কঠিন চ্যালেঞ্জে ট্রাম্প

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যে শোচনীয় পরাজয় হবে, তা টের পাওয়া গেছে আগেই। জনমত জরিপগুলোও তাই বলছিল। তবে প্রেসিডেন্ট হওয়ার ২ বছরের মাথায় এই ফলাফল তার জন্য বড় ধাক্কা বলতেই হবে। যে শান্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেখান থেকে দূরে সরে যাওয়ায় তার এই পরিণতি। অপ্রয়োজনীয় ইরান যুদ্ধের কারণে মার্কিন অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপে ক্ষুব্ধ মার্কিন ভোটাররা। শেষ পর্যন্ত গোপন ব্যালটে মুখ ফিরিয়ে নিলেন ট্রাম্পের প্রতি। তবে প্রথম দফায় তিনি যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তখনও ২ বছরের মাথায় মধ্যবর্তী নির্বাচন ফেস করতে হয়েছিল তাকে। সেখানে ‘প্রতিনিধি পরিষদ’ ও ‘সিনেট’ নির্বাচনের ফলাফলে অন্তত একটা ভারসাম্য ছিল। কিন্তু এবার ক্ষমতায় আসার পর পদে পদে তিনি নিজেকে বিতর্কিত করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ আসনের মধ্যে ২২৮টি আসনে জয়লাভ করেন ডেমোক্র্যাটরা। নিয়ন্ত্রণের জন্য দরকার ২১৮টি। সিনেটে ১০০ আসনের মধ্যে ৩৫টিতে নির্বাচন হয়। সব মিলিয়ে সিনেটে ৫৪টি আসন ডেমোক্র্যাটদের দখলে। নিয়ন্ত্রণের জন্য দরকার ছিল ৫১টি।  দশকের পর দশক ধরে রিপাবলিকানদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত জায়গাগুলো এবার হাতছাড়া হয়ে গেল। সামনে দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে ট্রাম্পকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। বিষয়টি টের পেয়ে ভরাডুবির পর মিলেমিশে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। আবার তিনি ‘ভেটো’ ক্ষমতা প্রয়োগের কথাও স্মরণ করিয়ে দিলেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল থেকে নিরাপদ দূরত্ব রাখতে চাইছেন ট্রাম্প। বোঝাতে চাইছেন দল হারলেও তার জনপ্রিয়তা অটুট রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, ‘ব্যালটে আমার নাম ছিল না। যদি থাকত, তা হলে বিপুল ভোটে জিততাম।’ অথচ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই ট্রাম্পই ভোটারদের উদ্দেশে বলেছিলেন ব্যালটে তার নাম আছে, এমনটা ধরে নিয়েই ভোট দিতে। সেই বার্তার পরও সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের সমর্থন না মেলায় এবার দ্রুত তার অবস্থান বদলালেন।

প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে অবশ্য পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন ট্রাম্প। পরাজয়ের জন্য কারচুপি বা অন্য কোনো কারণকে এবার দায়ীও করেননি। এমনকি বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশও করেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘ওদের (ডেমোক্র্যাটদের) সঙ্গে কাজ করার জন্য মুখিয়ে রয়েছি।’ ট্রাম্প এ-ও জানিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ‘পুরোপুরি’ মেনে নিতে প্রস্তুত রয়েছেন তিনি। প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদের বাকি ২ বছর চাপের মধ্যে সরকার চালাতে হবে ট্রাম্পকে। কারণ যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিল ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে পাস করিয়ে আনতে হবে তাকে।

নির্বাচনী পরাজয়ের মধ্যে ট্রাম্প অবশ্য প্রেসিডেন্টের  ভেটো ক্ষমতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। মার্কিন সংবিধান আমেরিকার  প্রেসিডেন্টদের একটি বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছে। এই ক্ষমতাবলে মার্কিন আইনসভায় পাস হওয়া যে কোনো বিল ভেটো প্রয়োগ করে রদ করে দিতে পারেন প্রেসিডেন্ট। কোনো বিলে সম্মতি থাকলে প্রেসিডেন্ট তাতে স্বাক্ষর করবেন। না হলে তা পুনর্বিবেচনার জন্য ফের আইনসভার কাছে পাঠাবেন। ঘটনাচক্রে, বুধবার ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে একটি লাল রঙের টুপির ছবি পোস্ট করেন, যার ওপর সাদা অক্ষরে লেখা রয়েছে ‘ভেটো’।

ভোট গ্রহণের সময়ই ‘সিবিএস নিউজ’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আত্মবিশ্বাসের সুরে জানান, নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, আমেরিকার রাজনীতির ওপর তিনি তার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবেন। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে চূড়ান্ত ক্ষমতা রয়েছে, যাকে বলে ভেটো!’ ট্রাম্প এ-ও জানান, ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধিরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে যদি তাকে ‘মিস্টার ভেটো’ বলে সম্বোধন করা হয়, তবে তাতেও তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন। ট্রাম্পের জন্য আরও একটি অস্বস্তির জায়গা হলো, তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে তদন্ত শুরু করতে পারবে মার্কিন আইনসভার দুই কক্ষই। বিভিন্ন নথিপত্র ও সাক্ষীদের তলব করতে পারবে তারা। এমনকি, শুরু করতে পারবে তৃতীয় বার ট্রাম্পকে বরখাস্ত (ইমপিচ) করার সাংবিধানিক প্রক্রিয়াও।

