শ্রমিক অসন্তোষে ক্ষতিগ্রস্ত সব পক্ষ

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০১:১৬ এএম

দেশের অর্থনীতির রপ্তানি আয়ের অন্যতম জোগানদার পোশাকশিল্প, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের ওপর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে মোট আয় ৩৮.৭০ বিলিয়ন ডলার বা ৪.৭২ লাখ কোটি টাকা। বিগত ৩ বছরে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির টানাপড়েন ও বহির্বিশ্বে দ্বন্দ্ব-সংঘাতসহ বিভিন্ন আন্তঃরাষ্ট্র ও আন্তঃজোটে টালমাটাল অবস্থায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত থেকে আয় ক্রমবর্ধমান থাকলেও গত বছর আয় কমেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৬.১৫ বিলিয়ন ডলার ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৯.৩৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় হলেও ২০২৫-২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৮.৭০ বিলিয়ন ডলারে। তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত হওয়ার পেছনে রয়েছে অনেক প্রতিকূলতা এবং অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে যাওয়ার ইতিহাস। কর্মসংস্থানের দিক থেকেও অন্যতম বড় খাত হলো পোশাক শিল্প। তৈরি পোশাক খাতে  শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ ১৭ হাজার ৬৫২ জন (এর মধ্যে বিজিএমইএ-এর অধীনে ৩৩ লাখ ১৭ হাজার এবং বিকেএমইএর নিট খাতে ১৭ লাখের বেশি)।

বাংলাদেশে নারীর যতটুকুই ক্ষমতায়ন হয়েছে তার পেছনে অন্যতম অবদান এ শিল্পের। বিশেষত গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার মাধ্যমে এটি নারীর ক্ষমতায়নে বিপ্লব ঘটিয়েছে। যদিও এ খাতে নারী কর্মসংস্থানের হার দিন দিন কমছে। ৮০ শতাংশ  নারী শ্রমিকের হার বর্তমানে কমে প্রায় ৬০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কোনো কোনো হিসাবে নারী-পুরুষ অনুপাত ৫০:৫০। ১৯৬০ এর দশকে তৈরি পোশাকশিল্পের যাত্রা শুরু হলেও ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ জিএসপি বা জেনারালাইজড সিস্টেম প্রিফারেন্স সুবিধা লাভ করে বিদেশের বাজারে প্রবেশ করে। এর পরের ইতিহাস ছুটে চলার ইতিহাস। তৈরি পোশাক খাত কেবল শিল্পই নয়, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের পরিচিতিও তুলে ধরেছে । অনেক দেশের রাজা, রানী, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, শিল্পপতি, সেলিব্রেটিসহ বিদেশের মাটিতে কোটি কোটি নারী-পুরুষ-শিশুর গায়ে জড়িয়েছে বাংলাদেশের পণ্যটি। মেড ইন বাংলাদেশ বিদেশের মাটিতে আমাদের পরিচয় এনে দেয়। সে পরিচয় টেকসই ও নির্ভরতার। এতকিছুর পরও ১৯৮০ এর দশক থেকে তৈরি পোশাক খাতে সময়ে সময়ে এসেছে নানা অস্থিরতা। সাম্প্রতিককালের অস্থিরতা হলো মজুরি বোর্ড নিয়ে। ২০২১ সালে সর্বশেষ মজুরি বোর্ড গঠনের সময় পাঁচ বছর ধরে প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে বাধ্যতামূলক বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার সেই সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করে এবং বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে। গত ৩ নভেম্বর দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে বিকেএমইএ-এর সাবেক সভাপতি ও এফবিসিসিআই-এর প্রশাসক মো. ফজলুল হককে উদ্ধৃত করে লেখা হয় ‘শ্রমিকদের অনুকূলে নেওয়া তৎকালীন সেই সিদ্ধান্ত মালিকপক্ষ চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও মেনে নিয়েছিল।’

