নিকুঞ্জের খেলার মাঠে দখলদারদের থাবা, প্রতিবাদ করলেই হুমকি

রাজধানীর খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ-২ আবাসিক এলাকার একমাত্র খেলার মাঠটি ক্রমেই দখলদারদের কবলে চলে যাচ্ছে। মাঠের চারপাশ ঘিরে ভাসমান হকার ও অবৈধ দোকানপাটের বিস্তার ঘটছে। অভিযোগ রয়েছে, হকারদের আড়ালে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারকারী প্রভাবশালী চাঁদাবাজ চক্র মাঠের জায়গা দখল করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। মাঠ রক্ষায় কেউ প্রতিবাদ করলেই তাঁকে নানাভাবে হুমকি ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। এতে চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে মাঠের পাশের প্রায় ১০ শতাংশ জায়গায় দোকান বসানো হয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে দোকানগুলো মাঠের ভেতরের দিকে সম্প্রসারিত হতে থাকে। বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ মাঠ দখলের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ তাঁদের। ফলে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। যে মাঠ একসময় বিকেল হলেই শিশুদের কলকাকলিতে মুখর থাকত, সেখানে এখন বাড়ছে দোকানপাট ও দখলদারদের আধিপত্য।

এর আগে নিকুঞ্জ-২ কল্যাণ সমিতির ফুডকোর্ট সাব-কমিটির আহ্বায়ক এ টি এম জসিম উদ্দিন স্বাক্ষরিত একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন সমিতির প্রশাসকের কাছে জমা দেওয়া হয়। ওই আবেদনে সাব-কমিটির সাত সদস্য স্বাক্ষর করেন।

আবেদনে উল্লেখ করা হয়, মাঠের আশপাশের হকার ও দোকানদারদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় সেখানে বিশৃঙ্খলা, নিরাপত্তাসংকট ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এতে মাঠের সৌন্দর্য ও স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সমিতির কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৫ আগস্টের পর নিকুঞ্জের এই খেলার মাঠের পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। মাঠের উত্তর ও পূর্ব পাশ ঘিরে দোকানপাট বসাতে শুরু করে একটি বিশেষ রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারকারী চক্র। একপর্যায়ে এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসন ফুডকোর্ট অপসারণ করে। ওই উদ্যোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসা পায়। তাঁরা আশা করেছিলেন, এবার হয়তো মাঠটি স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত থাকবে।

কিন্তু সেই আশা পূরণ হয়নি। কিছুদিনের মধ্যেই মাঠের পূর্ব, উত্তর ও পশ্চিম পাশ ঘিরে আবারও দোকানপাট বসানো শুরু হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুরুতে সীমানার পাশে দোকান বসানো হলেও এখন সেগুলো ক্রমেই মাঠের ভেতরের দিকে সম্প্রসারিত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার জন্য মাঠের কার্যত কোনো জায়গাই অবশিষ্ট থাকবে না।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মাঠের অবৈধ দখলের প্রতিবাদ করতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও কল্যাণ সমিতির সদস্যদের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবাদকারীদের নাজেহাল করা, শারীরিকভাবে হেনস্তা এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। ফলে সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অনেকেই নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছেন না।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি আবাসিক এলাকার একমাত্র খেলার মাঠ রক্ষার দাবিতে কথা বলাও যদি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষ তাঁদের নাগরিক অধিকার নিয়ে দাঁড়াবেন কীভাবে? একটি প্রভাবশালী চক্রের কাছে কেন জিম্মি হয়ে থাকবে এলাকার শিশু-কিশোরদের খেলার জায়গা?

নিকুঞ্জের মাঠ রক্ষায় এর আগেও বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এলাকাবাসী বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু সাময়িক উচ্ছেদ কিংবা আশ্বাসের বাইরে স্থায়ী কোনো সমাধান দৃশ্যমান হয়নি।

এ বিষয়ে নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির সভাপতি জাহিদ ইকবাল বলেন, “কিছুদিন আগে আমরা নিকুঞ্জের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য প্রশাসনকে ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলাম। সেই সময় পার হয়ে গেলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। শুধু ‘আসছি, আসছি’ বলা হচ্ছে। এলাকার মানুষ এখন আর আশ্বাস শুনতে চায় না, তারা বাস্তবে উচ্ছেদ অভিযান দেখতে চায়। জনস্বার্থে এই মাঠসহ নিকুঞ্জের সব অবৈধ স্থাপনা দখলমুক্ত করা জরুরি।”

অন্যদিকে, খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ সোহরাব আল হোসাইন মাঠের পরিবেশ ও জনস্বার্থ রক্ষায় ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘নিকুঞ্জের খেলার মাঠ ও এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং জনস্বার্থ রক্ষায় পুলিশ সবসময় আন্তরিক ও তৎপর রয়েছে। সাধারণ মানুষের চলাফেরা, শিশুদের খেলাধুলা এবং এলাকার পরিবেশ সুন্দর রাখতে অবৈধ দখলদারত্বের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। সুনির্দিষ্ট তথ্য বা অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এলাকাবাসীর নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিশ্চিত করতে প্রশাসন সর্বদা পাশে রয়েছে।’

এলাকাবাসীর দাবি, নিকুঞ্জের কোনো সড়ক কিংবা খেলার মাঠে ভাসমান হকার ও অবৈধ দোকানপাট বসুক, তা তাঁরা চান না। তাঁদের মতে, জনসাধারণের চলাচলের জায়গা এবং শিশুদের খেলার মাঠ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করার সুযোগ নেই।

তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করে তাঁদের জন্য আইনসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা করা যেতে পারে বলে মনে করেন স্থানীয় অনেকে। কিন্তু জীবিকার অজুহাতে একটি আবাসিক এলাকার একমাত্র খেলার মাঠ দখল করে রাখার সুযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন দ্রুত কার্যকর উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করবে। শুধু বর্তমান অবৈধ দোকানপাট অপসারণই নয়, ভবিষ্যতে যাতে কেউ আবার মাঠ দখল করে দোকান বসাতে না পারে, সে জন্য স্থায়ী নজরদারির ব্যবস্থাও করতে হবে।

নিকুঞ্জের বাসিন্দাদের কাছে এই মাঠ কেবল একখণ্ড জমি নয়; এটি তাঁদের সন্তানদের শৈশব, সুস্থ বিনোদন ও আগামী প্রজন্মের বেড়ে ওঠার জায়গা। সেই মাঠ দখলমুক্ত করা এখন আর শুধু এলাকাবাসীর দাবি নয়, এটি শিশুদের অধিকার রক্ষারও প্রশ্ন।