রিপাবলিকানদের হারে ইরান যুদ্ধের প্রভাব স্বীকার ট্রাম্পের : নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ফক্স নিউজের সঙ্গে আলাপে পরোক্ষভাবে প্রেসিডেন্ট ইরান যুদ্ধের বিরূপ প্রভাবের কথা স্বীকার করেছেন। ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমাদের বড় কিছু করতে হবে।’ এতে ‘বড় ধরনের আঘাত’ হানার বিষয়ও থাকতে পারে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না।’ রিপাবলিকানদের ফলাফলে জ্বালানির উচ্চমূল্যের প্রভাবের কথাও স্বীকার করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, মানুষকে জ্বালানির জন্য বেশি দাম দিতে হওয়ায় তারা ‘খুশি ছিল না’।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অহেতুক ইরান যুদ্ধে হাজারও মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে, যাদের অধিকাংশই ইরান ও লেবাননের বাসিন্দা। মারা গেছে মার্কিন নাকরিকরাও। ভোক্তাপর্যায়ে পণ্যের দাম কমানো, অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বছরে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে ফল হয়েছে উল্টো। তিনি আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ এবং ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে পণ্যের দাম আরও বেড়েছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে প্রতি গ্যালন জ্বালানির গড় দাম ছিল ৪ ডলার ৩০ সেন্ট। সেপ্টেম্বরে ডিজেলের দাম রেকর্ড ৬ ডলার ৫৩ সেন্টে পৌঁছায়। যুদ্ধ শুরুর আগে ফেব্রুয়ারিতে প্রতি গ্যালন জ্বালানির দাম ছিল ২ ডলার ৮৫ সেন্ট পর্যন্ত। অথচ শুরুতে ট্রাম্প নিজেকে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছিলেন। গাজা ও ইউক্রেনের সংঘাত দ্রুত সমাধানের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনই ইউক্রেন যুদ্ধের ইতি টানার কথা বলেছিলেন। সেটা তিনি রাখেননি। শুধু তাই না, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে দিলেন।

আমেরিকার জনগণ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন ওবামা : এক্সে  দেওয়া এক পোস্টে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা লিখেছেন ‘আজ রাতে আমেরিকান জনগণ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন তারা এমন রাজনীতি চান, যা মানুষকে বিভক্ত করার বদলে একত্র করে। তারা এমন  নেতাদের চান, যারা মানুষের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধান দিতে পারেন।’

একসময় যেসব এলাকায় জয় পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম বলে মনে করা হতো, সেসব এলাকায়ও প্রার্থীরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সাহস  দেখিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন ওবামা। তিনি বলেন, ‘এই প্রশাসনের হাতে আরও ২ বছর ক্ষমতা রয়েছে। এখন আমাদের কাজ হলো, কাজে নেমে পড়া, যেখানে পরিবর্তন আনার সুযোগ রয়েছে, সেখানে পরিবর্তন আনা, আরও ক্ষতি ঠেকানো এবং ভবিষ্যতের জন্য ভিত্তি তৈরি করা।’

অভিবাসনের ওপর ব্যাপক নতুন বিধিনিষেধ আরোপ এবং অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন ডেমোক্র্যাট শাসিত বিভিন্ন শহরে ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যদের মোতায়েন করেছে এবং ব্যাপক অভিবাসনবিরোধী অভিযান চালিয়েছে। এসব অভিযানে কেন্দ্রীয় অভিবাসন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন প্রত্যাশীদের আগমন কমেছে এবং এরই মধ্যে কয়েক লাখ অভিবাসীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। হাজার হাজার অভিবাসীই ট্রাম্পকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছিলেন। তারা এসব পদক্ষেপে বিক্ষুব্ধ।

রিপাবলিকান ঘাঁটিতে ডেমোক্র্যাটদের হানা : আইওয়া, কানসাস, টেক্সাস ও সাউথ ক্যারোলিনার মতো রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতে একের পর এক জয়ের ধারাবাহিকতায় সিনেটে ছয়টি আসন বেড়েছে ডেমোক্র্যাটদের। ডেমোক্র্যাটরা মিশিগান ও মিনেসোটায় জয়ের ধারা বজায় রেখেছে। টেক্সাসে গত তিন দশকের বেশি সময় কোনো অঙ্গরাজ্যব্যাপী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হতে পারেননি। সেই অঙ্গরাজ্যেই এবার ডেমোক্র্যাটপ্রার্থী জেমস টালারিকো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পছন্দের প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে বড় ব্যবধানে হারিয়েছেন। সাউথ ক্যারোলিনায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ডরুজ বর্তমান রিপাবলিকান সিনেটর ডারলিন গ্রাহামকে হারিয়েছেন। চলতি বছর তার ভাই লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুর পর তার স্থলাভিষিক্ত করতে ডারলিনকে বেছে নিয়েছিলেন ট্রাম্প। আর ওহাইওতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী শেরড ব্রাউন এমন একটি আসনে জয় পেয়েছেন, যেটি ২ বছর আগে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দখলে ছিল।