সুরা ইউসুফে বর্ণিত শিক্ষা

সুরা ইউসুফে বর্ণিত হজরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবনী নানা শিক্ষা ও উপদেশে পরিপূর্ণ। একবার ইউসুফ (আ.) স্বপ্ন দেখলেন, তিনি তার বাবাকে বলছেন, ‘হে আমার বাবা! আমি স্বপ্নে এগারোটি নক্ষত্র, সূর্য ও চাঁদকে দেখেছি। দেখেছি, তারা সবাই আমাকে সেজদা করছে।’ (সুরা ইউসুফ ৪)

তার বাবা ইয়াকুব (আ.) বুঝতে পারলেন, এই নেয়ামতের কথা প্রকাশ করলে মানুষের অন্তরে হিংসার আগুন জ্বলে উঠতে পারে। এমনকি নিকটতম আত্মীয়ের মনেও হিংসা জন্ম নিতে পারে। তাই তিনি ছেলেকে বললেন, ‘হে আমার বৎস! তোমার স্বপ্নের কথা তোমার ভাইদের কাছে বর্ণনা করো না। তাহলে তারা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে।’ (সুরা ইউসুফ ৫)

এখানে রয়েছে গভীর শিক্ষা। প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার দাবি হলো, কখনো কখনো নিজের নেয়ামত গোপন রাখা, তা প্রকাশ না করা এবং মানুষের সামনে প্রচার না করা।

ইয়াকুব (আ.)-এর আশঙ্কাই সত্য হলো। ইউসুফের প্রতি তার ভাইদের অন্তরে হিংসার আগুন জ্বলে উঠল। তারা বলল, ‘তোমরা ইউসুফকে হত্যা করো অথবা তাকে কোনো দূরবর্তী স্থানে ফেলে দাও। তাহলে তোমাদের পিতার মনোযোগ শুধু তোমাদের দিকেই থাকবে।’ (সুরা ইউসুফ ৯)

ভাইয়েরা ইউসুফকে ধরে নিয়ে যায় এবং অন্ধকার কূপের গভীরে ফেলে দেয়। এরপর সন্ধ্যার সময় তারা কাঁদতে কাঁদতে বাবার কাছে ফিরে যায়।

ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা তার জামায় মিছেমিছি রক্ত মাখিয়ে নিয়ে এসেছিল। পিতা বলল, না, বরং তোমাদের প্রবৃত্তি তোমাদের একটা কাহিনি বানাতে উদ্বুদ্ধ করেছে। ঠিক আছে, আমি পুরোপুরি ধৈর্য ধারণ করব, তোমরা যা বানিয়েছ সে ব্যাপারে আল্লাহই আমার আশ্রয়স্থল।’ (সুরা ইউসুফ ১৮) এখানে বিচক্ষণ মানুষের জন্য শিক্ষা হলো, কথার চাকচিক্যে প্রতারিত হওয়া যাবে না। কান্নার অভিনয় করলেই কেউ নির্যাতিত হয়ে যায় না। আবার কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই সে অপরাধী হয়ে যায় না।

ইউসুফ কূপ থেকে বের হয়ে বাদশাহর ঘরে পৌঁছলেন। তকদিরের এক অপূর্ব দিক হলো, মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারে না, তার মুক্তির পথ কোথা থেকে তৈরি হবে। কত বিষয়কে মানুষ প্রথমে বিপদ মনে করে, অথচ কিছুদিন পর দেখা যায়, এর আড়ালেই তার জন্য বড় কল্যাণ অপেক্ষা করছিল।

ইউসুফের জীবনে কঠিন পরীক্ষার পালা এলো। প্রকৃতপক্ষে মানুষের গোটা জীবনই নানা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যে মহিলার ঘরে সে ছিল, সে তাকে কুপ্ররোচনা দিল এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিল।’ (সুরা ইউসুফ ২৩)

আল্লাহ ইউসুফ (আ.)-কে হেফাজত করলেন। তিনি প্রলোভনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললেন, নিজের প্রবৃত্তির সঙ্গে সংগ্রাম করলেন। আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহের কথা স্মরণ করে বললেন, ‘আল্লাহর আশ্রয় চাই! নিশ্চয়ই তিনি আমার মনিব। তিনি আমার থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন।’ (সুরা ইউসুফ ২৩)

ইউসুফ (আ.) দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে গেলেন। নিজেকে রক্ষার জন্য পাপের স্থান ত্যাগ করলেন এবং ফেতনার পরিবেশ থেকে দূরে সরে গেলেন।

একজন মুমিনের জীবনেও এমনটি হওয়া উচিত। সে ফেতনার পথ থেকে দূরে থাকবে। এর মাধ্যমে সে নিজের দ্বীন, জীবন, বিবেক, সম্পদ ও সম্মান রক্ষা করতে পারবে।

 

৩০ অক্টোবর শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন আইনাল হক