জিয়াউর রহমান কখন ও কেন প্রাসঙ্গিক

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৫০ এএম

২০০৯ সালের ৭ নভেম্বর ঢাকার একটি দৈনিকে ছাপা হওয়া আমার একটি নিবন্ধের শিরোনাম : ‘মৃত্যুর দুয়ার থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে’। সেই লেখায় আমি বলেছিলাম ১৯৭৫ সালের ২ নভেম্বর মধ্যরাতে, মানে ৩ নভেম্বর, একটি স্বল্পস্থায়ী সেনা অভ্যুত্থান ঘটে। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেটি ঘটে। এই সেনা গ্রুপটি অভ্যুত্থানের অংশ হিসেবে বঙ্গভবনের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তার বাসভবনে ‘গৃহবন্দি’ করে। জেনারেল জিয়ার কাছ থেকে তারা ‘সেনাপ্রধানের পদত্যাগপত্র’ গ্রহণ করে। টেলিফোনসহ সব যোগাযোগ থেকে জিয়াকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। ৬ নভেম্বর দিবাগত মধ্যরাতে, তথা ৭ নভেম্বর, আরেকটি সেনা অভ্যুত্থান ঘটে। এটি ঘটে ‘তিন নভেম্বরের পাল্টা হিসেবে’। তবে ওই অভ্যুত্থানের সঙ্গে ঢাকাবাসী ও দেশবাসীর ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল বলে দাবি করা হয়। তাই এই সেনা অভ্যুত্থানের নাম দেওয়া হয় ‘সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান’। এর সঙ্গে সক্রিয় সেনাদের দুটি গ্রুপে চিহ্নিত করা হয় ১. কর্নেল (অব.) তাহেরের সমর্থক ও নেতৃত্বাধীন ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’, ২. সাধারণ সৈনিক ও কর্মকর্তাদের ‘বাকশাল বিরোধী’ একটি ধারা। এই উভয় গ্রুপের সদস্যরা ‘গৃহবন্দি সেনাপ্রধান’ জিয়াকে মুক্ত করে এবং তাকে সেনাবাহিনীর কমান্ড ‘পুনরায় গ্রহণের’ দাবি জানায়। জেনারেল জিয়া তাদের দাবি মানেন এবং চরম অরাজক-বিশৃঙ্খল অবস্থাকে স্থিতিশীল-সুশৃঙ্খল করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ব্রিগেডিয়ার খালেদ-বিরোধী ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’র সদস্যরা তখন  ১২ জন সেনা কর্মকর্তাকে খুন করে। তাদের স্লোগান ছিল ‘সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই’।

জিয়াউর রহমান ‘কমান্ড’ গ্রহণ করেই ‘অফিসারদের রক্ত চাওয়া’ বন্ধ করেন কঠোর হস্তে। তা করা না হলে কিংবা তখন ‘একজন জিয়া না থাকলে’ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আরও গভীর সংকটে পড়তে পারত। আমার পর্যবেক্ষণ জেনারেল জিয়া স্পষ্টতই ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ঘটাননি, উল্টো, তিনি শিকার হন মৃত্যুঝুঁকিসহ গৃহবন্দিত্বের। জিয়া ৭ নভেম্বরের স্রষ্টাও নন। তিনি মৃত্যুঝুঁকিসহ ছিলেন গৃহবন্দি। জিয়াই বিবেচিত হন পুরো জাতির রক্ষক হিসেবে। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও অন্য সেনা কর্মকর্তারা মিলে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানকে পরাজিত করলেও উভয় পক্ষই বন্দি জিয়ার শরণাপন্ন হন। তাদের কাছে তখন নেতৃত্বের আরও কিছু স্পষ্ট  ছিল। তিনি তখন রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (সি এম এল এ, বাংলাদেশের প্রথম সিএমএলএ)। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে বাংলাদেশে পূর্ববর্তী জরুরি অবস্থার পাশাপাশি সামরিক শাসন জারি হয়। তবে সামরিক শাসনের প্রশাসনিক কাঠামো চালু হয়নি। খন্দকার মোশতাক আহমদ কেবল ‘রাষ্ট্রপতি’ ছিলেন। সেনা অভ্যুত্থানকারীরা তার নেতৃত্বে-কর্র্তৃত্বে আস্থা প্রকাশ করতে পারত। কিন্তু তারা তা করেনি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানী তখনো রাজধানী ও রাজনীতিতে সক্রিয়, পরিচিত ব্যক্তিত্ব। ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানকারীরা তার কাছে যেতে পারত। তাও তারা করেনি। কেন তা করেনি জানা নেই। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল (অব.) এম এ তাহের ওই সেনা অভ্যুত্থানের ‘নেতাই’ ছিলেন। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার স্লোগানে তাহেরকে ‘নেতা’ বলা হয়েছে। কিন্তু তাহেরকে কমান্ড গ্রহণের কথা তারা বলেনি। ডানে-বামে আরও কিছু নাম ছিল। কিন্তু কারও কাছে না গিয়ে বিপ্লবীরা এক অসহায় সেনাপ্রধান জিয়ার কাছেই গিয়েছিল এবং জেনারেল জিয়া তাদের সেই আস্থা-প্রত্যাশাকে রক্ষায় সক্ষমতার পরিচয় দেন ।

