ছাত্রশিবিরের নতুন বছরের প্রকাশনায় ইতিহাস ও ভূ-রাজনীতি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় নতুন বছরের প্রকাশনা নিয়ে হাজির হয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। ২০২৭ সালের নববর্ষ উপলক্ষে প্রকাশিত ক্যালেন্ডার ও ডায়েরিতে এবার গুরুত্ব পেয়েছে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, সীমান্ত, নদী, বঙ্গোপসাগর, জাতীয় পরিচয়, প্রযুক্তি ও জ্বালানির মতো বিষয়। পাশাপাশি মুসলিম সালতানাতের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যও স্থান পেয়েছে প্রকাশনায়। শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টায় মোড়ক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সংগঠনটির নববর্ষের প্রকাশনা উৎসব। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ভিড় দেখা যায়।

এবারের প্রকাশনার মূল ভাবনা বাংলাদেশের সমৃদ্ধি এবং মুসলিম সালতানাতের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। উৎসবে তিন পাতার ক্যালেন্ডার, এক পাতার বড় ও ছোট ক্যালেন্ডার, ডেস্ক ক্যালেন্ডার, ইয়ার প্ল্যানার, বাংলা ও ইংরেজি ডায়েরিসহ বিভিন্ন প্রকাশনা সাজানো হয়। সংগঠনটির আগের বছরগুলোর প্রকাশনাও রাখা হয় স্টলে। অনেকে নিজের জন্য প্রকাশনা কিনেছেন, কেউ উপহার দিয়েছেন প্রিয়জনকে। পরিবার নিয়েও এসেছিলেন অনেকে।

ক্যালেন্ডারে ছয় বিষয়ে ভূ-রাজনীতি

উৎসবের আলোচনার কেন্দ্রে ছিল তিন পাতার ক্যালেন্ডার। এতে ছয়টি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো—বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ও কৌশলগত সম্ভাবনা, সীমান্ত নিরাপত্তা ও কাঁটাতারের বেড়া, নদীর পানির হিস্যা ও নদীর জীবন, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব ও নীল অর্থনীতি, মুসলিম পরিচয়ের শেকড় এবং প্রযুক্তি ও জ্বালানির ভূ-রাজনীতি।

সীমান্তবিষয়ক পাতায় সীমান্তে মৃত্যুর ঘটনা ও মিয়ানমার সীমান্তের জটিলতা তুলে ধরা হয়েছে। নদীবিষয়ক অংশে পানির ন্যায্য হিস্যার পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও অস্তিত্ব রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। বঙ্গোপসাগর নিয়ে রয়েছে সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তি, নীল অর্থনীতি ও কৌশলগত গুরুত্বের আলোচনা। পরিচয়বিষয়ক অংশে মুসলিম পরিচয়ের শেকড়, ১৯৭১ ও মুসলিম পরিচয়ের বিপর্যয় এবং আধিপত্যবাদ মোকাবিলায় আত্মপরিচয়ের প্রসঙ্গ এসেছে। প্রযুক্তি ও জ্বালানিবিষয়ক পাতায় ডেটা সার্বভৌমত্ব, যোগাযোগক্ষমতা, জ্বালানি সংযোগ এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর বাজারের নতুন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়েছে।

ডায়েরির প্রচ্ছদে আতিয়া মসজিদ

প্রকাশনাগুলোর মধ্যে বাংলা ডায়েরির প্রচ্ছদেও রয়েছে ইতিহাসের ছাপ। টাঙ্গাইলের মুঘল আমলের স্থাপত্য নিদর্শন আতিয়া মসজিদের টেরাকোটা অলংকরণ থেকে নেওয়া হয়েছে এর নকশা। মসজিদের উল্লম্ব প্যানেলের বৃত্তাকার ও আন্তঃসংযুক্ত মোটিফ সরলীকরণ করে প্রচ্ছদের দুই পাশে ব্যবহার করা হয়েছে। মাঝখানে ফুল, গম্বুজাকৃতির খিলান ও উদ্ভিদভিত্তিক মোটিফ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে কেন্দ্রীয় নকশা। ইংরেজি ডায়েরিতেও তুলে ধরা হয়েছে মুসলিম স্থাপত্য ও ঐতিহ্য।

ডায়েরিগুলোতে শুধু তারিখ ও নোট লেখার জায়গা নয়, রাখা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের তথ্যও। বাংলা ডায়েরিতে ব্যক্তিগত তথ্যের ছক, সম্ভাব্য সরকারি ছুটির তালিকা, বাংলাদেশ সচিবালয় ও জেলা প্রশাসকদের ফোন নম্বর, সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য, মাসনুন দোয়া এবং বিশ্ব মানচিত্র রয়েছে। প্রতিটি পৃষ্ঠায় সংশ্লিষ্ট তারিখে বিশ্ব ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং ইসলামী ও সমকালীন সাহিত্যর সংক্ষিপ্ত পরিচিতিও দেওয়া হয়েছে। রয়েছে ছাত্রশিবিরের শহীদদের তালিকা।

