এবার প্রতিনিধি পরিষদে বড় জয়ের পথে ডেমোক্র্যাটরা

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। দেশটির পার্লামেন্ট কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের পর নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণও নিতে যাচ্ছে দলটি। এনবিসি নিউজের পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রায় দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা। এতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা তৈরি হয়েছে।

প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ২১৮টি আসন। এনবিসি নিউজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা প্রায় ২৫৫টি আসনে জয় পেতে পারেন। চূড়ান্ত ফলে কয়েকটি আসনের পরিবর্তন হতে পারে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের ব্যবধান অনেক বেশি থাকবে বলে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে।

২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল ডেমোক্র্যাটরা। এবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেতে তাদের নিট তিনটি আসনে জয় প্রয়োজন ছিল। কিন্তু পূর্ব উপকূল থেকে টেক্সাসের রিও গ্র্যান্ডে ভ্যালি পর্যন্ত রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। এসব এলাকার অধিকাংশ আসনেই ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয় পেয়েছিলেন ট্রাম্প।

পেনসিলভানিয়ায় রিপাবলিকান দলের চারজন বর্তমান প্রতিনিধি পরাজিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিককে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট বব হারভি। এ ছাড়া সপ্তম কংগ্রেশনাল জেলায় রায়ান ম্যাকেঞ্জিকে হারিয়েছেন বব ব্রুকস, অষ্টম জেলায় রব ব্রেসনাহানকে পরাজিত করেছেন পেইজ কোগনেটি এবং দশম জেলায় সাবেক ফ্রিডম ককাস চেয়ারম্যান স্কট পেরিকে হারিয়েছেন জেনেল স্টেলসন।

ভার্জিনিয়ায় সাবেক ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি এলেইন লুরিয়া নিজের পুরোনো আসন পুনরুদ্ধার করেছেন। তিনি রিপাবলিকান প্রতিনিধি জেন কিগানসকে পরাজিত করেন। অন্যদিকে রিচমন্ডের বাইরে দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান প্রতিনিধি রব হুইটম্যানকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট শ্যানন টেইলর।

নিউ জার্সিতে রিপাবলিকান প্রতিনিধি টম কিন জুনিয়রকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট রেবেকা বেনেট। ইন্ডিয়ানার প্রথম ইউক্রেনীয় বংশোদ্ভূত কংগ্রেস সদস্য রিপাবলিকান ভিক্টোরিয়া স্পার্টজও পরাজিত হয়েছেন। এ ছাড়া কলোরাডোতে রিপাবলিকান প্রতিনিধি গ্যাবে ইভান্সকে বড় ব্যবধানে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট অঙ্গরাজ্য প্রতিনিধি ম্যানি রুটিনেল।

নর্থ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকান প্রতিনিধি রিচার্ড হাডসনকে হারিয়ে ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম বড় জয় এনে দিয়েছেন রিচার্ড ওজেদা দ্বিতীয়। হাডসন প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রচার শাখার প্রধান ছিলেন। দলীয় প্রার্থীদের আসন রক্ষা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর।

ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে ভোটারদের রায়

ডেমোক্র্যাটদের এই জয়কে ট্রাম্পের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে ভোটারদের রায় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। অভিবাসনবিষয়ক কঠোর পদক্ষেপ, ইরানের সঙ্গে আট মাসের যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের কারণে প্রশাসন সমালোচনার মুখে ছিল। এসব নীতির প্রভাবে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে।

আগামী ৩ জানুয়ারি নতুন প্রতিনিধি পরিষদের কার্যক্রম শুরু হলে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে প্রথমবারের মতো কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারাবে রিপাবলিকানরা। ফলে প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ওপর নজরদারি ও তদন্তের সুযোগ পাবেন ডেমোক্র্যাটরা।

প্রতিনিধি পরিষদের বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পাশাপাশি তদন্তের প্রয়োজনে সমন জারির ক্ষমতাও পাবেন তাঁরা। ট্রাম্প প্রশাসন, তাঁর পরিবার ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড তদন্তের আওতায় আসতে পারে। বিশেষ করে ওভারসাইট কমিটির সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রবার্ট গার্সিয়া জানিয়েছেন, ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে গুরুত্ব দেবেন তারা।

