সিলেট টেস্টের তৃতীয় দিনের পুরোটাই ছিল বাংলাদেশের। আরও একটু সহজ করে বললে দিনটা ছিল তাওহীদ হৃদয়ের। একপ্রান্তে যখন চলছিল উইকেটের মিছিল সেখানে অন্যপ্রান্তে একের পর এক রেকর্ড গড়ে গেছেন এই ডানহাতি ব্যাটার। এক সময়ে উইন্ডিজ ইনিংসের কাছাকাছি যাওয়াটাও যখন ছিল চ্যালেঞ্জ, সেই চ্যালেঞ্জ জিতে দলকে এনে দিয়েছেন লিড। কেবল তৃতীয় টেস্ট খেলতে নেমেই করলেন প্রথম সেঞ্চুরি। পরে প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার হিসেবে সেই প্রথম সেঞ্চুরিকে রুপ দিয়েছেন ডাবল সেঞ্চুরিতে। এরপর ছাড়িয়ে গেছেন এতোদিন টেস্টে এক ইনিংসে সবচেয়ে বেশি রানের মুশফিকের রেকর্ডটাও, মেরেছেন সবচেয়ে বেশি ছক্কাও। কোনো ব্যাটাররের এক ইনিংসে যখন এতোসব কীর্তি তখন দিনটাও তো আক্ষরিক অর্থে তারই।
সারাদিন বল করেও হৃদয়কে আউট করতে পারেননি উইন্ডিজ বোলাররা। ৩৫৯ বলে ২২ চার আর রেকর্ড ১১ ছক্কায় অপরাজিত ছিলেন ২৪২ রানে। ১১২তম ওভারে পঞ্চম বলে তাসকিন নবম ব্যাটার হিসেবে আউট হলে ৩৮৬ রানে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে। কারণ গতকাল চোট পাওয়ার এই ইনিংসে ব্যাট করতে পারেননি সাদমান ইসলাম। অবশ্য এই টেস্টসহ আসন্ন দক্ষিণ আফ্রিকা সফর থেকেও ছিটকে যাওয়ার সম্ভাবনা আছেন তার।
দিনের বাকি সময়ে নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে কেবল ৪ ওভার ব্যাট করেছে সফরকারীরা ব্যাটাররা। সেখানে বিনা উইকেটে তাদের সংগ্রহ ৭ রান। এতে লিডটা এখনো বাংলাদেশের কাছেই, ২৩ রানের।
এতক্ষণ যখন চলল হৃদয়ের হৃদয়জুড়ানো গল্প, তখন দিনের শুরুর গল্পটা মোটেও এমন ছিল না। সকালের সেশনে মুশফিকুর রহিম (৩৪) ও লিটন দাস (৮) একই কায়দায় উইন্ডিজ স্পিনার জোমেল ওয়ারিক্যানের শিকারে পরিণত হলে দ্রুতই ৫ উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়ে দল। এরপর মেহেদী হাসান মিরাজ (১৬) ও হাসান মাহমুদও সাজঘরে ফিরলে দলের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২০০ পার করা নিয়েই সংশয়।
কিন্তু সেই বিপর্যয়ের মাঝেও একপ্রান্ত আগলে রেখে ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি তুলে নেন হৃদয়। মাঝে ৮৫তম ওভারে সিলসের একটি বাউন্সার সোজা গিয়ে আঘাত করে তাঁর পাঁজরে। শঙ্কা জেগেছিল চোটের। এমনিতেই চোটের কারণে সাদমান ছাড়াই ১০ ব্যাটার নিয়ে খেলতে হচ্ছে শান্তদের। অবশ্য হৃদয়ের জন্য তেমন কোনো শঙ্কা জাগেনি। মাটিতে লুটিয়ে পড়েও ফিজিওর শুশ্রূষা নিয়েই ফের নামেন ব্যাটে।
তাইজুল ইসলামকে (২২) সঙ্গে নিয়ে অষ্টম উইকেটে ১১৭ রানের দুর্দান্ত এক প্রতিরোধ গড়েন। তাইজুল ৫৬ বলে ২ রান ফিরলেও হৃদয় ছিলেন অবিচল। আর গড়তে থাকেন একের পর এক রেকর্ড। দেড়শ রান পেরিয়ে তিনি পেছনে ফেলেন ২০১৩ সালে মুমিনুল হকের গড়া ১৮১ রানের রেকর্ড (টেস্ট অভিষেকে বা প্রথম সেঞ্চুরিতে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রান)।
এখানেই থামেননি তিনি; জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২০১৮ সালে মুশফিকের করা ২১৯ রানের ঐতিহাসিক ইনিংস টপকে টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের নতুন রেকর্ডটাও গড়েন তিনি। এছাড়া ইনিংসে ১১টি ছক্কা হাঁকিয়ে টেস্ট এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ডও নিজের করে নেন এই ব্যাটার। আগে ৭ ছক্কায় যেই রেকর্ড ছিল তামিম ইকবালের।
সব মিলিয়ে একে একে মুমিনুল, তামিম, মুশফিক সবাইকে ছাড়িয়ে টেস্টে ব্যাট হাতে দেশের হয়ে সেরাদের সেরা বনে গেছেন তিনি। তবে এমন কীর্তি করার আগে দুই টেস্টে চার ইনিংসে তার রান ছিল কেবল ৫৪। সেখানে তৃতীয় টেস্টে নেমে খেললেন অপরাজিত ২৪২ রানের ঐতিহাসিক এই ইনিংস।
এর আগে নিজেদের প্রথম ইনিংসে আমির জাঙ্গুর সেঞ্চুরিতে চড়ে ৩৫৬ রান তুলেছিল সফরকারীরা। জবাবে ব্যাট করতে নেমে ৫১ রানেই সাজঘরে ফিরেছিলেন নাঈম, তানজিদ, শান্তরা। পরে মিডল অর্ডাররা ব্যাটারও ছিলেন ব্যর্থ। তবে হৃদয়ের সেই ইনিংস আর টেল এন্ডে তাইজুল-তাসকিনে দিন শেষে স্বস্তি বাংলাদেশেরই।