হৃদয়ের সুস্থতা দুই বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল

মহান আল্লাহ মানুষের প্রতিটি অঙ্গের জন্য একটি নির্দিষ্ট পূর্ণতা নির্ধারণ করেছেন। এই পূর্ণতাই অঙ্গগুলোর অস্তিত্ব ও শক্তির মূল উৎস। যখন এই পূর্ণতা শেষ যায় কিংবা তাতে ঘাটতি দেখা দেয়, তখন মানুষের মনে বিষন্নতা নেমে আসে, সৌন্দর্য ম্লান হয়, আনন্দ কমে যায় এবং স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা হারিয়ে যায়। কোনো অঙ্গের পূর্ণতায় যতটুকু ঘাটতি তৈরি হয়, তার প্রভাবও ততটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

যেমন চোখের পূর্ণতা দেখার মধ্যে, কানের পূর্ণতা শোনার মধ্যে এবং জিহ্বার পূর্ণতা কথা বলার মধ্যে নিহিত। তেমনি মানুষের হৃদয়েরও পূর্ণতা রয়েছে। হৃদয়ের সুস্থতার ওপর পুরো শরীরের সুস্থতা নির্ভর করে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জেনে রেখো, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে। তা সুস্থ থাকলে পুরো শরীর সুস্থ থাকে। আর তা নষ্ট হলে পুরো শরীর নষ্ট হয়ে যায়। জেনে রেখো, সেটি হলো হৃদয়।’ (সহিহ বুখারি)

হৃদয়ের পূর্ণতা নিহিত রয়েছে মহান রবকে চেনা, তাকে ভালোবাসা, তার দিকে ফিরে আসা, তার প্রতি মনোনিবেশ করা, তার সাক্ষাতের আকাক্সক্ষা পোষণ করা এবং তার সান্নিধ্যে প্রশান্তি লাভের মধ্যে।

নিঃসন্দেহে দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ আনন্দ হলো মহান আল্লাহকে চেনা ও ভালোবাসার আনন্দ। এটিই প্রকৃত নেয়ামত এবং সবচেয়ে উত্তম সম্পদ। আর আখেরাতের সর্বশ্রেষ্ঠ আনন্দ হলো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং জান্নাতে তার দিদার লাভ করা।

মহান আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা এবং তাকে চেনার মধ্যে রয়েছে চোখের প্রশান্তি, আত্মার আনন্দ এবং হৃদয়ের উচ্ছ্বাস। হৃদয়ের জন্য এর চেয়ে বড় কোনো আনন্দ, নেয়ামত ও সফলতা নেই। হৃদয় যখন মহান আল্লাহর ভালোবাসা ও পরিচয় থেকে শূন্য হয়ে যায়, তখন তার বিপর্যয় শরীর থেকে প্রাণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার চেয়েও ভয়াবহ হয়। এ বিষয়টি কেবল সেই ব্যক্তিই উপলব্ধি করতে পারে, যার হৃদয় সুস্থ। যেমন বলা হয়, মৃত ব্যক্তির ক্ষত তাকে কোনো যন্ত্রণা দেয় না।

হৃদয়ের পূর্ণতা ও সুস্থতার মর্যাদা যেহেতু এত উচ্চ এবং এর গুরুত্ব যেহেতু এত ব্যাপক, তাই হৃদয়ের সুস্থতা কীভাবে অর্জিত হয়, তা জানা অপরিহার্য। বিশেষ করে যারা বিশ্বাস করেন, হৃদয়ের সুস্থতা ও দৃঢ়তাই সব ধরনের কল্যাণের ভিত্তি, হেদায়েতের অবলম্বন এবং সব ভালো কাজের প্রেরণা।

হে আল্লাহর বান্দারা! হৃদয়ের সুস্থতা দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল।

প্রথমত, বান্দার কাছে মহান আল্লাহর ভালোবাসা অন্য সব ভালোবাসার চেয়ে অগ্রাধিকার পেতে হবে। যখন আল্লাহর ভালোবাসার সঙ্গে অন্য কিছুর ভালোবাসার সংঘাত সৃষ্টি হবে, তখন আল্লাহর ভালোবাসাই প্রাধান্য পাবে। অন্য সব ভালোবাসার ওপর আল্লাহর ভালোবাসাকে স্থান দিতে হবে। এর ফলে আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের মানসিকতা তৈরি হবে।

কিন্তু বান্দা যখন নিজের পছন্দ ও প্রবৃত্তিকে মহান আল্লাহর পছন্দ ও সন্তুষ্টির ওপর প্রাধান্য দেয়, তখন তার পরিণতি হয় ভয়াবহ। তার সব কামনা-বাসনা একের পর এক তার ওপর চেপে বসে। অথচ সে সেগুলোর কোনোটিই অর্জন করতে পারে না। তার অবস্থা হয় এমন ব্যক্তির মতো, যে অসম্ভব কিছু পাওয়ার চেষ্টা করে। অথচ তা বাস্তবে সম্ভব নয়, কোনো সামর্থ্য দিয়ে তা অর্জন করা যায় না এবং কোনো উপায়-উপকরণও সেখানে পৌঁছাতে পারে না।

মহান আল্লাহ এমন সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যে ব্যক্তি তাকে ছাড়া অন্য কিছুকে ভালোবাসবে, সে তা দ্বারাই কষ্ট পাবে। যে ব্যক্তি তাকে ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করবে, তার ওপর সেই ভয়ের বিষয়টিই কর্র্তৃত্বশীল হয়ে উঠবে। আর যে ব্যক্তি তাকে ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, সেটিই তার জন্য দুর্ভাগ্য ও বিপর্যয়ের কারণ হবে।

