কুড়িগ্রামে খরায় পুড়ছে আমনখেত, দুশ্চিন্তায় কৃষকরা

আমন ধানের থোড় আসার সময় এখন। এ সময়ে মাঠজুড়ে থাকার কথা সবুজ ধানগাছের সমারোহ। কিন্তু কুড়িগ্রামের কয়েকটি উপজেলার চিত্র ভিন্ন। কোথাও ধানগাছের পাতা বিবর্ণ হয়ে আগুনে পোড়া রং ধারণ করেছে, কোথাও শুকিয়ে যাচ্ছে পুরো গাছ। আবার কোনো কোনো জমির একাংশের ধানগাছ মরে যাচ্ছে। এতে আমনের ফলন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকেরা।

জেলার রাজারহাট, উলিপুর ও কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ধানখেতে এমন চিত্র দেখা গেছে। কৃষকদের মতে, জমিতে ধানগাছ ভালো থাকলেও হঠাৎ পাতা শুকিয়ে যেতে শুরু করে। পরে ধীরে ধীরে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক চেষ্টা করেও গাছ রক্ষা করতে পারেননি তারা।

রাজারহাট উপজেলার উমরমজিদ ইউনিয়নের কৃষক নুর আলম বলেন, ‘আমার এক বিঘা জমির ধান প্রায় শেষ হয়ে গেছে। কী কারণে এমন হচ্ছে, বুঝতে পারছি না। অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু ধানগাছ বাঁচাতে পারিনি।

একই এলাকার কৃষক শাহা আলম বলেন, ‘জমিতে ধান ভালোই ছিল। হঠাৎ করে পাতা শুকিয়ে যেতে শুরু করে। এখন মনে হচ্ছে, ফলন অনেক কমে যাবে।

কৃষকদের অভিযোগ, সমস্যার শুরুতে তারা কৃষি বিভাগের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ পাননি। মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত দেখা না পাওয়ায় অনেকেই বুঝতে পারেননি, এমন পরিস্থিতিতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

তাদের মতে, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও সময়মতো কৃষি পরামর্শ পেলে সার প্রয়োগ, সেচসহ পরিচর্যার ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া যেত। এতে ক্ষতির পরিমাণও কমানো সম্ভব হতো।

কৃষকদের একাংশ জানিয়েছেন, তারা সময়মতো সেচ ও সুষম সার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জমির ফসল রক্ষার চেষ্টা করেছেন। আবার অনেক কৃষক আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে কীভাবে পরিচর্যা করবেন, তা বুঝতে পারেননি।

তবে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হওয়া এবং খরার মধ্যে জমিতে অতিরিক্ত ইউরিয়া সার প্রয়োগের কারণে অনেক ক্ষেত্রে ধানগাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি কিছু জমিতে পোকামাকড়ের আক্রমণও রয়েছে।

রাজারহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তুষার আহমেদ বলেন, ‘খরার সময় অনেক কৃষক অতিরিক্ত ইউরিয়া সার ব্যবহার করেছেন। এতে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে পোকামাকড়ের আক্রমণও রয়েছে।

বৃষ্টির ঘাটতি কতটা? 

রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার জানান, গত দুই বছরে মে মাসে তুলনামূলক বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। চলতি বছর মে মাসে বৃষ্টিপাত হয়েছে ৭৮৪ মিলিমিটার। অন্যদিকে জুন ও জুলাই মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিমিটার হলেও এবার হয়েছে মাত্র ২০০ মিলিমিটার।

তিনি বলেন, জুন ও জুলাই মাসে সাধারণত ১৯ থেকে ২০ দিন বৃষ্টি হওয়ার কথা। কিন্তু এবার বৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৯ থেকে ১০ দিন। বৃষ্টির এই ঘাটতি আমন ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও জমির আর্দ্রতার ওপর প্রভাব ফেলেছে।

সুবল চন্দ্র সরকার আরও বলেন, আবহাওয়ার তথ্য নিয়মিত স্থানীয় কৃষি বিভাগকে দেওয়া হয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার কথা, যাতে তারা আবহাওয়ার পরিস্থিতি অনুযায়ী ফসলের পরিচর্যা করতে পারেন।

ক্ষতির হিসাব নেই, দায় কৃষকের?

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর কুড়িগ্রাম জেলায় ১ লাখ ২১ হাজার ৬৩০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। তবে এর মধ্যে কত হেক্টর জমির ধান খরা, অতিরিক্ত সার প্রয়োগ কিংবা পোকামাকড়ের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব দিতে পারেনি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু ফাত্তাহ মো. রওশন কবির বলেন, আক্রান্ত অংশ থেকে স্বাভাবিক ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই ক্ষতিগ্রস্ত গাছ বা অংশ কেটে ফেলে বাকি জমির ফসল রক্ষার চেষ্টা করতে হবে। এ ছাড়া কৃষকদের পাইমেট্রোজিন, নিতেনপাইরাম ও ইমিডাক্লোপ্রিড গ্রুপের অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

ক্ষয়ক্ষতির তথ্য না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রয়েছেন। তারা কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তার মতে, আমনের যে ক্ষতি হয়েছে, তা মূলত কৃষকদের ভুল ব্যবস্থাপনার কারণে। খরার সময় জমিতে সার প্রয়োগ করা উচিত নয়। জমিতে পর্যাপ্ত রস বা আর্দ্রতা থাকলেই সার প্রয়োগ করতে হয়। কিন্তু কিছু কৃষক খরার মধ্যেও সার প্রয়োগ করেছেন।

তবে কৃষকদের অভিযোগ, শুধু সার ব্যবহারের ভুলকে ক্ষতির কারণ হিসেবে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্র উঠে আসে না। তাদের প্রশ্ন, কখন সার প্রয়োগ করতে হবে, কখন সেচ দিতে হবে কিংবা আবহাওয়ার পরিবর্তনে কী ধরনের সতর্কতা নিতে হবে—এসব বিষয়ে সময়মতো মাঠপর্যায়ে পরামর্শ পৌঁছানোর দায়িত্ব কার?

কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও পরিবেশবিদ মির্জা নাসির উদ্দিন জানান, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও দীর্ঘস্থায়ী খরা আমন ধানের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ পরিস্থিতিতে জমির আর্দ্রতা বিবেচনায় সেচ, সুষম সার প্রয়োগ এবং রোগবালাই পর্যবেক্ষণ জরুরি। তবে সব জমির অবস্থা এক রকম নয়। তাই আক্রান্ত জমি সরেজমিনে পরীক্ষা করে সমস্যার কারণ নির্ধারণ এবং সে অনুযায়ী পরামর্শ দেওয়া প্রয়োজন।