হতাশা নয়, বিষয়টি জবাবদিহির

এবারও এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল পুরো দেশকে হতাশ করেছে। পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যায় ধস নেমেছে। এই ধস আমাদের শিক্ষা কাঠামোর গোড়ায় জমে থাকা অসংগতি ও শিক্ষাদানের মানের ক্রমাবনতির প্রতিফলন। এবারের এইচএসসিতে গড় পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ। বিগত সময়ে অনেকবার পাসের হার ৮০ শতাংশের আশপাশে ছিল। পাস-ফেল নিয়ে আলোচনায় এলে স্বভাবতই নজর পড়ে কলেজগুলোর ওপর। আর এই কাজটি করতে গিয়ে দেখা মিলল ভয়াবহ চিত্রের। এবার ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। গত বছর সংখ্যাটি ছিল ২০২। অর্থাৎ এক বছরেই শূন্যপাসের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি। এমনও একাধিক কলেজ রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীর চেয়ে শিক্ষক বেশি হওয়া সত্ত্বেও কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। ঘটনাগুলো শুধু শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক বা সতেচন মহলের জন্য নয় সর্বসাধারণের জন্য উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার। এই উদ্বেগের বাইরে নেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। সংগত কারণে শূন্যপাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা চাইতে পারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, যা তারা অতীতেও চেয়েছিল। কিন্তু এই তালিকা সংগ্রহ করে অতীতে মন্ত্রণালয় কী কী পদক্ষেপ নিয়েছিল তা জানা নেই। পদক্ষেপ যদি নিয়েও থাকে তাহলে তাতে যে গরমিল ছিল তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

এটা ঠিক যে, পড়াশোনায় অমনোযোগিতা ও অতিরিক্ত ফেসবুক আসক্তি এই বিপর্যয়ের পেছনে দুটি বড় কারণ। এতদিন বেশি নম্বর দিয়ে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে ভালো ফলাফল দেখানোর চেষ্টা ছিল বলে অভিযোগ ছিল বিভিন্ন মহলে। গুণগত মান নয়, পাস সংখ্যার আধিক্য দেখিয়ে বাহবা নেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে তখন। সে সময়ে মানের চেয়ে পাসের হারের ওপর গুরুত্ব ছিল বেশি। প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফলের এই যে অবস্থা তার জন্য কি শুধু শিক্ষার্থীরাই দায়ী? নাকি এর পেছনেও রয়েছে অন্য কিছু? এক সময়  দেশের এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ বা মাদ্রাসা শিক্ষক নিয়োগ বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে হত না। এই কর্তৃপক্ষ ২০১৬ সাল থেকে মেধাক্রম অনুসারে সুপারিশের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করে। এর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগে নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা চলে আসে। কিন্তু এর আগে এসব অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চরম অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও স্থানীয় ম্যানেজিং কমিটিকে হাত করে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগের প্রেক্ষিতে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া এনটিআরসিএর হাতে ন্যস্ত করা হয়। তা ছাড়া ওই সময়ে শিক্ষকদের সনদ যথাযথ প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই না করার কারণে অনেকে জাল সনদ নিয়ে শিক্ষক হিসেবে ঢুকে পড়ে। জাল সনদ ব্যবহার করে বিধিবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকরা ঢুকে বছরের পর বছর বেতন-ভাতা তুলেছেন মর্মে বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও অজ্ঞাত কারণে গতি যায় থেমে। প্রায় এক দশক আগে থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধাপে দেশের উপজেলা পর্যায়ে অন্তত একটি করে এমপিও কলেজকে জাতীয়করণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই কলেজগুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় সেখানে শিক্ষক সংকট রয়েছে। সরকারি কলেজসহ অনেক কলেজে মানের তোয়াক্কা না করে খ-কালীন অতিথি শিক্ষক দিয়ে যেনতেন প্রকারে ক্লাস চালানো হচ্ছে। শিক্ষকের অভাবে সিলেবাস থাকছে অসম্পূর্ণ। উপজেলা সদরের বাইরের অনেক কলেজে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীর জন্য না আছে উপযুক্ত ল্যাব, না আছে প্রশিক্ষিত প্রদর্শক। ক্ষমতার দাপটে বিজ্ঞান শাখা খুলে যারা কলেজের পরিধি বড় করতে চেয়েছেন, মূলত তারাই এখন শিক্ষার্থী টানতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

যে বিষয়টি শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে তা হলো দুর্বল মনিটরিং ব্যবস্থা। পরপর কয়েক বছর শূন্যপাস নিয়ে যে যে কলেজ চলছে তার ব্যাপারে মন্ত্রণালয় কার্যত কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। অথচ উচিত ছিল, যে কলেজ এইচএসসির ফলাফলে এক বা একাধিকবার শূন্য পাসের তকমা লাগিয়েছে তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা। যে টাস্কফোর্সের কাজ হতে পারত মাঠপর্যায়ে গিয়ে বাস্তব সমস্যা শনাক্ত করা, তথ্য সংগ্রহ করা ও সমাধানের জন্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করা। অভিভাবক, শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও গবেষক মিলিয়ে গঠন করা যেত এ টাস্কফোর্স। শিক্ষক প্রশিক্ষণসহ অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অনিয়ম, দুর্নীতি, পাঠদানে গাফিলতি বা পাঠদানে মানের ঘাটতি সবকিছু এই ফোর্স চিহ্নিত করতে পারত এবং এইচএসসির ফলাফল বিপর্যয় রোধে এটি নিশ্চিতরূপে অবদান রাখতে পারত। জানা যায়, ইংরেজি বিষয়ে এ বছর সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। এর মূল কারণ হলো ইংরেজিকে এ দেশে ভাষা হিসেবে শেখানো হয় না, শেখানো হয় পরীক্ষার বিষয় হিসেবে। ইংরেজিতে কথা বলা, শোনা, পড়া ও লেখা এই চার দক্ষতার ওপর জোর না দিয়ে শ্রেণিকক্ষে গ্রামার ও অনুচ্ছেদকেন্দ্রিক মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতির ওপর জোর দেওয়া হয়। ফলে পরীক্ষার হলে প্রশ্নপত্র হুবহু কমন না পেয়ে শিক্ষার্থীরা পড়েছে গ্যাঁড়াকলে।

পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত সত্যিকার অর্থে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী শিক্ষা কমিশন পাওয়া যায়নি। শিক্ষানীতিকে সরকারের মেয়াদের ওপর নির্ভরশীল করলে হবে না। পাঠ্যসূচি, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও পরীক্ষার ধরন সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্টে  গেলে শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্তির মধ্যে থাকে। এই দশা কাটাতে দরকার এমন একটি কমিশন, যা যেকোনো প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষানীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পারবে। কেবল তখনই শিক্ষা হবে রাষ্ট্রের মূল দর্শনের ধারক। আজকের এই হতাশাজনক ফলাফলের দায় শুধু শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রতিষ্ঠান বা অভিভাবকের দিকে চাপালে হবে না, দায় পুরো সিস্টেমের। শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানগুলোর কী হয় দেখা যাক।

লেখক : ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও গবেষক

soheleng83@gmail.com