ব্যবসায়ীদের আন্দোলন থামাতে গণশুনানি করে তাদের মুনাফা বৃদ্ধি করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। গত ২৯ অক্টোবর ওই গণশুনানিতে ব্যবসায়ীরা কথা দিয়েছিলেন, তাদের মুনাফা বৃদ্ধি করলে সরকারনির্ধারিত দামেই ভোক্তারা এলপিজি পাবেন। গত সোমবার রাত ৮টার পর থেকে বিইআরসির নির্ধারিত দাম কার্যকর হওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। মঙ্গলবার-বুধবার রাজধানীর কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সরকারনির্ধারিত দাম কেউই মানছেন না।
দাম বাড়ালেও গ্রাহক কেন সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি পাচ্ছেন না এ বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেছে, শুধু দাম বাড়ালেই চলবে না, বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরবরাহ বাড়াতে হবে। অন্তত ৩০ শতাংশ মার্কেট শেয়ার থাকা কোম্পানিগুলোর সিলিন্ডারের বিষয়ে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যতক্ষণ না পর্যন্ত বাজারে সরবরাহ বাড়ানো হবে, ততক্ষণ এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।
গত আগস্টের শেষ থেকেই এলপিজির বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। গত দুই মাস ধরেই ঢাকার গ্রাহকরা সরকারনির্ধারিত দামের চেয়ে অন্তত ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দামে এলপিজির ১২ কেজির বোতল কিনছেন। সরকার কঠোর হওয়ার চেষ্টা করলেই আন্দোলনে নামেন এলপিজির পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা। আন্দোলন থামাতে সরকার বিক্রেতাদের দাবি মেনে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। বিইআরসি গণশুনানি করে অপারেটর, বিক্রেতা সবার মুনাফা বাড়িয়ে দেয়। মুনাফা বৃদ্ধির পর এই অবস্থা কেন তা জানার জন্য খুচরা বিক্রেতাদের প্রশ্ন করা হলে তারা বলেছেন, বেশি দামে এলপিজি কিনতে হচ্ছে। কমে তারা কী করে বিক্রি করবেন? অন্যদিকে পাইকারি বিক্রেতারা বলেন, তারাও বেশি দামে কিনছেন, তাহলে কমে কী করে বিক্রি করবেন?
চাহিদা বাড়লেও আমদানি কমছে : জ্বালানি বিভাগের হিসাব বলছে, প্রতিবছর অন্তত ১২ শতাংশ হারে এলপিজির চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাব বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১৬ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৩ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ১৭ লাখ ৯৭ হাজার ৭৭৬ টন। অর্থাৎ ২০২২-২৩-এর তুলনায় ২০২৪-২৫-এ আমদানি বেশি হয়েছে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫-২৬-এ আমদানি কমেছে ৩ শতাংশ। ওই বছর আমদানি হয়েছে ১৭ লাখ ৪৩ হাজার ৬৯৫ টন। আমদানি বৃদ্ধির বদলে আমদানি কমে যাওয়ায় বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকট তৈরির প্রধান কারণ হচ্ছে, বাজারের বড় চার কোম্পানি এলপিজি আমদানি সীমিত করেছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ একেবারে এলপিজি আমদানি এবং বাজারজাত করছে না। কোম্পানিগুলো হচ্ছে বসুন্ধরা, বেক্সিমকো এলপিজি, ইউনিটেক্স এলপিজি এবং ওরিয়ন এলপিজি। বাজারে এসব কোম্পানির প্রায় ২ কোটি সিলিন্ডার রয়েছে; যা কেউ রিফিল করছে না। বাজারে এসব প্রতিষ্ঠানের ডিলার, খুচরা বিক্রেতা ও ভোক্তাদের কাছে সিলিন্ডারও রয়েছে।
মূল সমস্যা কোথায় : প্রথমে যখন একজন গ্রাহক এলপিজি সিলিন্ডার কেনেন, তখন তাকে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির সিলিন্ডার কিনতে হয়। প্রথমবার সিলিন্ডার কেনার সময় তাকে এজন্য নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করতে হয়। এরপর গ্রাহক যখন পুনরায় সিলিন্ডার কিনতে যান, তখন তাকে সাধারণত ওই নির্দিষ্ট কোম্পানির সিলিন্ডার দেওয়া হয়। ধরা যাক, একজন গ্রাহক ইউনিটেক্স এলপিজির সিলিন্ডার কিনেছিলেন। তিনি যখন গ্যাস কিনতে যাচ্ছেন, তখন তাকে ইউনিটেক্সের সিলিন্ডারই কিনতে হয়। কোনো কারণে ইউনিটেক্সের সরবরাহ কম থাকলে তাদের গ্যাসের দামও বেশি থাকে। তখন দোকানি যেমন বাড়তি দাম চান, আবার গ্রাহকও সিলিন্ডার বদলাতে গেলে আরও বেশি খরচ হবে বিবেচনা করে বাড়তি দামে এলপিজি কিনতে বাধ্য হন। এক কোম্পানির সিলিন্ডার অন্য কোম্পানি রিফিল করে না। এতে করে বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা কম সরবরাহের কোম্পানিগুলোর গ্রাহকরা বাড়তি দামেই এলপিজি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। আর যেসব কোম্পানি বাজারে রয়েছে, তারা চাইছে এসব কোম্পানি আর যাতে ফিরে এসে নতুন করে প্রতিযোগিতা না করে। আবার তারা সিলিন্ডারের সংখ্যাও বাড়াচ্ছে না। ফলে ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