জিয়াউর রহমান একজন পেশাদার সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। ১৯৬৫-এর খেমকারান যুদ্ধে ভারতীয় পাঞ্জাবের তরন তরন জেলার পাত্তি তহসিলের এক ক্ষুদ্র জনপদ আলফা কোম্পানির নেতৃত্ব দিয়ে এবং তীব্র ভারতীয় আক্রমণ ঠেকিয়ে বীরত্বের পরিচয় দেন ক্যাপ্টেন জিয়া। স্বীকৃতি হিসেবে পান অন্যতম শীর্ষ সামরিক পদক হিলাল ই জুরাত। এরপর একাত্তরের মার্চ-ডিসেম্বর ও ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের ঘটনাবহুল প্রথম সপ্তাহ পেরিয়ে নিজেকে রাজনীতির কেন্দ্রে নেন জিয়া। একজন পেশাদার সৈনিক হঠাৎ নিজেকে দেশের রাজনীতির কেন্দ্রে আবিষ্কার করলে সেই সৈনিকের জন্য তা কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা তৈরি করবে তা-ই স্বাভাবিক। তবে ওই  নিকট অতীতের ঘটনা পরম্পরা দর্শকদের দেখায়, সৈনিক জিয়া থেকে রাজনীতিক জিয়া ম্লান হননি, বরং আরও উজ্জ্বল হয়েছেন। রাজনীতিতে জিয়ার উজ্জ্বলতার দিকগুলো দৃশ্যমান হয় তার রাজনৈতিক কার্যক্রমে আর ঘোষিত নীতিমালায়। ঘোষিত নীতিমালার লিখিত দলিল বিদ্যমান।

সৈনিক থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা জিয়া সম্ভাব্য দ্রুতই পুরো বেসামরিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হতে চেষ্টা করেছেন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে সম্মিলিত সেনা সমর্থনে তিনি সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেন। প্রথমে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক সিএমএলএ ঘোষণা করেন। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানের তিনি রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সায়েমকে সিএমএলএ হিসেবে স্বীকার করে নিজে ডিসিএমএলএ হন। নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রধানও ডিসিএমএলএ মর্যাদা পান। ১৯৭৭ সালের ৩ মে তিনি গণভোট আয়োজন করেন। ১৯৭৮ সালের শুরুর দিকে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠন করেন। জাগদল নামে দল গঠন করেন। ১৯৭৮ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রপতির নির্বাচন আয়োজন করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২৮ আগস্ট ১৯৭৮, জাগদল বিলুপ্ত করেন। ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ তারিখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি গঠন করেন। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের নির্বাচন আয়োজন করেন। এই দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের মাধ্যমে সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর আওতায় ১৯৭৫ সালের আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল তারিখ পর্যন্ত যাবতীয় কার্যক্রম অনুমোদন সম্পন্ন করে একই তারিখে অর্থাৎ ৬ এপ্রিল ১৯৭৯ তারিখে আরোপিত সামরিক আইন কাঠামো প্রত্যাহার করেন। এর মাধ্যমে জিয়া নিজে একজন পূর্ণ বেসামরিক ব্যক্তিতে পরিণত হন।

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়ায় জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি জাতীয় সমঝোতার পথ প্রশস্ত করেন। তিনি বিলুপ্ত আওয়ামী লীগের ফিরে আসার ব্যবস্থা করেন, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয়  হওয়ার পথ সুগম করেন। নিজের দল ও মন্ত্রিসভায় তিনি বাহ্যত আধিপত্যবাদবিরোধী প্রায় সব রাজনৈতিক নেতাকে স্থান দেন। তিনি ডান-বাম-মধ্যপন্থিদের নিজ দল বিএনপিতে গ্রহণের পাশাপাশি অগ্রসর ও মেধাবী পণ্ডিতদের পরামর্শ গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বরের সংবিধানে (১৬ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়) জাতীয় সংসদের সদস্য পদে পাঁচ বছরে একবার ভোট প্রদানের বাইরে নীতিনির্ধারণে ব্যক্তি নাগরিকের জন্য রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ ও প্রকাশের কোনে ব্যবস্থা রাখা হয়নি। স্পষ্টতই এটি ছিল নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার ও মালিকানার প্রতি এক নেতিবাচক আয়োজন। তা করেছিলেন বাংলাদেশের স্বীকৃত রাজনৈতিক নেতৃত্ব। বিপরীতে একজন সেনা কর্মকর্তা গণভোটের সাংবিধানিক স্বীকৃতির ব্যবস্থা করেন। তিনি নিজের রাজনৈতিক স্বীকৃতির জন্য এমন একটি গণভোটের (১৯৭৭ সালের ৩ মে) আয়োজন করেন। রাষ্ট্রীয় মূলনীতিসহ কয়েকটি সাংবিধানিক বিধানের সংশোধনের জন্য ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদে গণভোটের শর্ত সংযোজনের প্রস্তাব ও ব্যবস্থা  করেন।

