১২ বছরেও কাটছে না ইংরেজিভীতি

প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া একজন শিক্ষার্থীর আনুষ্ঠানিকভাবে ইংরেজি শেখা শুরু হয় বর্ণপরিচয়ের মধ্য দিয়ে। এরপর প্রাথমিক, মাধ্যমিক পেরিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত প্রতিটি শ্রেণিতেই বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে ইংরেজি পড়তে হয় তাকে। টানা ১২ বছর ইংরেজি পড়ার পরও শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের কাটছে না ইংরেজিভীতি। ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জনের বদলে পরীক্ষার খাতায় পাস করাই যেন তাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। বিষয়টির বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলেও।

এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন। তাদের মধ্যে ফেল করেছে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। সবচেয়ে বেশি ফেল করেছে ইংরেজিতে, ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন। এরপর আইসিটিতে ফেল করেছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। দুই বিষয়ে অকৃতকার্যের সংখ্যা ৩ লাখ ৮২ হাজারের বেশি। দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাঁচটিতে ইংরেজিতে ৪০ শতাংশের বেশি পরীক্ষার্থী ফেল করেছে।

ইংরেজি ও আইসিটিতে এমন ফল বিপর্যয়ের পর শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়াতে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়ার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইসিটিতেও ফলের অবনতি ঠেকাতে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া কোথায় ঘাটতি থাকছে পাঠদান, শিক্ষক নিয়োগ কিংবা শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়ায় তা খুঁজে বের করা হবে। ইংরেজিভীতি কেন শিক্ষার্থীদের কাটছে না এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে আসছে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক ফল বিপর্যয়ের চিত্র। এবার এইচএসসিতে সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে যত শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের প্রায় ৬৯ শতাংশই মানবিক বিভাগের। ৯টি বোর্ডে ৫ লাখ ৭ হাজার ২৮১ জন পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। তাদের মধ্যে মানবিক বিভাগেরই ৩ লাখ ৫১ হাজার ৪২৪ জন। অর্থাৎ, মোট অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীর ৬৯ দশমিক ২৭ শতাংশ মানবিকের।

২০২৫ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলফলেও ফেলের শীর্ষে ছিল মানবিকের শিক্ষার্থীরা। সেবার এইচএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৭৮.৬৭ শতাংশ, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৫৫.৫২ শতাংশ ও মানবিক বিভাগে ৫০.৫৪ শতাংশ পাস করেছিল। ওই বছর মানবিকের ৬ লাখ ৯৭ হাজার ২৫২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছিল ৩ লাখ ৯২ হাজার ৩৯৮ জন।

শুধু ২০২৬ কিংবা ২০২৫ সাল নয়, গত কয়েক বছর মানবিকে ফলাফল খারাপ হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের ফল বিপর্যয়ের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে ইংরেজি ও আইসিটিতে দুর্বলতা, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব, নিয়মিত ক্লাস না হওয়া, শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহ এবং মুখস্থনির্ভর পাঠদান অন্যতম।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইংরেজি শেখানোর ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ব্যাকরণ ও পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার কৌশলের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ভাষা হিসেবে ইংরেজি পড়া, লেখা, শোনা ও বলার দক্ষতা তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত ইংরেজি পড়ানো হলেও অনেক শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় শব্দভা-ার, বাক্য গঠন ও অনুধাবনের দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। ফলে উচ্চমাধ্যমিকে গিয়ে পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু বুঝতে এবং প্রশ্নের উত্তর দিতে হিমশিম খায়।

এ সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব। অনেক কলেজে ইংরেজি ও আইসিটির শিক্ষক না থাকায় অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের দিয়ে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা বিষয়গুলোর মৌলিক ধারণা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য ইংরেজি ও আইসিটির মতো বিষয়ে দক্ষতা অর্জন জরুরি হলেও শিক্ষক সংকট তাদের সেই সুযোগ সীমিত করে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যমতে, দেশের ২ হাজার ৬২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক নেই। বর্তমানে যেসব শিক্ষক ইংরেজি পড়াচ্ছেন, তাদের সংখ্যা ৬৪ হাজার ২৫৩ জন। এর মধ্যে ৫১ হাজার ৩৬০ জনেরই ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক-স্নাতকোত্তর বা উচ্চতর কোনো ডিগ্রি নেই। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩ হাজার ৮৬১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইসিটির কোনো শিক্ষক নেই। আইসিটি পড়ান রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসসহ অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষক। ইংরেজিতে পাঠদানরত ৫৬ শতাংশ শিক্ষকের বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ নেই। প্রশিক্ষণ ছাড়া যারা শিক্ষকতা করছেন, তারা মেধাবী হলেও শিক্ষার্থীদের সময়োপযোগী পাঠ দিতে পারছেন না।

গোবিন্দগঞ্জ আব্দুল হক স্মৃতি কলেজের উপাধ্যক্ষ ড. মহিউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্লাসের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়, এরপর ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ এবং সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা মানবিক বিভাগে আসে। ফলে শুরু থেকেই মানবিক বিভাগে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ তুলনামূলক দুর্বল ভিত্তি নিয়ে পড়াশোনা শুরু করে। এ বিভাগের বিষয়গুলোকে তারা সহজ মনে করে। এ কারণে অনেকেই নিয়মিত ক্লাস করে না। ফলে পাঠ্যবিষয়ে তাদের যথাযথ জ্ঞান অর্জন হয় না। পরীক্ষার আগে অল্প সময়ে প্রস্তুতি নিয়ে ভালো ফল করার প্রবণতাও রয়েছে। কিন্তু বিষয়ভিত্তিক ধারণা ও নিয়মিত পড়াশোনা ছাড়া ভালো ফল করা সম্ভব নয়। নিয়মিত ক্লাস না করার ফলে এসব শিক্ষার্থীর দক্ষতা তৈরি হয় না।

এদিকে করোনাভাইরাস মহামারীর পর শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ধরনেও পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করছেন শিক্ষকরা। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা, অনলাইন-নির্ভর শিক্ষা এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের ধারাবাহিকতা নষ্ট হওয়ার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি। শিক্ষকদের পর্যবেক্ষণ, শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ লেখা মনে রাখা, তথ্য মনে রাখা এবং ধারাবাহিকভাবে পড়াশোনা করার সক্ষমতা আগের তুলনায় কমেছে। মানবিক বিভাগের ইতিহাস, পৌরনীতি, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য, ঘটনা, সাল, সংজ্ঞা ও তত্ত্ব মনে রাখার প্রয়োজন হয়। ফলে মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতির ওপর নির্ভরশীল শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় বেশি সমস্যায় পড়ছে।

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. আনিসুর রহমান বলেন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই ইংরেজি ও অন্যান্য মৌলিক বিষয়ের ভিত্তি শক্তিশালী করা, কলেজে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম নিশ্চিত করা এবং মুখস্থনির্ভরতার পরিবর্তে অনুধাবন ও বিশ্লেষণভিত্তিক পাঠদান চালু করা জরুরি। অন্যথায় বরাবরের মতো ফলাফল প্রকাশের পর মানবিক বিভাগের বিপর্যয় নিয়ে আলোচনা হবে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের দুর্বলতাগুলো থেকেই যাবে।