বাজারের কী অবস্থা : রাজধানীর মেরাদিয়া এলাকার খান টেলিকম এলপিজির খুচরা বিক্রেতা। তিনি বলেন, তার দোকানে ফ্রেশ এবং যমুনা এলপিজি রয়েছে। উভয় কোম্পানির এলপিজি তিনি ২ হাজার ৫০০ করে করে বিক্রি করছেন। তিনি নির্ধারিত দামের চেয়ে কেন বেশি দামে বিক্রি করছেন জানতে চাইলে বলেন, তিনি বেশি দামে প্রতি বোতল ২ হাজার ৩০০ টাকা করে কিনেছেন। কার কাছ থেকে বেশি দামে কিনেছেন জানতে চাইলে বলেন, পাইকারি বিক্রেতা খান ট্রেডার্স। এই প্রতিষ্ঠানের ফোন নম্বর নিয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. লিটন ২ হাজার ৩০০ করে বিক্রির কথা স্বীকার করেন। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির কারণ জানতে চাইলে বলেন, তিনি তো কোম্পানির কাছ থেকে এলপিজি পাচ্ছেন না। এজন্য আজকে দোকান বন্ধ রেখেছেন।
রাজধানীর বনশ্রী সি ব্লকের ১২ নম্বর রোডের ফরাজি এন্টারপ্রাইজের বিক্রেতা আরমান জানান, তার কাছ থেকে গ্যাস নিতে হলে প্রতি বোতল ওমেরার জন্য ২ হাজার ৪০০ টাকা আর ইউনি গ্যাস নিতে হলে দিতে হবে ২ হাজার ৫০০ টাকা। সরকার ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে, সেখানে তিনি এত বেশি দামে কেন বিক্রি করছেন জানতে চাইলে বলেন, শুধু তারা নয়, সবাই এমন দামে বিক্রি করছে। বিশ্বাস না হলে খোঁজ নিয়ে দেখতে বলেন।
রাজধানীর পূর্ব রামপুরার মায়ের দোয়া এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী তারেক জানান, তার কাছে টিএমএসএস এবং ওমেরার এলপিজি রয়েছে। এই দোকানি জানান, ওমেরার এলপিজি নিতে হলে তাকে বোতলে ২ হাজার ২০০ আর টিএমএসএসের বোতল নিতে হলে তাকে ২ হাজার ৪০০ করে দিতে হবে। বেশি দাম কেন নিচ্ছেন জানতে চাইলে বলেন, ‘এমন দাম তো সরকার নির্ধারণ করেই। কিন্তু তা মানে কে!’
রাজধানীর হাতিরপুলের সোনালী এন্টারপ্রাইজের জাকির হোসেন বলেন, তিনি এলপিজি বিক্রি করছেন প্রতি বোতল ২ হাজার ৬০০ করে। এত বেশি দামে কেন বিক্রি করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ করে কিনেছেন। এর সঙ্গে আবার পৌঁছানোর খরচ আছে। তাহলে তিনি কত করে এলপিজি বিক্রি করবেন?
ডিস্ট্রিবিউটররা কী বলছেন : এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন দাবি করেন, কোথাও বাড়তি দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে না। সব জায়গায় সরকারনির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে। বাজারের এই চিত্র তুলে ধরে কোন দোকানে কত দামে বিক্রি হচ্ছে তা জানালে তিনি বলেন, যমুনা, বিএম, ওমেরা, টিএমএসএস, আই গ্যাস, পেট্রোম্যাক্স এসব কোম্পানির ডিলার পয়েন্টে সরকারনির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে। একজন গ্রাহকের পক্ষে এই আট কোম্পানির ডিলারকে খুঁজে বের করে এলপিজি কেনা সম্ভব কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, খুচরা ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করা তো আমাদের দায়িত্ব নয়। আর তাদের কেউ নিয়ন্ত্রণও করতে পারে না। অন্যদিকে এই আট কোম্পানির বাইরের কোনো কোম্পানির ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটররাও বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করলে সেই দায়ও তাদের নয়। কারণ এসব কোম্পানির এলপিজি সরবরাহ কম থাকায় কয়েক হাত ঘুরে ব্যবসায়ীরা এলপিজি পান।
বিইআরসি কী বলছে : জানতে চাইলে বিইআরসির সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, ‘এলপিজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের কমিশন বৃদ্ধি করতে হবে। গত কয়েক বছর কমিশন না বাড়ানোয় আমরা তাদের কমিশন বৃদ্ধির প্রস্তাব আমলে নিয়ে যৌক্তিক হারে কমিশন বাড়িয়েছি। তাদের উচিত ছিল বিইআরসির নির্ধারিত দামে ভোক্তার কাছে এলপিজি বিক্রি করা।’ তিনি বলেন, বাজারে যে দেড় থেকে ২ কোটি সিলিন্ডার রয়েছে, সেগুলো রিফিল না হওয়াটাও একটি সমস্যা সৃষ্টি করেছে। ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার কারণে এক কোম্পানির সিলিন্ডার অন্য কেউ রিফিল করতে চাইছে না। তিনি বলেন, বিইআরসির নির্ধারিত দাম না মানলে এবার তারাও কঠোর হবে।