পোশাকশ্রমিকদের বেতন বাড়ছে ডিসেম্বরেই

বেতন বৃদ্ধির দাবিতে দেশের প্রধান শিল্পঘন এলাকাগুলোতে গত এক সপ্তাহ ধরে চলা সহিংস শ্রমিক আন্দোলনের মাথায় দাবি বাস্তবায়নে সরকারের সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত এসেছে। গতকাল বুধবার নবগঠিত ন্যূনতম মজুরি বোর্ড প্রথম সভাশেষে ডিসেম্বর থেকেই শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। শ্রমিকরা এই বর্ধিত বেতন পাবেন জানুয়ারিতে। এ ব্যাপারে মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। এ প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। তবে সরকার-মালিক ও শ্রমিক এই ত্রিপক্ষীয় যৌথ ঘোষণার পরও ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে সহিংস শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনা ঘটেছে।

গত বৃহস্পতিবার থেকেই ঢাকার মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বেতন বৃদ্ধির দাবিতে পোশাকশ্রমিকরা আন্দোলন শুরু করে। একপর্যায়ে আন্দোলন সহিংস হয়ে উঠলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থান নেন। এরই মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষ, কারখানা ও পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া এবং হত্যাকা-ের ঘটনাও ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ শতাধিক শ্রমিককে গ্রেপ্তারও করে। সরকারের পক্ষ থেকে এই আন্দোলনে বহিরাগতদের উসকানি ও সহিংসতা চালানোর তথ্যও প্রকাশ করা হয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কতিপয় প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে শ্রমিক আন্দোলনকে সহিংস করে তুলতে অর্থায়নের তথ্যও জানায় সরকার।

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতির শুরুতেই সরকার পোশাকশ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বেতন বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে গত রবিবার ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করে দেয়। সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে নতুন মজুরি বোর্ডের ঘোষণা দেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। সড়ক ছেড়ে কাজে ফিরে যেতে শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। এর আগে শুক্রবার শ্রমিক নেতা এবং শনিবার তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন মন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিজিএমইএর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

ঘোষিত ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয় সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। অন্য সদস্যরা হলেন মালিকপক্ষের প্রতিনিধি বিজিএমইএর পরিচালক এবিএম শামছুদ্দিন, শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব ও নিরপেক্ষ দুই সদস্য মোসলেহ উদ্দিন আহমদ ও আনোয়ার হোসাইন। কিন্তু আশফাকুর রহমান জরুরি পারিবারিক প্রয়োজনে বোর্ডের কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম না হওয়ায় গতকাল বুধবার তাৎক্ষণিক বোর্ডের চেয়ারম্যান পরিবর্তন করে পিরোজপুরের ‘শিশুর প্রতি সহিংসতা দমন’ ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) সৈয়দ আজাদ সুবহানীকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

নিয়োগ পেয়ে গতকালই বেলা ১১টায় নিম্নতম মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা আহ্বান করেন সৈয়দ আজাদ সুবহানী। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় নিম্নতম মজুরি বোর্ডের অফিসে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাশেষে মজুরি বোর্ডে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাবুল আখতার সাংবাদিকদের বলেন, ডিসেম্বরে নতুন মজুরি বাস্তবায়ন হবে। জানুয়ারি থেকে শ্রমিকরা নতুন মজুরি হাতে পাবেন বলে একমত হয়েছেন মালিকপক্ষের প্রতিনিধি।

পোশাক কারখানার মালিকদের প্রতিনিধি এবিএম শামসুদ্দিন এ সিদ্ধান্তে একমত প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছেন বাবুল আখতার। এ সময় শ্রমিকদের কারখানায় কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান এ শ্রমিক নেতা। তিনি আরও বলেন, শ্রমিকরা সাধারণত সহিংস কর্মকা-ে জড়িত নন। শ্রমিকনেতা ও সাধারণ শ্রমিকদের গ্রেপ্তার না করা এবং যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের দ্রুত মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

বাবুল আখতার বলেন, মজুরি নির্ধারণের দায়িত্ব সরকারের নিম্নতম মজুরি বোর্ড ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের। কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রেখে আন্দোলন করলেই কোনো একক মালিকের পক্ষে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তাই শ্রমিকদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছি আমরা। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এবিএম সামছুদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা মালিকপক্ষ, শ্রমিকপক্ষ সবাই একসঙ্গে অত্যন্ত সৌহার্দপূর্ণভাবে আলোচনা করেছি এবং ডিসেম্বরের মধ্যে আমাদের এই কার্যক্রম সম্পন্ন করতে উভয় পক্ষ সম্মত। শ্রমিকরা ডিসেম্বর মাসের বেতনের সঙ্গে বাড়তি বেতন পাবে জানুয়ারিতে।’

মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আজাদ সুবহানী সাংবাদিকদের বলেন, ‘গতকাল বোর্ডের প্রথম সভায় মজুরি নির্ধারণের আইনগত প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আশা করছি, অচিরেই পরবর্তী সভায় মজুরি নির্ধারণের সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারব। মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা তাদের অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরেছেন। পরবর্তী সভায় তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনে লিখিত প্রস্তাব ও সুপারিশ নেওয়া হবে।’

এর আগে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের সুপারিশ তৈরিতে মজুরি বোর্ডকে ৭টি সভা করতে হয়েছিল। এবার কতটি সভার প্রয়োজন হতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে সৈয়দ আজাদ সুবহানী বলেন, ‘সাধারণত এ ধরনের কাজের জন্য ছয় মাসের সময়সীমা থাকে। বোর্ড গঠনের ৩ দিনের মধ্যেই প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হলো। তাই এবার আগের মতো দীর্ঘ সময় লাগবে না। বোর্ডের পরবর্তী সভা আগামী সপ্তাহে হতে পারে।’ শ্রমিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘বোর্ডের কর্মপরিকল্পনা ও কার্যপদ্ধতি শ্রমিকদের স্বার্থের পক্ষেই রয়েছে। মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরাও সভায় শ্রমিকদের বিষয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বলেছেন। তাই শ্রমিকদের বোর্ডের ওপর আস্থা রাখার অনুরোধ করছি।’

সর্বশেষ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পোশাক খাতে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নিম্নতম মজুরি ঘোষণা ও কার্যকর হয়। সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর পরপর পোশাক খাতে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়। তবে গত ১০ এপ্রিল শ্রম আইন সংশোধন বিল সংসদে পাস হয়। এতে মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময় পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়। সেই হিসাবে চলতি নভেম্বর মাসেই নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড ঘোষণার কথা ছিল।

শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি প্রসঙ্গে শ্রমিকনেতা বাবুল আখতার সাংবাদিকদের বলেন, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন বিভিন্ন অঙ্কের মজুরির প্রস্তাব দিয়েছে। কেউ ৩০ হাজার টাকা, কেউ ২৭ হাজার টাকা, আবার কেউ ডলারের হিসাবে মজুরি দাবি করেছেন। তবে সব শ্রমিক ফেডারেশন একসঙ্গে বসে একটি সমন্বিত দাবি তৈরি করে পরবর্তী সভায় বোর্ডের কাছে উপস্থাপনের চেষ্টা করবে।

পূর্ববর্তী মজুরি বৃদ্ধির হিসাবে দেখা যায়, পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ২০১৩ সালে ৩,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫,৩০০ টাকা করা হয়েছিল, যা পূর্ববর্তী মজুরি কাঠামোর চেয়ে প্রায় ৭৬.৬৬ শতাংশ বেশি। ২০১৮ সালে ৫১ শতাংশ বৃদ্ধি করে ন্যূনতম বেতন নির্ধারণ করা হয় ৮,০০০ টাকা। শেষবার ২০২৩ সালে ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ বাড়িয়ে ন্যূনতম বেতন ধরা হয় ১২,৫০০ টাকা।

ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে কয়েক দিন ধরে ঢাকার মিরপুর, সাভারের আশুলিয়া, গাজীপুরের কালিয়াকৈর, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লাসহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন করে আসছেন শ্রমিকরা। শ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠনের পরও বিভিন্ন স্থানে তাদের সহিংস আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কারণে বহু পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। নাশকতা প্রতিরোধে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

মজুরি বোর্ড কয়েকটি ধাপে সব পদে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির সুপারিশ করে থাকে। বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা ও তা গেজেট হিসেবে প্রকাশ করবে সরকার। এরপরই মালিকপক্ষ তা বাস্তবায়ন শুরু করবে। অতীতে বেতন বৃদ্ধির দাবি উত্থাপন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত বাস্তবায়ন পর্যন্ত শ্রমিক অসন্তোষ ও সহিংস ঘটনার ইতিহাস রয়েছে।