চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠিত মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির নজিরবিহীন ভরাডুবি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ওয়াশিংটনে রাজনৈতিকভাবে কিছুটা দুর্বল করে দিয়েছে। এখন থেকে ট্রাম্পের নীতি ও এজেন্ডাগুলো আইনসভার কঠোর নজরদারি এবং পর্যালোচনার মুখে পড়বে। তবে দেশের ভেতরে ধাক্কা খেলেও পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ট্রাম্প হয়তো নিজের অবস্থান থেকে একচুলও নড়বেন না। খবর রয়টার্স।
ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে চাইছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, ট্রাম্প তাঁর মেয়াদের শেষ দুই বছরে ইরান, ইসরায়েল, ইউক্রেন এবং চীন ইস্যুতে নিজের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে একক ক্ষমতার বড় সুবিধাটি ভোগ করবেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মূল প্রশ্ন হলো—ট্রাম্প কি দলের এই ভরাডুবি থেকে শিক্ষা নিয়ে সুর নরম করবেন, নাকি বিশ্বমঞ্চে বন্ধু ও শত্রু দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নিজের শক্ত অবস্থান আরও জোরালো করবেন?
ইরান সংকট ও অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ
সবচেয়ে জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘায়িত যুদ্ধ। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন যে, গত মঙ্গলবারের নির্বাচনে তাঁর দলের উভয় কক্ষে হারের পেছনে এই যুদ্ধের বড় ভূমিকা ছিল। তবে তিনি সাফ জানিয়েছেন, ইসলামিক রিপাবলিক ইরানের ওপর হামলার সিদ্ধান্তে তাঁর কোনো অনুশোচনা নেই। তাঁর দাবি, তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে এই আক্রমণ জরুরি ছিল (যদিও ইরান সবসময়ই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে)।
আট মাস ধরে চলা এই যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম বেড়েছে আকাশচুম্বী এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে, যা নির্বাচনে ভোটারদের ক্ষোভের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের যুদ্ধসংক্রান্ত ক্ষমতা ট্রাম্পের হাতে সমর্পণ করেছে। এর ফলে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একচ্ছত্র প্রভাব খাটাচ্ছেন—কেবল ইরান ইস্যুতে নয়, বরং রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ প্রতিরোধ না করা, নতুন শুল্ক আরোপ, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে গ্রেপ্তার এবং ল্যাটিন আমেরিকা উপকূলে প্রাণঘাতী হামলা চালানোর ক্ষেত্রেও ট্রাম্প নিজের মতো কাজ করেছেন।
সিনেটের ডেমোক্রেটিক দলনেতা চাক শুমার বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, জনগণের দেওয়া এই রায় ট্রাম্পের "অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিশৃঙ্খলা" প্রতিরোধ করা এবং ইরান যুদ্ধ বন্ধ করারই বার্তা দেয়।
তবে মুখে বলা সহজ হলেও বাস্তবে তা করা বেশ কঠিন। কারণ মার্কিন সংবিধানে একজন প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে বিপুল ক্ষমতা দেওয়া রয়েছে। ওয়াশিংটনের আটলান্টিক কাউন্সিলের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির সিনিয়র ডিরেক্টর উইলিয়াম ওয়েচসলার বলেন, ‘ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ আইনি এজেন্ডা থমকে দিতে পারে, কিন্তু একজন কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে তাঁর ক্ষমতা প্রয়োগে বাধা দেওয়ার মতো সুযোগ তাদের খুব একটা নেই।’
ডেমোক্র্যাটদের হাতে মূল হাতিয়ার হতে পারে বিভিন্ন তদন্ত, ট্রাম্পের মনোনীত কর্মকর্তাদের নিয়োগ শুনানিতে বাধা দেওয়া এবং বৈদেশিক তহবিলের ওপর কড়াকড়ি আরোপ। কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এসবের মাধ্যমে ট্রাম্পকে আটকে রাখার সুযোগ তাদের খুবই সীমিত।
অন্যদিকে, নির্বাচনের প্রভাব নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলেছেন, "প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আন্তর্জাতিক মঞ্চে মার্কিন শক্তি সফলভাবে পুনপ্রতিষ্ঠা করেছেন। দেশকে সবার আগে রাখা এবং আমেরিকান পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে তিনি সবার সঙ্গেই কাজ চালিয়ে যাবেন। তাঁর পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্তগুলো কখনোই রাজনৈতিক স্বার্থে নেওয়া হয়নি।"
‘লেম-ডাক’ ট্রাম্প এবং বিশ্ব রাজনীতি
যেসব প্রেসিডেন্ট পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পান না এবং নিজ দেশে প্রভাব হারাতে থাকেন, তাঁরা শেষ মেয়াদে ('লেম-ডাক' বা কার্যকাল শেষ হওয়ার আগের সময়ে) বৈশ্বিক বিষয়ের দিকেই বেশি মনোযোগ দেন। ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের একাংশ সতর্ক করে বলছেন, ট্রাম্পের বেপরোয়া আচরণের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে চরম অস্থিরতা তৈরি হতে পারে কিংবা অন্য কোথাও নতুন করে সংঘাতের দাবানল জ্বলতে পারে। বিশেষ করে কমিউনিস্ট শাসিত কিউবার দিকে আঙুল তুলছেন তাঁরা, যে দেশটির ওপর ট্রাম্প ইতোমধ্যেই তেল অবরোধ জারি করেছেন এবং বারবার হুমকির মুখে রেখেছেন।
জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটির পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক লরা ব্লুমেনফেল্ড বলেন, ট্রাম্প যদি কোণঠাসা বোধ করেন, তবে তিনি বিশ্বমঞ্চে এককভাবে সামরিক শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নিতে পারেন।
ইরানের ব্যাপারে ট্রাম্পের সামনে এখন তিনটি পথ রয়েছে—নতুন করে বিমান হামলা চালানো, আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত থেকে বের হওয়া, অথবা বর্তমান পরিস্থিতি বজায় রাখা। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম চড়া এবং পারস্য উপসাগরীয় প্রতিবেশীরা চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে।
ইরানি নেতারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই রাজনৈতিক পরাজয়কে উদযাপন করলেও ওয়াশিংটনের সূত্রগুলো বলছে, ট্রাম্প এখনও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কারণ রাজনৈতিকভাবে এখন তাঁর নতুন করে হারানোর কিছু নেই।
তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির ইরান বিশেষজ্ঞ সিনা টুসি বলেন, "পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করলে তা জয়ের কোনো স্পষ্ট পথ দেখাবে না; বরং অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়ে তুলবে, যা ভোটারদের রিপাবলিকানদের ওপর ক্ষিপ্ত করার মূল কারণ ছিল।"
আবার বড় কোনো সামরিক অভিযানে জড়িয়ে পড়লে ট্রাম্পের নিজস্ব 'মাগা' সমর্থক গোষ্ঠীর মধ্যেই চরম অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। কারণ তাঁদের একটি বড় অংশ ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনকালীন প্রতিশ্রুতি—"বিদেশি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়ানো হবে না"—ভঙ্গ করার কারণে এমনিতেই ক্ষুব্ধ।
এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও বুধবার ট্রাম্পের ইরান নীতি থেকে দূরত্ব বজায় রেখে কথা বলেছেন। তিনি এই সংঘাতের খরচ এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবির জন্য এই নীতিকেই দায়ী করেন।
ইউক্রেন ও ইসরায়েল নীতিতে ডেমোক্র্যাটদের নজর
আগামী জানুয়ারিতে কংগ্রেসের দায়িত্ব নেওয়ার পর ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে ইউক্রেনকে পুনরায় সহায়তা দেওয়া। সাড়ে চার বছর ধরে চলতে থাকা রাশিয়ার আক্রমণ মোকাবিলায় ট্রাম্প সরাসরি সহায়তা বন্ধ করে দিলেও ডেমোক্র্যাটরা আরও কিছু রিপাবলিকানকে সঙ্গে নিয়ে ট্রাম্পের ভেটো (খর্ব করার ক্ষমতা) এড়িয়ে নতুন সহায়তা তহবিল পাসের চেষ্টা করবেন।
সম্প্রতি রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কারণে ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা হয়েছে। এমনকি নিজ দলের অনেক রিপাবলিকানও মনে করছেন, ট্রাম্প ক্রমাগত মস্কোর দিকেই ঝুঁকছেন।
একই সময়ে ডেমোক্র্যাটরা ইউরোপীয় মিত্র এবং কানাডার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করবেন। তবে শুল্ক ও চাপ প্রয়োগের নীতির ফলে সৃষ্ট ফাটল কেবল আইনপ্রণেতাদের চেষ্টায় কতটা মেটানো সম্ভব, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের সংশয় রয়েছে।
অন্যদিকে, নতুন কংগ্রেসে ইসরায়েল হয়তো আগের মতো নিরঙ্কুশ সমর্থন পাবে না। এমনকি কিছু রিপাবলিকান নেতাও ইসরায়েলকে চোখ বন্ধ করে সমর্থন করার চিরাচরিত প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
নির্বাচনে বিজয়ী অনেক ডেমোক্র্যাট প্রার্থীই প্রগতিশীল ধারার, যাঁরা প্রচারের সময় ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়া এবং ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তাঁরা প্রতি বছর কোটি কোটি ডলারের বার্ষিক সহায়তা বন্ধ করার পক্ষে লড়াই করবেন। ট্রাম্প নিজেও নির্বাচনের দিন ঘোষণা করেছেন যে এই বছরের শেষের দিকে সেই সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হবে—যদিও তাঁর এমন একক আইনি অধিকার আছে কি না তা স্পষ্ট নয়।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা এবং দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ইতোমধ্যেই দুই দলের ঐকমত্যে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে।
তবে এত কিছুর পরও, ট্রাম্পের ‘ভিটো’ দেওয়ার ক্ষমতার কারণে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে রাতারাতি বড় নীতিগত পরিবর্তন আনা বেশ কঠিন হবে।
দিনশেষে, বেশির ভাগ বিশ্লেষকই মনে করছেন ট্রাম্প তাঁর শেষ মেয়াদে ইতিহাসের পাতায় নিজের যে পরিচয় বা ‘লেগাসি’ রেখে যেতে চান, তার ওপর নির্ভর করেই এই পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে। আর সেই লেগাসির পুরোটাই দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বজুড়ে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের ওপর।
সংস্থাসংশ্লিষ্ট থিঙ্কট্যাঙ্ক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ সদস্য রস হ্যারিসন এক ওয়েবকাস্টে বলেন, ‘বিশ্বমঞ্চে নিজের একটি বড় ছাপ রেখে যাওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প ভীষণ আগ্রহী—তা সেই ছাপ ইতিবাচক হোক বা না হোক।’