তৈরি পোশাক খাত এ পর্যায়ে আসার পেছনে বহু ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করতে হয়েছে। বিভিন্ন শাসনামল ও সরকারের প্রচেষ্টার পাশাপাশি এ শিল্পের সাফল্যের পেছনে যেমন উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ, মেধা, শ্রম ও ঝুঁকি গ্রহণের ভূমিকা রয়েছে, তেমনি রয়েছে লাখ লাখ শ্রমিকের ঘাম, নিষ্ঠা ও নিরলস পরিশ্রম। মালিকের পুঁজি এবং শ্রমিকের শ্রম দুটির সম্মিলিত শক্তিতেই একটি কারখানা উৎপাদনমুখী হয়, রপ্তানির সক্ষমতা অর্জন করে এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখে। অথচ আমাদের দেশে কয়েক দিন পরপরই দেখা দেয় মালিক-শ্রমিক সংঘাত। ঈদ এলেই বেতন-বোনাস নিয়ে শ্রমিকদের রাস্তায় নামতে হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাষ্ট্রকে হতে হয় কঠোর। যে কারখানা শ্রমিকদের কর্মের ব্যবস্থা করে দিয়েছে তাদের হাতেই সেসব কারখানা ভাঙচুর ও ধ্বংস হতে দেখা যায়। অথচ এ শিল্পের স্বার্থরক্ষার প্রশ্নে মালিক-শ্রমিককে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, বরং একই অগ্রযাত্রার অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার কথা । মনে রাখা উচিত, বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা শ্রমের বিনিময়ে  কারখানার চাকা ঘুরছে। শ্রমিকদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিন-রাতের নিরলস পরিশ্রমে তৈরি হয় বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের প্রতিটি পণ্য। তাদের শ্রম, নিষ্ঠা ও ঘামের বিনিময়েই বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পরিচিতি ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা।

শ্রমিকের কল্যাণ কোনো বাড়তি ব্যয় নয়, বরং এটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।  যুক্তরাজ্যে মাস্টার্স ও পিএইচডি করার সময় যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। কাছ থেকে দেখেছি বিভিন্ন শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক। ওখানে মনে করা হয়, সন্তুষ্ট ও দক্ষ শ্রমিক একটি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় সম্পদ। বিশ্বের বড় বড় ধনকুবের সম্পদ গড়েছেন শিল্প-প্রতিষ্ঠান গড়ে, বিনিয়োগের মাধ্যমে। শ্রমিকরা হলো সেই সম্পদ গড়ার অন্যতম প্রধান উপাদান। শ্রমিকের প্রতি সম্মান, ন্যায্য আচরণ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে তাদের সম্পদ দিন দিন বেড়েই চলছে। এতে ব্যক্তি বা শিল্পগোষ্ঠীই উপকৃত হচ্ছে না, বরং রাষ্ট্র ও সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে। এসব দেশে শ্রম আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, শ্রমিকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে। কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে। ওভারটাইম পলিসি, প্রফিট শেয়ারিং বেনিফিটসহ নানা সুযোগ-সুবিধা শ্রমিকদের মনে প্রশ্নই উঠতে দেয়নি যে তারা বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। একটি দেশের মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক দেখে আমরা কেবল একটি বিশেষ কারখানার অবস্থা অনুধাবন করি না, বরং এর মাধ্যমে উঠে আসে ঐ সমাজ ও রাষ্ট্রের পুরো বাস্তবতা। উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শ্রমিক অসন্তোষ কাম্য নয়। শিল্প-কারখানার মালিক-শ্রমিক সংঘাত পুরো শাসনব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখোমুখি করে। রাষ্ট্র বা সরকার বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপের ধারণা নয়, আপামর জনগণকে নিয়ে তা গড়ে ওঠে। ২০ কোটি মানুষের দেশে অর্ধ কোটির বেশি মানুষ যখন তাদের কর্ম ও বেতন-সুযোগ সুবিধা নিয়ে সন্তুষ্ট না থাকেন তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি সমস্যাটা কেবল শিল্প-মালিক ও শ্রমিকদের না বরং এটি আমাদের সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে সামনে  নিয়ে আসে।