মহান আল্লাহর ভালোবাসা, সর্বদা তার স্মরণ, তার প্রতি নির্ভরতা এবং সব ধরনের আনুগত্যে তাকে এককভাবে গ্রহণ করা হলো দুনিয়ার জান্নাত। এটি এমন এক নেয়ামত, যার সঙ্গে অন্য কোনো নেয়ামতের তুলনা হয় না। এটি আল্লাহপ্রেমীদের চোখের প্রশান্তি। মানুষের চোখের প্রশান্তি নির্ভর করে মহান আল্লাহর মাধ্যমে তার হৃদয় কতটা প্রশান্তি লাভ করেছে, তার ওপর। যার হৃদয় আল্লাহর মাধ্যমে প্রশান্তি লাভ করে, তার কারণে অন্যদের চোখও প্রশান্ত হয়। আর যার হৃদয় আল্লাহর মাধ্যমে প্রশান্ত হয় না, সে দুনিয়ার পেছনে ছুটতে ছুটতে আক্ষেপ ও অনুশোচনায় নিজেকে ক্ষয় করে। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) এ কথাই বলেছেন।

দ্বিতীয়ত, যে বিষয়টির মাধ্যমে হৃদয় সুস্থ ও সুদৃঢ় হয়, তা হলো মহান আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা। আর এই সম্মানবোধ তৈরি হয় মহান আল্লাহর প্রতি সম্মান ও মর্যাদাবোধ থেকে। যারা আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের প্রতি অবহেলা করে, আল্লাহ তাদের নিন্দা করেছেন। কোরআনে নুহ (আ.)-এর ভাষ্য এভাবে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করছ না?’ (সুরা নুহ ১৩) অর্থাৎ তোমাদের কী হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর মহত্ত্বকে ভয় করো না এবং তার মর্যাদাকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করো না?

হে আল্লাহর বান্দারা! মহান আল্লাহ তার রাসুল (সা.)-এর কাছে সমগ্র মানবজাতির জন্য যে বার্তা দিয়ে পাঠিয়েছেন, তার দাবি হলো, আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য করা। আর তা সম্ভব নয়, যদি না আল্লাহর আদেশকে যথাযথ সম্মান করে তা অনুসরণ করা হয় এবং তার নিষেধের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তা থেকে বিরত থাকা হয়।

এভাবেই আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের প্রতি সম্মান প্রদর্শনকারী ব্যক্তি সৎকর্মশীল ও উত্তম বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হন। তার ইমান, সত্যনিষ্ঠা, বিশুদ্ধ আকিদা এবং শিরক থেকে মুক্ত থাকার সাক্ষ্য পাওয়া যায়।

অন্যদিকে যে ব্যক্তি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ, তাদের কাছে মর্যাদা ও সম্মান লাভের আশায় আল্লাহর আদেশ পালন করে এবং নিষেধ থেকে বিরত থাকে, তার অবস্থা ভিন্ন। সে ভয় করে, মানুষের চোখে তার মর্যাদা কমে যেতে পারে। একইভাবে পার্থিব শাস্তির আশঙ্কাও তাকে তাড়িত করে। এমন ব্যক্তির কোনো কাজ করা কিংবা কোনো কাজ থেকে বিরত থাকার পেছনে আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের প্রতি সম্মানবোধ কাজ করে না। আল্লাহর আদেশদাতা ও নিষেধকারী সত্তার প্রতিও তার প্রকৃত সম্মানবোধ থাকে না। বরং সে নিজের স্বার্থ, উদ্দেশ্য ও আকাক্সক্ষা পূরণের জন্যই আনুগত্য করে।

এ ধরনের আচরণ আল্লাহর প্রতি ইখলাসের পরিপন্থী। একই সঙ্গে তা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণেরও পরিপন্থী। অথচ আল্লাহর কাছে আমল কবুল হওয়ার জন্য এই দুটি বিষয়ই শর্ত।

হে আল্লাহর বান্দারা! আপনারা আল্লাহকে ভয় করুন। আল্লাহর আদেশ অনুসরণ ও তার কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণের মাধ্যমে তার আদেশের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুন। তার নিষেধ থেকে বিরত থেকে এবং তা থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে তার নিষেধের প্রতি সম্মান দেখান। একই সঙ্গে তার ভালোবাসা অর্জন, তাকে চেনা এবং তার নৈকট্য লাভের চেষ্টা করুন। মহান আল্লাহ তার কিতাবের হেদায়েত এবং তার নবীর সুন্নাহর মাধ্যমে সবাইকে উপকৃত করুন।

হে আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি নিদর্শন ও পরিচায়ক রয়েছে। তা হলো, নির্ধারিত সময় ও সীমারেখা যথাযথভাবে রক্ষা করা, ইবাদতের রুকন ও ওয়াজিবগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর প্রতি যত্নবান হওয়া। নির্ধারিত সময়ে তা সম্পন্ন করার জন্য তৎপর হওয়া এবং তা ফরজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পালনে দ্রুত উদ্যোগী হওয়া। আর কোনো কিছু ছুটে গেলে তার জন্য অনুতপ্ত হওয়া, দুঃখ প্রকাশ করা এবং মনে কষ্ট অনুভব করা।

এর একটি উদাহরণ হলো, কারও জামাতে নামাজ ছুটে গেলে এর ফজিলত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে দুঃখিত ও অনুতপ্ত হওয়া। কেননা, একাকী নামাজ আদায় এবং জামাতে নামাজ আদায়ের মধ্যে ফজিলতের যে পার্থক্য রয়েছে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৩০ অক্টোবর শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। ভাষান্তর করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান