এক মাসের বেশি সময় কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান। গতকাল মঙ্গলবার কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
পরে তিনি রাজধানীর ২৯ মিন্টো রোডে জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের বাসভবনে যান। সেখানে তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান বিরোধীদলীয় নেতা। এ সময় আখতারুজ্জামানের কারাবাস, গ্রেপ্তার ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন জামায়াত আমির।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘বিশৃঙ্খল বাংলাদেশে পাহাড়সম ব্যর্থতা, অযোগ্যতা ও অদক্ষতা চাপা দেওয়ার জন্য এখন বিরোধী দলকে অপপ্রচারের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। কিন্তু মনে রাখবেন, যে সাপ আপনারা নাচাচ্ছেন, সেই সাপই একদিন ছোবল দেবে। ছোবল দিয়ে সাপ পালিয়ে যাবে, আপনাদের মরদেহ পড়ে থাকবে।’
তিনি বলেন, ‘সংসদেও তারা বসন্তের কোকিলদের কথা বলেছেন। যারা বসন্তকালে কুহু কুহু করতে এসেছে, বসন্ত পার হলে তাদের আর দেখা যাবে না। গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষাকালে তাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিরোধী দলের চরিত্রহনন না করে সরকারের উচিত নিজেদের ব্যর্থতা দূর করা। অতীতের মতো প্রতিবাদী কণ্ঠ দমিয়ে রাখার চেষ্টা করলে তা সফল হবে না। জনগণ আর ফ্যাসিবাদ মেনে নেবে না।’
আখতারুজ্জামানের মামলার প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমির বলেন, তিনি কারও গায়ে হাত দেননি। অথচ তার বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা ও কর্মকর্তার গায়ে হাত দেওয়ার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে, নিম্ন আদালতে জামিন দেওয়া হয়নি। হাইকোর্টে জামিন পাওয়ার পরও রাষ্ট্রপক্ষ চেম্বার আদালতে বিষয়টি নিয়ে গেছে। এসব ঘটনাকে লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, আখতারুজ্জামানকে চোখ বেঁধে নেওয়া হয়েছে, মাথায় হেলমেট ও বুকে সেফটি ভেস্ট পরানো হয়েছে। এত কিছুর পরও তাকে নিম্ন আদালত থেকে জামিন দেওয়া হয়নি। এক মাস কারাগারে রেখে প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু তাকে আটকে রাখা যায়নি। তিনি বলেন, জেল তো অনেক খেটেছেন, প্রতিবাদও করেছেন; কিন্তু সব সময় সঙ্গে সঙ্গে ফল পাওয়া যায়নি। আখতারুজ্জামান এক মাসের কারাবাসের বিনিময়ে বিমানবন্দরের অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সুফল পেয়েছেন।
বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটের প্রতিবাদ প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, আখতারুজ্জামানের প্রতিবাদের পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ঘটনার পরপরই দুই কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। পরে দুই দফায় ৩০০টি নতুন ট্রলি যুক্ত করা হয়েছে। লাগেজ চুরি ও ব্যাগ কাটার অভিযোগ ঠেকাতে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কর্মীদের শরীরে বডি ক্যামেরা সংযুক্ত করা হয়েছে। তার দাবি, এখন ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে যাত্রীরা লাগেজ পাচ্ছেন। সাধারণ যাত্রী ও প্রবাসীদের ভোগান্তি নিয়ে আখতারুজ্জামানের প্রতিবাদ কাজে এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় আখতারুজ্জামানও কারাগারে থাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। রিমান্ডে নেওয়ার পর চোখ বেঁধে তাকে জামায়াত সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন করা হয়েছে কেন, সেই প্রশ্ন তোলেন। জিজ্ঞাসাবাদের ধরন এবং ডিবি পুলিশের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন উত্তরের মেয়রপ্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রপ্রার্থী সাদিক কায়েম। কারা ফটকে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, ঢাকা জেলা আমির মাওলানা দেলোয়ার হোসেন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি ও সংসদ সদস্য কামাল হোসেন, সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন, ঢাকা মহানগরী উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার এবং আইনজীবী শেখ মো. রোকন রেজা।
কারামুক্তির পর জেলগেটে আখতারুজ্জামান বলেন, ‘সত্যের রাজনীতি কখনো পরাজিত হবে না। ন্যায়ের রাজনীতি কখনো পরাজিত হবে না। সময় লাগতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত জয় সত্যের হবেই হবে, ন্যায়ের হবেই হবে।’
উল্লেখ্য, গত ১ অক্টোবর সৌদি আরবের মদিনা থেকে আসা জামায়াতের প্রতিনিধিদল ও অন্য যাত্রীদের লাগেজ এবং জমজমের পানি পেতে বিলম্ব হওয়াকে কেন্দ্র করে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উত্তেজনা দেখা দেয়। এ সময় বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদের সঙ্গে আখতারুজ্জামানের বাগ্বিত-া হয়। ঘটনার পর বিমানের দুই কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরদিন ২ অক্টোবর সরকারি কাজে বাধা, কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও নিরাপত্তাকর্মীকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে করা মামলায় রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।