দীর্ঘদিন শাবিপ্রবি ও একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা কোর্স পড়িয়েছি। ব্যবসা প্রশাসন ছাড়াও বিভিন্ন প্রকৌশল ও সামাজিক বিজ্ঞান ডিসিপ্লিন এ কোর্সটি পড়ান। এসব গ্র্যাজুয়েট যখন কর্মক্ষেত্রে যান বিশেষত বাংলাদেশে তারা তাদের লব্ধজ্ঞান প্রয়োগ করতে পারেন না। আমার অনেক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, পাশ্চাত্যের বাস্তবতায় তাদের লেখা বই থেকে এ কোর্স না পড়িয়ে আমাদের বাস্তবতা বিবেচনা করা উচিত। এরপর প্রচুর ব্যবহারিক জ্ঞান আহরণ করে কোর্সটি পড়ানোর চেষ্টা করতাম। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম এজেন্ডা ছিল বিভিন্ন খাতের সংস্কার এবং এর ঢেউ লাগে তৈরি পোশাক খাতেও। আর সংস্কার বাস্তবায়নের প্রশ্নের আজকের অস্থিতিশীলতা। গার্মেন্টস মালিকরা নিজেরাই বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারে তাদের মতৈক্য না থাকলেও পরিস্থিতির বাস্তবতায় তা মেনে নেন। আর এখন তা বাস্তবায়ন হলে নাকি তাদের লোকসানের মুখ দেখতে হবে। তাহলে তখন প্রশ্ন ওঠেনি?

আমাদের দেশে কেন পোশাকশিল্প বিকশিত হলো? এর একটাই কারণ সস্তা শ্রম ও বিভিন্ন বিধিমালা পালনে শৈথিল্যের সুযোগ। পরিবেশ-প্রতিবেশ আইন এখানে কাগুজে। শিল্প-কারকানার নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ আছে বিলবোর্ড ও নোটিস বোর্ডে। বর্তমান বিশ্বে পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা শুধু কম দামে পণ্য উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, শ্রমিকের অধিকার, সামাজিক দায়বদ্ধতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং উৎপাদন দক্ষতা এখন আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। আমাদের অবশ্যই ভুলে গেলে চলবে না দেশের পোশাকশিল্পের বেশিরভাগ শ্রমিকই অদক্ষ হিসেবে কর্মে প্রবেশ করেন। মালিকরা তাদের স্বল্প দক্ষ ও পূর্ণ দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলেন। তবে তাদের আন্তর্জাতিক দক্ষতার মাপকাঠিতে অনেকটা কাজের শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, দক্ষতা এবং পেশাগত দায়িত্ববোধ না থাকাটা আমাদের দেশের কেবল পোশাকশিল্পের না, বরং যেকোনো শিল্প-কারখানা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনাকাক্সিক্ষত  বাস্তবতা। প্রযুক্তির কারণে যেন শ্রমিকরা কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় না পড়েন, বরং নতুন দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে আরও উন্নত কর্মক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, সে ব্যাপারে যেখানে যত্নবান হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু উল্টো সেখানে তারা আজ বর্ধিত মজুরির দাবিতে রাস্তায়, ধর্মঘটে, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে। দেড় যুগেরও বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি সরকারের বয়স ১ বছরও হয়নি। দেশের অর্থনীতি ভালো অবস্থানে নেই। রাজস্ব সংগ্রহে সরকারের সাফল্য দেখা যাচ্ছে না। বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান প্রবাহেও ভাটা। বিদেশি বিনিয়োগও থমকে আছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকার গলদঘর্ম। এমতাবস্থায় শ্রমিক অসন্তোষ কেবল সরকারের জন্য চাপ নয়; আপামর রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই পরিস্থিতি কারও জন্যই কল্যাণকর নয়। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হন মালিক, শ্রমিক এবং সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি। আবার শ্রমিকের ন্যায্য দাবি উপেক্ষিত হলে কর্মপরিবেশে অসন্তোষ বাড়ে স্থিতিশীলতা ও উৎপাদনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

লেখক : অধ্যাপক, উন্নয়ন পরিবেশ, মানবসম্পদ গবেষক ও বিশেষজ্ঞ। উপাচার্য, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট।

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত