বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন মোড়

পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বর ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম এক সংকটময় দিন।  ওই দিন তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান ও মহান স্বাধীনতার ঘোষক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের বাসভবনে গৃহবন্দি করা হয়। এই বন্দি অবস্থা থেকে মাত্র ৪ দিনের মাথায় ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার ঐতিহাসিক এক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি মুক্ত হন, যা পরবর্তী সময়ে তাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসে এবং দেশের সার্বিক উন্নয়নে এক নতুন যুগের সূচনা করে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের অন্যতম শীর্ষ নেতা খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। কিন্তু মাত্র তিন মাসের মাথায় সৃষ্টি হয় এক অশান্ত পরিবেশ। তৎকালীন ঢাকা ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ৩ নভেম্বর এক সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানো হয়। তার নির্দেশে সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে তার বাসভবনে অবরুদ্ধ ও বন্দি করা হয়। খালেদ মোশাররফ ও তার অনুসারী কর্মকর্তারা সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড বা নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ নিজেদের হাতে নিতে চেয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান অস্বস্তিকর অবস্থা এড়াতে ও শৃঙ্খলা ফেরাতে কিছুটা ধৈর্য ধরার নীতি অবলম্বন করায়, খালেদ মোশাররফ তাকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে নিজে সেনাপ্রধান হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ৩ নভেম্বর অভ্যুত্থান ঘটিয়ে জিয়াউর রহমানকে পদত্যাগ ও বন্দি করতে বাধ্য করা হয়।

মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে এবং সম্মুখ সমরে সেক্টর ও ব্রিগেড (জেড-ফোর্স) কমান্ডার হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে সাধারণ সৈনিকদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের পর সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আশঙ্কার সৃষ্টি হয়। সাধারণ সিপাহীদের ধারণা হয়েছিল যে, এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে এবং ভারতের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। একই সময়ে জাসদপন্থি ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ এবং কর্নেল আবু তাহেরের (অব.) অনুসারী জওয়ানরা সেনানিবাসে লিফলেট বিতরণ ও প্রচারণা শুরু করেন। জিয়াউর রহমানের বন্দিত্বের খবর এবং দেশের সার্বভৌমত্ব সংকটে পড়ার আশঙ্কায় সাধারণ সিপাহীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে ওঠেন, যার ফলে ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি মাত্র কয়েক দিনে সম্পূর্ণ উল্টে যায়।

৭ নভেম্বর : সিপাহী-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লব ও মুক্তি : ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর মধ্যরাতে সেনানিবাসে ট্যাংকের গর্জন আর স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। সাধারণ সিপাহীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে রাস্তায় নেমে আসেন। বিদ্রোহী সৈনিকরা জিয়াউর রহমানের বাসভবনে খালেদ মোশাররফের সৈনিকদের পাহারা বেষ্টনী ভেঙে তাকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার ও মুক্ত করেন। মুক্ত হওয়ার পর তাকে টু-ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে সাধারণ সৈনিকরা তাকে বিপুল উল্লাসে বরণ করে নেন। সৈনিকদের এই বিদ্রোহের সঙ্গে যোগ দেন ঢাকার সাধারণ মানুষ। সিপাহী ও জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে নেমে আসেন এবং ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’, ‘সিপাহী-জনতা ভাই ভাই’, ‘জিয়া রহমান জিন্দাবাদ’ স্লোগানে পুরো শহর কাঁপিয়ে তোলেন। ৭ নভেম্বরের এই ঘটনাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে স্থান পায়।

মুক্তির পর জিয়াউর রহমান জাতির উদ্দেশ্যে এক ঐতিহাসিক রেডিও ভাষণ দেন, যেখানে তিনি দেশবাসীকে শান্ত থাকার এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। দ্রুতই তিনি সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড পুনর্বহাল করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে তিনি ভঙ্গুর ও বিশৃঙ্খল একটি দেশকে স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যান। তার শাসনামলে বাংলাদেশ এক সত্যিকারের স্বনির্ভর দেশ হিসেবে গড়ে ওঠে। একদলীয় বাকশালব্যবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করে তিনি বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন।

দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে দেশব্যাপী স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ঐতিহাসিক ‘খাল খনন কর্মসূচি’ শুরু করেন, যা কৃষিতে ব্যাপক ফলন এনে দেয়। তিনি উৎপাদনমুখী অর্থনীতি ও বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করেন, যা গার্মেন্টস শিল্প ও মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির মতো যুগান্তকারী খাতের ভিত্তি স্থাপন করেন। গ্রামীণ অর্থনীতি জোরদার করতে কুটির শিল্প ও ক্ষুদ্রঋণের প্রসার ঘটানো হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার জন্য তিনি সার্ক গঠনের স্বপ্নদ্রষ্টা ও উদ্যোক্তা ছিলেন এবং ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এই নীতিতে শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে তিনি গড়ে তোলেন বিশেষ ভ্রাতৃত্বমূলক সম্পর্ক। ৩ নভেম্বরের অন্ধকার ও বন্দিদশা কাটিয়ে ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমানের উত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ ঘুচিয়ে বাংলাদেশকে একটি আত্মমর্যাদাশীল ও স্বনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা