পরিস্থিতি তৈরি হলে আইনের মধ্যে থেকেই ‘হত্যা’ করার অধিকার পুলিশের আছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তবে বিক্ষোভ দমনে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মতো পুলিশ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করুক, বর্তমান সরকার তা চায় না বলে জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে আশঙ্কা প্রকাশ করে উপদেষ্টা বলেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যত দিন বেঁচে থাকবেন, তত দিন দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ড এবং পোশাক-শ্রমিকদের আন্দোলনে পুলিশের বল প্রয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, আত্মরক্ষায় যেকোনো পরিস্থিতিতে পুলিশ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ‘হত্যার মতো ঘটনা’ ঘটতে পারে। আইনে পুলিশকে সেই অধিকার দেওয়া আছে। তবে বল প্রয়োগ হতে হবে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে এবং পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘পুলিশের বল প্রয়োগ করার আইনি অধিকার আছে। কিন্তু যে কথাটা বারবার বলছি, সেটা আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে এবং প্রপোরশনেট বল প্রয়োগ। তো আমরা চেয়েছি যে আগে যেভাবে এগুলো দমন করার চেষ্টা করা হয়েছে, এই সরকার সেটা ওভাবে চাইছে না।’
পুলিশ ও সেনাবাহিনীর দায়িত্বের পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, সেনাবাহিনী শত্রুর দিকে বন্দুক তাক করে, কিন্তু পুলিশকে নিজের জনগণের মুখোমুখি হতে হয়। তাই প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কোথায় গুলি করলে প্রাণহানি এড়িয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, পুলিশকে তা বিবেচনায় রাখতে হবে।
জুলাই আন্দোলনে আবু সাঈদের মৃত্যুর উদাহরণ টেনে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আবু সাঈদ কি কোনো হুমকি তৈরি করেছিলেন? তিনি দুই হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তার আশপাশে কেউ পুলিশকে ইটপাটকেল ছুড়ছিলেন কি না, কিংবা তাকে গুলি করার প্রয়োজন হয়েছিল কি না, তা বিবেচনা করা জরুরি। উপদেষ্টার ভাষায়, পুলিশের কাছে প্রাণঘাতী অস্ত্র থাকলেও তা ব্যবহারের আগে পরিস্থিতি, আইনি প্রক্রিয়া এবং গুলি করা অবধারিত ছিল কি না, সেটি দেখতে হবে।
হাসিনা সরকারের সময় পুলিশকে ‘ট্রিগার হ্যাপি ফোর্স’ আখ্যা দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, যেখানে লাঠিচার্জ বা কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল, সেখানে গুলি চালানো হয়েছে। এমনকি শর্টগানের পরিবর্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। বর্তমান সরকার এই চর্চা থেকে পুলিশকে সরিয়ে আনতে চায়। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ বল প্রয়োগের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ভুলভ্রান্তি হতে পারে, তবে সেগুলো সংশোধনে সময় দিতে হবে।
শ্রমিকদের দাবি ন্যায্য, আন্দোলনে অন্যদের সম্পৃক্ততা : পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, আন্দোলনকারীদের মধ্যে ‘বেশিরভাগ কিশোর গ্যাংয়ের মতো’। তবে তারা সবাই রাষ্ট্রের নাগরিক। সরকার গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে চায়, যাতে জনগণের ক্ষয়ক্ষতি ও ভোগান্তি কম হয়।
জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে শ্রমিকদের জীবন কঠিন হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার আগেই নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। তার প্রত্যাশা, ‘খুব অল্প সময়ের মধ্যেই’ শ্রমিক বিক্ষোভ শেষ হবে। তবে মজুরি বোর্ড গঠনের পরও আন্দোলন অব্যাহত থাকা এবং সহিংস আচরণে অন্য পক্ষের সম্পৃক্ততার শঙ্কা থেকেই যায়।
আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ কিছু করতে পারবে বলে সরকার মনে করে না। তবে তাদের কাছে লুটের টাকা রয়েছে। সেই অর্থ ব্যয় করে বিভিন্নভাবে নাশকতার চেষ্টা করতে পারে।
ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা ঘিরে অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা : শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পথ তৈরি করতে শ্রমিক আন্দোলনকে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নে উপদেষ্টা বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। তবে আন্দোলনের সঙ্গে ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার ফেরার কোনো সম্পর্ক আছে বলে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি না।
তিনি বলেন, আমি মনে করি, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যত দিন বেঁচে থাকবেন, তত দিন অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার সংসদে দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তখনও তিনি নির্বাচিত সরকারকে ‘একদিনও শান্তিতে থাকতে দেব না’ বলে হুমকি দিয়েছিলেন। ভবিষ্যতেও শেখ হাসিনা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করবেন এবং সরকার তা প্রতিহত করবে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে ভর্তুকির চাপ : জ্বালানি ও রান্নার গ্যাসের (এলপিজি/এলএনজি) মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম এবং এলএনজি আমদানির ব্যয় অনেক বেড়েছে। সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে রেকর্ড পরিমাণ ভর্তুকি দিচ্ছে। তবে অর্থনীতির ওপর চাপ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিবেচনায় কিছু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। তার ভাষায়, ভর্তুকি দেওয়ার সামর্থ্য সরকারের ক্রমাগত কমছে। জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনা করেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।