এর মধ্যে ট্রাম্পের ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা, অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসিই এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের কর্মকাণ্ড, করপোরেট দুর্নীতি ও জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি রয়েছে। ট্রাম্পের ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা থেকে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হওয়ার পথে জেফরিস

নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস আগামী ৩ জানুয়ারি প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার হিসেবে শপথ নিতে পারেন। নির্বাচিত হলে তিনি হবেন এই কক্ষের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার।

নির্বাচনের রাতে ওয়াশিংটনে সমর্থকদের উদ্দেশে জেফরিস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ চরমপন্থা ও দুর্নীতিতে বিরক্ত। তারা এমন একটি কংগ্রেস চান, যা জনগণের জন্য কাজ করবে। জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা সেই প্রত্যাশা পূরণে কাজ করবেন।

ট্রাম্পকে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টিও ডেমোক্র্যাটদের আলোচনায় রয়েছে। তবে এ নিয়ে দলের ভেতরে মতভেদ আছে। এনবিসি নিউজের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে জেফরিস বলেন, অভিশংসনের বিষয়ে তারা কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেননি, আবার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি।

নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে চারটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন জেফরিস। এগুলো হলো—ট্রাম্প প্রশাসনের মেডিকেইড কর্মসূচিতে করা কাটছাঁট প্রত্যাহার, অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের স্বাস্থ্যবিমা-সংক্রান্ত কর-সুবিধা বাড়ানো, শুল্ক আরোপের বিষয়ে কংগ্রেসের ক্ষমতা পুনর্বহাল এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ করা।

চাপে রিপাবলিকান নেতৃত্ব

নির্বাচনের ফল রিপাবলিকান স্পিকার মাইক জনসনের জন্যও বড় ধাক্কা। লুইজিয়ানার এই প্রতিনিধি গত তিন বছর ধরে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এখন তিনি সংখ্যালঘু দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যাবেন, নাকি সরে দাঁড়াবেন, তা স্পষ্ট নয়। সরে দাঁড়ালে নতুন নেতা নির্বাচনে রিপাবলিকানদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হতে পারে।

এবারের নির্বাচনের আগে কংগ্রেশনাল আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়েও দুই দলের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে ট্রাম্প টেক্সাসের রিপাবলিকান নেতাদের আসনের সীমানা নতুন করে নির্ধারণের আহ্বান জানান। এর মাধ্যমে দলটি পাঁচটি পর্যন্ত অতিরিক্ত আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। পরে ফ্লোরিডা, নর্থ ক্যারোলাইনা, টেনেসি, আলাবামা, লুইজিয়ানা ও মিসৌরিতেও রিপাবলিকানরা আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে।

জবাবে ক্যালিফোর্নিয়ায় গভর্নর গ্যাভিন নিউসম, সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি ও তাদের সহযোগীদের উদ্যোগে প্রস্তাব ৫০ পাস হয়। এর মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটদের তৈরি নতুন কংগ্রেশনাল মানচিত্র অনুমোদন পায়, যা রিপাবলিকানদের দখলে থাকা কয়েকটি আসনে জয় পেতে দলটিকে সহায়তা করে। অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলে রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের দখলে থাকা কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ কয়েকটি আসন পুনরুদ্ধার করে।

তবে মিসৌরিতে রিপাবলিকানদের নতুন নির্বাচনী মানচিত্র কার্যকরের উদ্যোগ আটকে দেন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। এতে কানসাস সিটির ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ইমানুয়েল ক্লিভারের আসনটি বহাল থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল কংগ্রেসে আসন হারায়। আধুনিক সময়ে এর ব্যতিক্রম ঘটেছে মাত্র দুবার। ১৯৯৮ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে অভিশংসনের উদ্যোগের পর রিপাবলিকানরা আসন হারান। আর ২০০২ সালে ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রতি জনসমর্থন বাড়ায় তার দল আসন হারানোর প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসে।

নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাটদের হাতে প্রতিনিধি পরিষদের ২১৫টি আসন ছিল। এবার প্রায় ২৫৫টি আসনে জয় পাওয়ার পূর্বাভাস দলটির জন্য বড় রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।