একজন সেনাব্যক্তিত্ব হয়েও জিয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সারমর্মের যে বাস্তব প্রয়োগ করেন। দেশের দাবিকৃত গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারক ব্যক্তিরা বাস্তবে তা করতে ব্যর্থতার পরিচয় দেন। জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রশ্নে জিয়া স্বীকৃত বেসামরিক রাজনীতিকদের চাইতে এগিয়ে থাকার প্রমাণ দিয়েছেন। বাংলাদেশের গণমানুষের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বাহ্যত অবজ্ঞা করেই সংবিধানে ১৯৭২ সালে ৩টি রাষ্ট্রীয় মূলনীতি নির্ধারণ করা হয়। গণতন্ত্র বিষয়ে সাধারণ ঐকমত্য ছিল। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে কার্যত ইসলাম বিদ্বেষের বীজ রোপণ করা হয়, শর্তহীন সমাজতন্ত্র বিষয়ে জনমানসে গভীর অনীহা ও আপত্তি ছিল, বাঙালি জাতীয়তাবাদের সূত্রে বাংলাদেশ ভূখণ্ডকে কার্যত একটি বর্ণবাদী জনপদে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলে। রাজনীতিতে নবীন জিয়া এসব বিষয় অনুধাবন করেছিলেন। কয়েকজন অগ্রসর রাজনীতিবিদ জিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে নিয়ামকের ভূমিকা পালন করেন। অগ্রসর রাজনীতিক ও পেশাজীবীদের মাধ্যমে জিয়া এ বিষয়গুলো বুঝে নিয়ে রাষ্ট্রীয় মূলনীতিসহ সংবিধানের আরও কয়েকটি প্রশ্ন সংশোধনের উদ্যোগ নেন। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এগুলো সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে একটি বিশেষ নীতি গ্রহণ করেন জিয়া। মুসলিম দেশগুলোর  সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে হবে এদেশের নানামাত্রিক সুবিধার বিবেচনায়। বাস্তবে তিনি এ কাজ সম্পন্ন করেন। তাই জিয়ার নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শনের অংশ হিসেবে বিষয়টিকে বিবেচনায় নেওয়া যায়। জিয়ার ঘোষিত ১৯ দফা ছিল তার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি। ১৯ দফার ১৬ নম্বরে তিনি মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের অঙ্গীকার করেন।

১৯ দফার ১৭ নম্বর দফায় প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের অঙ্গীকার ছিল। বাংলাদেশের সব অঞ্চলের সুষম উন্নয়নের জন্য সেবাসহ অন্তত প্রশাসনিক বিভাগভিত্তিক বিকেন্দ্রীকরণের দায় রয়ে গেছে বলা চলে। তারেক রহমানের দায়িত্বাধীন বর্তমান নির্বাহী বিভাগ এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে মনোযোগী হতে পারে। বাংলাদেশের মাটি-মানুষের সঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক সৃষ্টি করেন। রাজনীতিকদের জন্য রাজনীতিকে কঠিন করার কথা বলে তিনি জনমুখী কার্যক্রমে রাজনীতিকদের নিষ্ঠাপূর্ণ ও সক্রিয় অংশগ্রহণের কথা বলেছিলেন বলে দাবি করা হয়। রাজনীতিকদের অঙ্গীকার-উচ্চারণের সঙ্গে  তাদের বাস্তব সক্রিয়তার ব্যবধানকে জিয়া গভীর নেতিবাচক বিষয় হিসেবে দেখেন। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক  অগ্রগতি-সমৃদ্ধির জন্য জিয়ার জনকল্যাণকামী রাজনৈতিক দর্শন সর্বদা প্রাসঙ্গিক থাকবে।

লেখক : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজনীতি-সমাজ  বিশ্লেষক। ‘বাংলাদেশ শহীদ ১৯৭১’ শীর্ষক ঐতিহাসিক সংকলনের সম্পাদক ও  নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিটিক্যাল স্টাডিজ (সিপিএসবি)

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত