দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই

দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ, যা দক্ষিণ এশিয়ার ‘বিশ্বকাপ’ বলেও খ্যাত। আঞ্চলিক ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই আসর ঘিরে আবারও উত্তাপ ছড়াতে যাচ্ছে ঢাকায়। আজ জাতীয় স্টেডিয়ামে শুরু হচ্ছে সাফের ১৫তম আসর। ফিফা থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে পারেনি নেপাল। তাই হিমালয়ের দেশটিকে ছাড়াই এবারের প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার বাকি ছয় দেশ, বাংলাদেশ, ভারত, মালদ্বীপ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ভুটান। স্বাগতিক বাংলাদেশের সামনে একদিকে ঘরের মাঠে শিরোপা জয়ের স্বপ্ন, অন্যদিকে ভারতের সামনে দশমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার হাতছানি।

১৯৯৩ সালে পাকিস্তানের লাহোরে চার দল নিয়ে শুরু হয়েছিল এই প্রতিযোগিতা। প্রথম আসরেই শিরোপা জিতে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে নিজেদের আধিপত্যের জানান দেয় ভারত। সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতার পরিসর বেড়েছে, বদলেছে নামও। একসময় সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কো-অপারেশন (সার্ক) গোল্ড কাপ নামে পরিচিত এই টুর্নামেন্ট পরবর্তী সময়ে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। আঞ্চলিক ফুটবলের বিকাশ ও দেশগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়াতে এই আসর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।

এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১৪টি আসরে সবচেয়ে সফল দল ভারত। তারা শিরোপা জিতেছে নয়বার- ১৯৯৩, ১৯৯৭, ১৯৯৯, ২০০৫, ২০০৯, ২০১১, ২০১৫, ২০২১ ও ২০২৩ সালে। মালদ্বীপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে দুবার, ২০০৮ ও ২০১৮ সালে। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তান একবার করে শিরোপা জিতেছে। শ্রীলঙ্কা ১৯৯৫ সালে, বাংলাদেশ ২০০৩ সালে এবং আফগানিস্তান ২০১৩ সালে চ্যাম্পিয়ন হয়। সর্বশেষ ২০২৩ সালের আসরে ফাইনালে কুয়েতকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল ভারত।

বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে সাফের বিশেষ আবেগ রয়েছে। ২০০৩ সালে ঢাকার মাটিতেই প্রথম ও এখন পর্যন্ত একবার এই প্রতিযোগিতার শিরোপা জিতেছিল লাল-সবুজের দল। এরপর ২০০৯ ও ২০১৮ সালে ঘরের মাঠে আয়োজন হলেও আর শিরোপা জেতা হয়নি বাংলাদেশের। সর্বশেষ ২০২৩ সালে ভারতে আয়োজিত আসরের সেমিফাইনালে উঠেছিল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। এবার হামজা চৌধুরী ও শমিত সোমের মতো প্রবাসী ফুটবলারদের অন্তর্ভুক্তিতে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে সমর্থকদের মধ্যে।

তবে শিরোপার পথে চ্যালেঞ্জও কম নয়। নয়বারের চ্যাম্পিয়ন ভারত এবারও ফেভারিটদের একটি। যদিও দ্বিতীয় সাঁরির দল এসেছে ঢাকায়। অন্যদিকে মালদ্বীপের রয়েছে দুইবার শিরোপা জয়ের অভিজ্ঞতা। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানও নিজেদের দিনে কঠিন প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পারে। ভুটানও সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়িয়েছে।

এবারের আসর ৫ থেকে ১৭ নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে এই টুর্নামেন্ট। উদ্বোধনী দিনে বিকেল সাড়ে ৩টায় মুখোমুখি হবে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তান। রাত ৮টায় স্বাগতিক বাংলাদেশ খেলবে ভুটানের বিপক্ষে। দুই গ্রুপের শীর্ষ দুটি করে দল উঠবে সেমিফাইনালে। ১৪ নভেম্বর সেমিফাইনাল শেষে ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে ফাইনাল।

ঘরের মাঠে ২৩ বছর পর সাফের মুকুট ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ। সেই স্বপ্ন পূরণে মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি কাজে লাগাতে হবে ঘরের দর্শকদের সমর্থনও। ২৩ বছরের অপেক্ষা ঘোচাতে আত্মবিশ্বাসী ডুলি, তপুর কণ্ঠে শিরোপার প্রত্যয়ও। আট বছর পর দেশের মাটিতে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে অংশ নিতে মুখিয়ে আছে পুরো দল। কোচ টমাস ডুলি মনে করেন, কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস ও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার মানসিকতা থাকলে এবার শিরোপা জেতা সম্ভব। ডুলি বলেন, ‘গত ২৩ বছরে শিরোপা না জেতার চাপ হয়তো আগের সময়গুলোতে আরও বেশি ছিল। এখন আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি এবং আমাদের বিশ্বাস, আমরা ভালো করতে পারব। এই দলটির পক্ষে শিরোপা জেতা বাস্তবসম্মত লক্ষ্য। কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়াই করতে পারলে আমরা সেটি অর্জন করতে পারি।’

গত মে মাস থেকে সাফের প্রস্তুতি শুরু করেছে বাংলাদেশ। এই সময়ে কিছু উত্থান-পতন থাকলেও প্রস্তুতি নিয়ে সন্তুষ্ট কোচ। তার মতে, স্বাগতিক হওয়ার কারণে বাংলাদেশের ওপর প্রত্যাশা বেশি। দর্শকদের সমর্থনও দলকে বাড়তি শক্তি জোগাতে পারে। তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে মাঠে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করতে হবে। ডুলি বলেন, ‘স্বাগতিক হিসেবে আমরা এখন আর আন্ডারডগ নই। সবাই আমাদের কাছে জয় প্রত্যাশা করছে। আমাদের প্রতিটি দলের বিপক্ষে প্রমাণ করতে হবে যে, আমরা শিরোপার যোগ্য। আমরা ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামতে চাই এবং একে অপরের জন্য লড়াই করতে চাই।’

বাংলাদেশের অধিনায়ক তপু বর্মণও মনে করেন, প্রথম ম্যাচটি পুরো টুর্নামেন্টের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভুটানের বিপক্ষে জয়ের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামবে দল। পাশাপাশি দেশের ফুটবলপ্রেমীদের আত্মবিশ্বাসী হওয়ার মতো ফুটবল উপহার দিতে চান তারা। তপু বলেন, ‘টুর্নামেন্টে প্রথম ম্যাচ সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জেতার জন্য মাঠে নামব এবং পুরো বাংলাদেশকে ভালো ফুটবল উপহার দিতে চাই। ২৩ বছর পর আমাদের সামনে ভালো একটি সুযোগ এসেছে। আমরা সেটি হাতছাড়া করতে চাই না। দেশের ফুটবলপ্রেমীদের অনুরোধ করব, তারা যেন আমাদের মন থেকে সমর্থন করেন। আমরাও সেই সমর্থনের প্রতিদান ট্রফি জিতে দিতে চাই।’ ভুটানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে হামজা চৌধুরীকে পাবে না বাংলাদেশ। তার অনুপস্থিতি দলের জন্য বড় ক্ষতি বলে মনে করেন তপু। তার ভাষায়, ‘আমরা চাই ভুটানের বিপক্ষে জিততে, যাতে হামজা এসে ভালো মনোবল নিয়ে দলের সঙ্গে যোগ দিতে পারে। আমরা তাকে জয় দিয়ে স্বাগত জানাতে চাই।’

সাফে বাংলাদেশের অধিনায়কত্ব নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন ওঠে। সাধারণত জামাল ভূঁইয়াকে অধিনায়ক হিসেবে দেখা গেলেও আসন্ন ম্যাচে দায়িত্ব পেয়েছেন তপু বর্মণ। ডুলির ব্যাখ্যা, দলের নেতৃত্ব শুধু অধিনায়কের বাহুবন্ধনীতে সীমাবদ্ধ নয়। জামাল, হামজা, তপু ও সাদসহ দলের একাধিক খেলোয়াড় নেতৃত্ব দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন। রক্ষণভাগকে সংগঠিত রাখা এবং মাঠে সতীর্থদের দিকনির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে একজন সেন্টার ব্যাক অধিনায়ক হলে সুবিধা পাওয়া যায় বলেও জানান তিনি।

এদিকে প্রস্তুতির সময় কয়েকজন খেলোয়াড়ের চোট এবং প্রস্তুতি ম্যাচ না খেলতে পারা নিয়েও কথা বলেন ডুলি। তার মতে, টুর্নামেন্টের আগে প্রীতি ম্যাচ খেলা উপকারী হতো। কিন্তু উপযুক্ত প্রতিপক্ষ না পাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি চোটের ঝুঁকি এড়াতে খেলোয়াড়দের নিয়ে বাড়তি সতর্ক থাকতে হয়েছে। এশিয়ান কাপে দলের খেলার ধরনেও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ছিল বলে স্বীকার করেন কোচ। পাস দেওয়া ও বল নিয়ন্ত্রণে সহজ ভুল কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছেন তারা।

তপু মনে করেন, ঘরের মাঠে সাফ আয়োজন বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ। চাপ থাকলেও সেটিকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে চান তারা। তার বিশ্বাস, সবাই দল হিসেবে খেলতে পারলে ভালো কিছু অর্জন করা সম্ভব। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শিরোপা জিততে হলে মাঠের পারফরম্যান্সেই সেই বিশ্বাসের প্রমাণ দিতে হবে বাংলাদেশকে।