দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের প্রাণকেন্দ্র দিয়ে বয়ে যাওয়া হান নদী যেমন শহরের অন্যতম আকর্ষণ, তেমনি এটি বহু মানুষের আত্মহত্যার চেষ্টার স্থান হিসেবেও পরিচিত। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালু করে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে নগর কর্তৃপক্ষ।
হান নদীর ওপর নির্মিত সেতুগুলোতে স্থাপিত এআইচালিত ক্যামেরা সন্দেহজনক আচরণ শনাক্ত করেই দ্রুত সতর্কবার্তা পাঠায় জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর কাছে। কেউ দীর্ঘ সময় সেতুর নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে থাকলে, নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করলে বা আত্মহত্যা প্রতিরোধে স্থাপিত বিশেষ টেলিফোন ব্যবহার করলে সঙ্গে সঙ্গেই অ্যালার্ম বেজে ওঠে।
হানগাং ব্রিজ সিসিটিভি ইন্টিগ্রেটেড কন্ট্রোল সেন্টারের প্রধান কিম জুন-ইয়ং জানান, এই প্রযুক্তি চালুর ফলে হান নদীতে আত্মহত্যার চেষ্টা থেকে মানুষকে উদ্ধারের হার ২০১২ সালের ৫৬ শতাংশ থেকে বেড়ে বর্তমানে ৯৯ শতাংশেরও বেশি হয়েছে।
তিনি বলেন, 'জরুরি উদ্ধারকারী দল অধিকাংশ সেতুতে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছাতে পারে। এই কয়েক মিনিটই একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।'
তিনি জানান, প্রায় ৩০ মিটার উচ্চতা থেকে নদীতে ঝাঁপ দিলে পানিতে আঘাতের তীব্রতা ঘণ্টায় প্রায় ৬০ কিলোমিটার গতিতে চলন্ত গাড়ির দুর্ঘটনার সমান হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে আসা ব্যক্তিদের বোঝানো কঠিন হয়। কেউ কেউ উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করেন, আবার কেউ দ্রুত দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এমনও ঘটনা ঘটে, উদ্ধারকারী দলের সাইরেনের শব্দ শোনামাত্র শেষ মুহূর্তে নদীতে ঝাঁপ দেন কেউ কেউ।
গত বছর ১৭টি সেতুতে স্থাপিত প্রায় ৯০০টি ক্যামেরা ১ হাজার ২০০টির বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ঘটনা শনাক্ত করে। তবে সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও প্রায় আটজনকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি বলে জানান কিম।
আত্মহত্যার উচ্চ হার নিয়ে উদ্বেগ
২০২১ সালে এআইভিত্তিক এই নজরদারি ব্যবস্থা চালু হলেও দক্ষিণ কোরিয়ায় আত্মহত্যার সামগ্রিক হার এখনও উদ্বেগজনক। দেশটির প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং এ পরিস্থিতিকে 'বিশ্বের সামনে এক লজ্জাজনক বাস্তবতা' বলে উল্লেখ করেছেন।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটিতে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে আত্মহত্যায় মৃত্যুর হার ২৯ জনের বেশি, যা ২০১১ সালের পর সর্বোচ্চ। এছাড়া ১০ থেকে ৪৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর প্রধান কারণ এখন আত্মহত্যা।
সিউল সেন্ট মেরিস হাসপাতালের আত্মহত্যা প্রতিরোধ বিভাগের পরিচালক ইউ জে-হিউন বলেন, তীব্র শিক্ষাগত প্রতিযোগিতা, অতিরিক্ত কর্মচাপ এবং ব্যর্থতার জন্য ব্যক্তিকেই দায়ী করার সামাজিক সংস্কৃতি অনেক মানুষকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়।
তিনি বলেন, আত্মহত্যার চেষ্টা করা অনেকেই মনে করেন, তারা পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে গেছেন এবং তাদের না থাকলেই আশপাশের মানুষের জীবন ভালো হবে।
বিশেষ করে বিশের কোটার তরুণ-তরুণীরাই আত্মহত্যার চেষ্টার পর জরুরি বিভাগে সবচেয়ে বেশি চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানান তিনি।
ফিরে পাওয়া জীবনের গল্প
৩৩ বছর বয়সী কার্টুনিস্ট ‘স্মাইলিং স্টোন’ হোয়াংও একসময় আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। তবে উদ্ধারকর্মীদের দ্রুত তৎপরতায় তিনি বেঁচে যান।
২০১৪ সালে আত্মহত্যায় বাবাকে হারানোর পর বাবার ঋণের বোঝা তার কাঁধে এসে পড়ে। দীর্ঘদিন মামলা, সম্পত্তি জব্দ এবং নিজের নামে ব্যাংক হিসাব খুলতে না পারার মতো নানা সংকটে পড়েন তিনি। জীবিকা নির্বাহের জন্য একসঙ্গে একাধিক অস্থায়ী কাজ করতে হয়েছে তাকে।
হোয়াং বলেন, 'একসময় আত্মহত্যা আমার কাছে কোনো মর্মান্তিক সিদ্ধান্ত মনে হয়নি। বরং সেটিই সবচেয়ে যৌক্তিক পথ বলে মনে হয়েছিল।'
তিনি জানান, পরে নিজের মতো করে গ্রহণযোগ্যতা ও মানসিক সমর্থন পাওয়াই তাকে নতুনভাবে বাঁচতে শিখিয়েছে।
প্রযুক্তি সহায়ক, বিকল্প নয়
শুধু দক্ষিণ কোরিয়াই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জননিরাপত্তায় এআইনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ছে। জাপানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাসিলা এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা অস্বাভাবিক আচরণ, হঠাৎ পড়ে যাওয়া কিংবা উঁচু স্থান থেকে ঝাঁপ দেওয়ার প্রস্তুতির মতো পরিস্থিতি শনাক্ত করতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পণ্য কর্মকর্তা ইউকা সুজুকি বলেন, এই প্রযুক্তি ইতোমধ্যে কয়েকটি ক্ষেত্রে সম্ভাব্য আত্মহত্যার চেষ্টা আগেভাগে শনাক্ত করে নিরাপত্তাকর্মীদের সতর্ক করেছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বোঝানোর সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে তার মতে, এআই কখনোই মানুষের বিকল্প নয়। আত্মহত্যার হার কমাতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সহায়তা জোরদারের বিকল্প নেই। তারপরও, যদি এই প্রযুক্তির মাধ্যমে একজন মানুষের জীবনও রক্ষা করা যায়, সেটিই বড় অর্জন।
হোয়াং তার আত্মজীবনীমূলক গ্রাফিক স্মৃতিকথা ‘আই অ্যাম আ সুইসাইড লস সারভাইভার’-এ লিখেছেন, বাবার মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন তিনি প্রতিদিন সেই ক্যাফেতে এক কাপ কফি রেখে আসতেন, যেখানে শেষবার বাবার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।
তিনি বলেন, 'এক কাপ কফি, যা তিনি আর কোনো দিন পান করতে পারবেন না; আর এক কাপ কফি, যা আমি আর কোনো দিন তার জন্য বানাতে পারব না।'
সূত্র: ফ্রান্স ২৪
