ মডেলের প্রাপ্ত নম্বর ছিল ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ।

জেনি ইয়াংয়ের মতে, এসব কাজে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো দ্রুত বের করে আনা জরুরি। উন্নত মডেলগুলো এ ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

ব্যক্তিগত এআই সহকারী তৈরির প্রতিযোগিতা

দৈনন্দিন জীবনে চ্যাটজিপিটির ব্যবহার আরও বাড়াতে চায় ওপেনএআই। তবে এআই এজেন্ট তৈরির প্রতিযোগিতায় প্রতিষ্ঠানটিকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে মেটাসহ অন্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো।

গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়া মেটার ‘মিউজ’ এজেন্ট যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম ৪০ দিনে এক কোটি ডাউনলোড হয়েছে। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্সর টাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী, এত অল্প সময়ে এক কোটি ডাউনলোডের মাইলফলক অর্জন করা অ্যাপের সংখ্যা খুবই কম।

একই মাসে ওপেনএআই ‘ডটস’ নামে একটি এআই এজেন্ট চালু করে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ব্যবহারকারী অন্য কাজে ব্যস্ত থাকলেও এই এজেন্ট পেছনে দীর্ঘমেয়াদি কাজ চালিয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া অক্টোবরে ‘ক্লড ডুয়েট’ নামে নতুন এআই এজেন্ট অ্যাপের ঘোষণা দিয়েছে অ্যানথ্রোপিক।

তবে এআই এজেন্টের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে এসেছে। পরীক্ষার সময় কয়েকটি এআই মডেল নির্ধারিত পরীক্ষার পরিবেশের বাইরে চলে গিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে অননুমোদিত প্রবেশের ঘটনা ঘটিয়েছে। এসব ঘটনা ভোক্তাদের জন্য তৈরি পণ্যে নয়, বরং পরীক্ষার পর্যায়ে ঘটলেও প্রযুক্তির নিরাপদ বিকাশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া মানুষের অতিরিক্ত এআই-নির্ভরতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কোন কাজগুলো এআইয়ের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত, আর কোনগুলো মানুষের নিজের করা প্রয়োজন—তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সম্প্রতি ইয়াহুর সাবেক প্রধান নির্বাহী মারিসা মায়ার তার মেয়ের স্কুলের একটি প্রকল্পের জন্য এআই ব্যবহার করে মেয়ের বিশেষ গুণাবলি তুলে ধরার বিষয়টি প্রকাশ্যে আনলে অনলাইনে সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

জেনি ইয়াংয়ের মতে, এআইয়ের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের দৈনন্দিন কাজের চাপ কমিয়ে সময় বাঁচানো। পার্সেল ফেরত দেওয়ার মতো সময়সাপেক্ষ কাজ সম্পন্ন করা কিংবা নতুন কোনো দক্ষতা শেখার ক্ষেত্রে এআই মানুষকে সহায়তা করতে পারে। তাঁর ভাষায়, এআইয়ের সহায়তায় মানুষ এমন অনেক কাজ করতে পারবেন, যা আগে তাঁদের পক্ষে করা কঠিন ছিল। এতে সামগ্রিকভাবে জীবনযাপন আরও সহজ হতে পারে।