কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে এআই খাতে নতুন আইন আনছে ডেমোক্র্যাটরা

আগামী জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ডেটা সেন্টার উন্নয়নকে কেন্দ্র করে একগুচ্ছ নতুন আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা করছে ডেমোক্র্যাটরা। আইনপ্রণেতা, কংগ্রেসের সহকারী এবং এআই নীতিনির্ধারণে কাজ করা বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিরা এ তথ্য জানিয়েছেন। খবর রয়টার্স।

এ পরিকল্পনা রিপাবলিকান নেতৃত্বাধীন বর্তমান কংগ্রেসের অবস্থান থেকে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বর্তমান কংগ্রেসে আইনপ্রণেতারা মূলত এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রযুক্তিটির কিছু দিক নিয়ন্ত্রণে বিধিনিষেধ আরোপের আইন পাসের উদ্যোগও নেননি তাঁরা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণ এবং এগুলোর বিপুল বিদ্যুৎ চাহিদা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বেড়েছে।

ডেমোক্র্যাটদের পরিকল্পনায় রয়েছে, ডেটা সেন্টারের কারণে বিদ্যুতের বাড়তি ব্যয়ের চাপ থেকে ভোক্তাদের সুরক্ষা দিতে আইন প্রণয়ন, উন্নত এআই ব্যবস্থার স্বাধীন নিরাপত্তা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং এআই প্রযুক্তির কারণে ক্ষতি হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো কখন দায়ী হবে, তা স্পষ্ট করা।

তবে হোয়াইট হাউসে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এসব আইন পাস করা কঠিন হতে পারে। কারণ, এআই প্রযুক্তির জন্য বাধ্যতামূলক নিয়মকানুন প্রণয়নের আহ্বান বারবার নাকচ করেছেন তিনি।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ট্রাম্প বলেছেন, যেসব অঙ্গরাজ্য এআই প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে ‘ধনী হতে চায়’, তাদের সঙ্গে কাজ করবেন তিনি। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা ও তাঁদের বাইরের সমর্থকেরা মনে করছেন, কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ফলে এআই নিয়ে নিজেদের প্রস্তাব সামনে আনার সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা এবং এআই ব্যবস্থার কারণে বাস্তবে কোনো ক্ষতি হলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের পক্ষে জনসমর্থন তৈরিও সম্ভব হবে।

টেক্সাসের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি এবং কংগ্রেসনাল প্রগ্রেসিভ ককাসের চেয়ারম্যান গ্রেগ কাসার ইতিমধ্যে এ সপ্তাহে বলেছেন, এআই প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের শপথ নিয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তলব করা উচিত।

এআই প্রযুক্তির উন্নয়নে কেন্দ্রীয় সরকারের বিধিনিষেধ আরোপ শিল্পটির মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, নতুন মডেল বাজারে আনার গতি কমে যেতে পারে। আবার মানুষের ক্ষতির আশঙ্কা দূর করতে কোম্পানিগুলোকে তাদের এআই সরঞ্জামের কার্যপদ্ধতিও পরিবর্তন করতে হতে পারে।

এদিকে নতুন কংগ্রেস এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করতে পারে—এমন আশঙ্কা এবং এআই অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে পর্যাপ্ত মুনাফা না আসার উদ্বেগে বৃহস্পতিবার প্রযুক্তি খাতের শেয়ারবাজারে বড় দরপতন হয়েছে।

এর প্রভাব শুক্রবার ইউরোপ ও এশিয়ার শেয়ারবাজারেও দেখা গেছে। আগের দিনের বড় দরপতনের পর এসব অঞ্চলে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারের দাম আরও কমেছে। তবে শুক্রবার দিনের পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাক সূচকে সামান্য ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে ওয়াল স্ট্রিটের ফিউচার বাজার।

একাধিক বিল আনার প্রস্তুতি

নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট সিনেটর চাক শুমার আগামীতে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে বিদ্যুতের বাড়তি খরচ থেকে ভোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়া আগামী বছরের অগ্রাধিকারগুলোর একটি হবে।

ম্যাসাচুসেটসের প্রতিনিধি লরি ট্রাহানও এআই নীতিমালা নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ। তাঁর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ফ্রান্সিস গ্রুবার জানিয়েছেন, এআইয়ের শীর্ষস্থানীয় মডেলগুলো নিরাপত্তার মানদণ্ড পূরণ করছে কি না, তা স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে মূল্যায়ন করানোর জন্য আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেবেন ট্রাহান।

এ ছাড়া এআই ব্যবস্থার কারণে ক্ষতিকর কোনো ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে দায়বদ্ধ করার বিষয়টি স্পষ্ট করতেও আইন আনার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জো লোফগ্রেন প্রতিনিধি পরিষদের বিজ্ঞান কমিটির চেয়ারম্যান হওয়ার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেছেন, উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি এআইয়ের জন্য ‘দায়িত্বশীল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা’ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেবে ডেমোক্র্যাটরা।

মিশিগানের ডেমোক্র্যাট আবদুল এল-সায়েদ মঙ্গলবার সিনেট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি এআই নিয়ন্ত্রণে একটি স্বাধীন সংস্থা গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, এ সংস্থার প্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকবে।

এআই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের উদ্বেগও বাড়ছে। রয়টার্সের অক্টোবরে প্রকাশিত এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিন ভোটার মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন ও কংগ্রেস এআইয়ের ঝুঁকিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। একই সঙ্গে তাঁরা এ প্রযুক্তির জন্য নতুন সরকারি বিধিনিষেধ চান।

রেমন্ড জেমসের নীতিবিষয়ক গবেষণা বিভাগের ব্যবস্থাপক এড মিলস মনে করেন, এআই নিয়ে বড় ধরনের কোনো সংকট তৈরি হলে প্রেসিডেন্টের বিরোধিতা সত্ত্বেও নিয়ন্ত্রণমূলক আইন প্রণয়নের পক্ষে যথেষ্ট সমর্থন তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘আইন পাস হওয়ার সম্ভাবনা মানুষ যতটা ধারণা করছে, তার চেয়ে অনেক বেশি।’

কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ আইনপ্রণেতার সমর্থন পেলে প্রেসিডেন্টের ভেটোও অগ্রাহ্য করা সম্ভব। এ ছাড়া প্রতি বছর কংগ্রেসে পাস করতে হয় এমন নিয়মিত বিলের মধ্যেও এআই নিয়ন্ত্রণের বিধান যুক্ত করার চেষ্টা করতে পারে ডেমোক্র্যাটরা বলে জানিয়েছেন মিলস।

নতুন ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এআই শিল্পের সবচেয়ে প্রভাবশালী কোম্পানিগুলোর ওপর নজরদারি ও জবাবদিহি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে দলটির। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক।

গত অক্টোবরে লোফগ্রেন এবং প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট কমিটির অন্য নেতারা ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক, মেটা, অ্যালফাবেটের গুগল এবং স্পেসএক্সের কাছে তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চেয়েছিলেন।

একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর তৈরি এআই সরঞ্জাম কখনো এমন কোনো কাজ করেছে কি না, যা এর নির্মাতারা করার নির্দেশ দেননি, সেসব ঘটনার তথ্যও জানাতে বলা হয়েছিল।