অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে রান্না, খাবারে মিশছে বিষাক্ত সিসা

স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে রান্না করা খাবারে মিশছে বিষাক্ত ধাতু সিসা। বিশেষ করে নতুন হাঁড়িতে প্রথমবার রান্নার সময় খাবারে সিসার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি পাওয়া যাচ্ছে। এতে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার ক্ষমতা ও আচরণে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ও যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি থেকে খাবারে কী পরিমাণ সিসা মিশছে এবং রান্না ও পরিষ্কারের পদ্ধতি এর মাত্রাকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, তা পরীক্ষা করেছেন গবেষকেরা। নেচার প্রকাশিত জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজি সাময়িকীতে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণায় স্থানীয় পরিবারের কাছ থেকে সংগ্রহ করা সাতটি ব্যবহৃত হাঁড়ি এবং সরবরাহকারীর কাছ থেকে কেনা ২০টি নতুন হাঁড়ি পরীক্ষা করা হয়। প্রথমে হাঁড়িগুলোর ধাতুতে সিসার পরিমাণ নির্ণয় করেন গবেষকেরা। পরে সেগুলোতে ভাত ও খিচুড়ি রান্না করে খাবার ও তরলে সিসার উপস্থিতি পরিমাপ করা হয়।

পরীক্ষায় দেখা গেছে, নতুন ও পুরোনো—সব হাঁড়ি থেকেই খাবারে সিসা মিশেছে। নতুন হাঁড়িতে প্রথমবার রান্না করা ভাতে প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম এবং খিচুড়িতে ৪২০ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া গেছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) নির্দেশনা অনুযায়ী, শিশুদের খাবারে সিসার মাত্রা প্রতি কেজিতে ১০ মাইক্রোগ্রাম। বারবার ব্যবহারে সিসার পরিমাণ কমলেও তৃতীয়বার রান্নার সময়ও এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ব্যবহৃত সাতটি হাঁড়ির মধ্যে ছয়টিতে রান্না করা ভাতেও সিসা শনাক্ত হয়েছে।

হাঁড়ি পরিষ্কার ও রান্নার পদ্ধতিও সিসা নির্গমনে প্রভাব ফেলে। নতুন হাঁড়ি স্টিলের তারযুক্ত স্ক্রাবার দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করলে না ঘষে পরিষ্কারের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি সিসা বের হয়। ধাতব খুন্তি দিয়ে খাবার নাড়াচাড়া করলেও সিসা নির্গমনের পরিমাণ বাড়ে। গ্রামীণ বাংলাদেশের শিশুদের ভাত খাওয়ার পরিমাণ বিবেচনায় গবেষকদের অনুমান, এ ধরনের হাঁড়িতে রান্না করা ভাত খেলে শিশুরা খাবারের মাধ্যমে এফডিএর নির্ধারিত দৈনিক সিসা গ্রহণের নির্দেশক মাত্রার পাঁচ গুণের বেশি সিসার সংস্পর্শে আসতে পারে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান অ্যান্ড প্ল্যানেটারি হেলথ বিভাগের প্রকল্প আনলেডেডের পরিচালক ড. জেনা ফোরসিথ বলেন, হাঁড়ি ও তাতে রান্না করা খাবার—উভয় ক্ষেত্রেই সিসার উপস্থিতি পরিমাপ করেছেন তাঁরা। এর মাধ্যমে দৈনন্দিন রান্নার পাত্র কীভাবে সিসার সংস্পর্শে আসার উৎস হয়ে উঠতে পারে, তা বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।

আইসিডিডিআরবির পরিবেশস্বাস্থ্য ও ওয়াশ বিভাগের সহকারী বিজ্ঞানী ড. জেসমিন সুলতানা বলেন, পরিবারের সদস্যরা যত্ন নিয়ে ভাত ও খিচুড়ি রান্না করলেও হাঁড়ি থেকে খাবারে সিসা মিশে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য নিরাপদ রান্নার পাত্র বেছে নেওয়া জরুরি। এসব হাঁড়ি ব্যবহার করতে হলে স্টিলের তারযুক্ত স্ক্রাবার দিয়ে পরিষ্কার করা এবং অম্লীয় খাবার রান্না করা এড়িয়ে চলতে হবে। তবে এসব সতর্কতা দূষিত হাঁড়িকে পুরোপুরি নিরাপদ করতে পারে না।

ড. জেনা ফোরসিথ আরও বলেন, সিসা দেখা যায় না, এর কোনো গন্ধ বা স্বাদও নেই। ফলে দেখতে ভালো একটি হাঁড়ি থেকেও খাবারে সিসা মিশতে পারে। কোন হাঁড়ি নিরাপদ, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝার উপায় নেই।

গবেষকদের মতে, এ ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু পরিবারের সচেতনতার ওপর নির্ভর করলে হবে না। বাংলাদেশে সিসার সংস্পর্শে আসার একাধিক উৎস রয়েছে। এর মধ্যে হলুদে সিসা মেশানোর বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। রান্নার পাত্রও সিসার সংস্পর্শে আসার আরেকটি উৎস। স্থানীয়ভাবে তৈরি অনেক হাঁড়ি পুরোনো ধাতব সামগ্রী গলিয়ে তৈরি করা হয়। এসব ধাতুতে সিসার উপস্থিতি যাচাই না করায় নতুন হাঁড়িতেও তা থেকে যেতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনকে (বিএসটিআই) রান্নার পাত্রের নিরাপত্তাবিধি পর্যালোচনা, পুরোনো ধাতব সামগ্রী পরীক্ষা এবং তৈরি হাঁড়ি থেকে খাবারে সিসা মেশার মাত্রা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করেছেন গবেষকেরা। পাশাপাশি ক্ষুদ্র উৎপাদকদের নিরাপদ কাঁচামাল ও পরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

আইসিডিডিআরবির পরিবেশস্বাস্থ্য ও ওয়াশ বিভাগের ড. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, রান্নার পাত্র থেকে খাবারে সিসা মিশে যাওয়ার বিষয়ে বিএফএসএকে সুস্পষ্ট নিরাপত্তাবিধি প্রণয়ন করতে হবে। একই সঙ্গে বিএসটিআইকে রান্নার পাত্রে সিসার নিরাপদ মাত্রা নির্ধারণ ও তা কার্যকর করতে হবে। তাঁর মতে, সাশ্রয়ী দামের পাশাপাশি রান্নার পাত্রের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা জরুরি।

গবেষকেরা জানিয়েছেন, গবেষণাটি পরীক্ষাগারভিত্তিক হলেও এর পরিসর ছোট। শিশুদের শরীরে সিসা প্রবেশের পরিমাণ সরাসরি পরীক্ষা করে নির্ণয় করা হয়নি; মডেলের মাধ্যমে অনুমান করা হয়েছে। তাই বিভিন্ন ধরনের রান্নার পাত্র ও দৈনন্দিন রান্নার অভ্যাস নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।