ইংরেজি ডায়েরিতে আন্তর্জাতিক ডায়ালিং কোড, ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ফোন নম্বর, নামাজ-রোজার দিনপঞ্জি ও মনীষীদের উক্তি যুক্ত করা হয়েছে। মাঝারি ও পকেট ডায়েরিতে বাংলাদেশের মানচিত্র ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, উপহার ছক এবং ব্যক্তিগত তথ্যের ছক রয়েছে। ইয়ার প্ল্যানারে প্রতি মাসের শুরুতে কোরআনের আয়াত বা হাদিস, মাসিক পরিকল্পনা এবং তারিখভিত্তিক দৈনিক পরিকল্পনার ছক রাখা হয়েছে।

এক পাতার বড় ক্যালেন্ডারে বাংলা, ইংরেজি ও আরবি তারিখের পাশাপাশি ২০২৭ সালের সম্ভাব্য সরকারি ছুটির তালিকা রয়েছে। ছোট ক্যালেন্ডারে সূরা ইব্রাহিমের ৭ নম্বর আয়াতের ক্যালিগ্রাফি করা হয়েছে। আর ডেস্ক ক্যালেন্ডারে কুবা, কিবলাতাইন, উমাইয়া, কর্ডোভা, আয়া সোফিয়াসহ বিশ্বের ১২টি ঐতিহাসিক মসজিদের ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতি স্থান পেয়েছে।

প্রকাশনা নিয়ে যা বললেন নেতারা

মোড়ক উন্মোচনের পর ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ ও ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েমসহ নেতারা স্টল ঘুরে দেখেন। এ সময় সংগঠনের নেতা-কর্মীদের একে অপরকে নতুন বছরের প্রকাশনা উপহার দিতেও দেখা যায়।

কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক আমিরুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম বলেন, প্রকাশনাগুলো দীর্ঘ গবেষণা ও চিন্তার ফসল। তরুণ প্রজন্মের নৈতিক অবক্ষয়, মাদকাসক্তি ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের নৈতিক ও আদর্শিকভাবে গড়ে তোলা জরুরি। সে লক্ষ্যেই প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রতিবছর গবেষণালব্ধ প্রকাশনা, সাময়িকী, বিজ্ঞান সাময়িকী ও ধর্মীয় বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রকাশনাগুলো কেবল উপহারসামগ্রী বা বিনোদনের উপকরণ নয়।’ ইতিহাস, ঐতিহ্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও নৈতিকতার বার্তা ছাত্রসমাজ, পরিবার, অভিভাবক ও সুধীমহলের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এর লক্ষ্য।

সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ বলেন, ছাত্রশিবিরের পথচলাকে বারবার থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। তবে সংগঠনটি কাউকে ভয় দেখিয়ে নিজেদের আদর্শে আনতে চায়নি; বরং সৃজনশীলতা, সৌন্দর্য ও উৎকর্ষ দিয়ে শিক্ষার্থীদের মন জয় করার চেষ্টা করেছে। তাঁর ভাষ্য, বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন দেশকে আধিপত্যবাদী শক্তির কাছে নতজানু করে রেখেছিল। সেই বাস্তবতা থেকেই ক্যালেন্ডারে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস-ঐতিহ্য, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম বলেন, একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্ল মার্ক্স, লেনিন কিংবা বস্তুবাদী দর্শন নিয়ে অবাধে কথা বলা গেলেও আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-কে নিয়ে কথা বলার সুযোগ ছিল না। কোরআনের আসর করার কারণে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন ও শোকজের মুখোমুখি হতে হতো। এখন তাঁদের উত্তরসূরিরাই এই বটতলায় প্রকাশ্যে উৎসব করছেন। তাঁর দাবি, ছাত্রশিবির চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দখলদারত্বের বদলে সৃজনশীলতা ও জাতি গঠনের রাজনীতি করছে।

কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ বলেন, বিগত ১৬ বছরে ছাত্রশিবিরের গঠনমূলক কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সংগঠনটি ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে সভ্যতা বিনির্মাণে কাজ করছে। এ পথে অবিচল থাকতে গিয়ে সংগঠনের তিন শতাধিক সদস্য শহীদ হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় বায়তুলমাল সম্পাদক আনিসুর রহমান, কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক হাফেজ ইউসুফ ইসলাহী, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক মো. ফখরুল ইসলাম, প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ, সমাজসেবা সম্পাদক ও রাকসুর ভিপি মো. মোস্তাকুর রহমান জাহিদ, এইচআরডি সম্পাদক হেলাল উদ্দিন রুবেল, আইন সম্পাদক শামীম উদ্দীন, স্পোর্টস সম্পাদক মুশফিকুর রহমান এবং ছাত্র অধিকার সম্পাদক ও জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলামসহ কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন শাখার নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠান শেষে প্রকাশনাগুলো ছাত্রসমাজ ও সুধীমহলের কাছে পৌঁছে দিতে সংগঠনের সব স্তরের নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান নূরুল ইসলাম।