কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবসার আড়ালে ভূমিদস্যুতার অভিযোগ উঠেছে ‘স্টেডফাস্ট কুরিয়ার সার্ভিস লিমিটেডের’ বিরুদ্ধে। গাজীপুরের কালীগঞ্জে অবৈধভাবে জমি দখলে নিতে শতাধিক বহিরাগত লোকজন ও যন্ত্রপাতি নিয়ে হানে দেয় প্রতিষ্ঠানটির লোকজন। এলাকাবাসী বাধা দিলে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়। পরে পুলিশ আসলে তার সরে যায়। গত সোমবার (২ নভেম্বর) সকালে উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের পুচিলাবাড়ি এলাকার জোড়া পাম্পসংলগ্ন স্থানে এ ঘটনা ঘটে।
খবর পেয়ে কালীগঞ্জ থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। তার তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপে বড় ধরনের সংঘর্ষ ও অঘটন ঘটেনি বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। সোমবার সকালে স্টেডফাস্ট কুরিয়ার সার্ভিসের লোকজন জমি দখলে নিতে গেলে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। স্থানীয়রা জমি কিনেছেন কি না জিজ্ঞেস করলে দখলদাররা সদুত্তর দিতে পারেনি। পরে জানাজানি হলে এক পর্যায়ে পুলিশ এসে দখলদারদের চলে যেতে বললে তারা চলে যান।
শুধু জমি দখল নয়, কুরিয়ার ব্যবসার আড়ালে মাদক পরিবহন বা কারবারে প্রতিষ্ঠানটির কোনো ভূমিকা রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী। তাদের দাবি, এলাকায় মাদকের বিস্তার বাড়ার পেছনের কারণ খুঁজে বের করতে হবে। এখনে হঠাৎ করে কুরিয়ার সার্ভিসের নামে কি উদ্দেশ্যে স্থাপনা নির্মাণ করা হবে, তা সন্দেহজনক।
কুরিয়ারের আড়ালে মাদক সরবরাহ!
এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আগে থেকেই মাদক সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে কুরিয়ার সার্ভিসের আড়ালে মাদক সরবরাহ করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির তিনজন কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছিলো। যে কারণে স্থানীয়দের আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে। মদকের বিস্তারের মধ্যে এমন একটি প্রতিষ্ঠান এলাকায় আস্থানা গড়লে উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েদেরকে নিয়ে অভিবাকদের আতঙ্ক বাড়বে। কেননা এই এলাকায় নতুন রির্সোট প্রস্তবিত বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বসতি গড়ে উঠছে। তাই কুরিয়ার সার্ভিসের আড়ালে কোনো মাদক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে এখনে জমি দখল করতে না দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবসী।
বগুড়ায় ৩ জন গ্রেপ্তার
গত ২৪ সেপ্টেম্বর মাদক সরবরাহ করতে গিয়ে স্টেডফাস্ট কুরিয়ার লিমিটেডের তিন কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) বগুড়ার শাহজাহানপুর থেকে স্টেডফাস্ট কুরিয়াররের কাভার্ড ভ্যান থেকে বিশেষ কৌশলে রাখা ১ হাজার ৯৬৫ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন— কাভার্ড ভ্যানের চালক ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার রাছেল হাওলাদার (৩৬), হেলপার রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মো. রোকনুজ্জামান (৩৯) এবং কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার মকবুল হোসেন (২৫)।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বগুড়া জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহা. জিললুর রহমান জানান, সম্প্রতি কুরিয়ার সার্ভিসের পার্সেল পরিবহনের আড়ালে মাদকের বড় চালান পাচার হচ্ছে—এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। একপর্যায়ে ঢাকা থেকে রংপুরগামী স্টেডফাস্ট কুরিয়ার লিমিটেডের একটি কাভার্ড ভ্যান নয়মাইল এলাকায় পৌঁছালে সেটির গতিরোধ করা হয়। পরে কাভার্ড ভ্যানের কেবিন ও সেখানে থাকা ব্যক্তিদের তল্লাশি করা হয়। এ সময় বিশেষ কৌশলে রাখা ১ হাজার ৯৬৫ পিস ইয়াবা উদ্ধারসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত কাভার্ড ভ্যান ও তিনটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে।
জিললুর রহমান আরও বলেন, কুরিয়ার সার্ভিসের পার্সেল পরিবহনের আড়ালে মূলত মাদক পাচার করা হচ্ছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এ ঘটনায় শাজাহানপুর থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হয়েছে। এই চালানের সঙ্গে আর কারা জড়িত, তা বের করতে তদন্ত চলছে। তদন্তে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
জমি দখল ও মাদক নিয়ে আতঙ্ক
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এলাকায় এমনিতেই মাদকের বিস্তার ভয়বহ আকার ধারণ করেছে। এরমধ্যে মদক সরবরাহের অভিযোগ থাকা প্রতিষ্ঠানের জমি দখল উদ্বেগজনক। এই প্রতিষ্ঠানের আস্তানা গড়লে একদিকে যেমন আইনশৃঙ্খলা বিঘ্ন ঘটতে পারে, অন্যদিকে মাদকের হাট হয়ে উঠতে পারে নিরিবিলি এই এলাকাটি।
নাগরী ইউনিয়নের পুচিলাবাড়ি এলাকার বাসিন্দা হালিম সরকার বলেন, এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ে মানুষ উদ্বিগ্ন। আগে এমন পরিস্থিতি ছিল না। এখন মাদক নিয়ে নানা আমরা উৎকন্ঠায় আছি। কুরিয়ার সার্ভিসের মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোনোভাবে মাদক পরিবহন বা কারবারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। একটি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে অন্য কোনো কর্মকাণ্ড চললে তা এলাকার জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় আরেক ব্যক্তি বলেন, এলাকায় মাদক ছড়িয়ে পড়ার পেছনে কারা জড়িত, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে। কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যক্রমের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও তদন্ত করা উচিত। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কাউকে দায়ী করা যাবে না।
এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা হালিমা খাতুন। তিনি বলেন, ‘এখানে খুব শান্ত পরিবেশ। মানুষ শান্তিতে বসবাস করে। হঠাৎ করেই জমি দখলের নামে এলাকায় অশান্তি তৈরি করা হচ্ছে। শত শত বাইরের লোকজন নিয়ে এসে এমন পরিস্থিতি তৈরি করায় আমরা আতঙ্কিত। জমি নিয়ে এমন ঘটনা ঘটছে, কাল কী হবে, তা নিয়েও চিন্তায় আছি।’
পুলিশের তৎপরতায় দখল বন্ধ
স্থানীয়দের অভিযোগ, সোমবার সকালে স্টেডফাস্ট কুরিয়ারের এক্সিকিউটিভ অফিসার শফিক ও জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে শতাধিক বহিরাগত লোকজন এবং নানা যান যন্ত্রপাতি নিযে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে জমিতে প্রবেশ করে। তাদের সঙ্গে নানা সড়ঞ্জাম ও এক্সকাভেটরও ছিলো। ওয়্যারহাউজ বা আঞ্চলিক গুদাম নির্মাণের কথা বলে জমিতে প্রবেশ করেন তারা। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দারা বাধা দেন। এতে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি সংঘর্ষের দিকে গড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়।
খবর পেয়ে কালীগঞ্জ থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। তাদের সময়োপযোগী হস্তক্ষেপে সম্ভাব্য সংঘর্ষ ও বড় ধরনের অঘটন ঘটেনি। পুলিশ উভয় পক্ষকে জমির মালিকানা ও বায়নাসংক্রান্ত কাগজপত্র নিয়ে থানায় উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে বিষয়টির সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত জমিতে সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। স্থানীয়রা বলছেন, পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জমিটি আগে থেকেই অন্য একটি কোম্পানি বৈধভাবে বায়না করেছেন। বায়নাকারী জমিটির ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে আসছেন। সেখানে তাদের সাইনবোর্ডও আছে। কিন্তু এসব উপেক্ষা করে জমিটি নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করে স্টেডফাস্ট কুরিয়ার সার্ভিস।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, গত কয়েক দিন ধরেই জমিটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বহিরাগত লোকজন জড়ো করা হচ্ছিল। তাদের প্রশ্ন, জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে আইনি পথে সমাধানের চেষ্টা না করে শতাধিক লোক ও মাটি কাটার যন্ত্র নিয়ে সেখানে যাওয়ার প্রয়োজন হলো কেন? একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন তারা।
অভিযোগ অস্বীকার করে স্টেডফাস্ট কুরিয়ার সার্ভিস লিমিটেডের এজিএম কাজল বলেন, জমিটি জবরদখলের কোনো উদ্দেশ্য তাদের ছিল না। ওয়্যারহাউজ নির্মাণের জন্য একজনের কাছ থেকে জমিটি ভাড়া নিয়েছেন তারা। জমির মালিক নিজেই তাদের জমি বুঝিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। জমিটি আগে অন্য কারও কাছে বায়নাকৃত বা অন্য কারও দখলে ছিল, তা কোম্পানি জানত না। বিষয়টি জানা থাকলে তারা ভাড়ার চুক্তি করতেন না। তবে কোম্পানিটির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ নম্বর চাইলে তা দিতে অস্বীকৃতি জানান কাজল।
গাজীপুরের কালিগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) আশরাফুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, কালিগঞ্জ থানায় অবৈধভাবে কাউকে জমি দখল করতে দেওয়া হবে না। এখানে অবৈধ কার্যক্রম চালানোরও কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।