দ্য স্ট্রেঞ্জার প্রথম পড়তে গিয়ে প্রথম প্যারাতেই থমকে যেতে হয়। কিছুটা বিরতি দিয়ে আবার পড়া শুরু করতে হয়েছিল। সহপাঠীদের মধ্যে উপন্যাসের শুরুটা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছিল। গল্পের শুরুতেই মৃত্যুর সংবাদ—এমন গল্প আগে পড়া হয়নি। যদিও হ্যামলেট নাটকে যুবরাজ হ্যামলেটের সঙ্গে বাবার প্রেতাত্মার দেখা হলে শুরুতেই জানা যায়, তার বাবা মারা গেছেন এবং তাকে খুন করা হয়েছে। কিন্তু সেই তথ্য জানার পর হ্যামলেটের প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক মনে হলেও দ্য স্ট্রেঞ্জার-এ মায়ের মৃত্যুর সংবাদে ছেলে ম্যোরসোর প্রতিক্রিয়া তেমন মনে হয় না। এ কারণেই বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়। এরপর মায়ের মৃত্যুর প্রসঙ্গ প্রায় ভুলে গিয়ে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হয় ছেলেটির ওপর, তার নির্লিপ্ততা নিয়ে ভাবনা শুরু হয়।
উপন্যাসটি পড়তে পড়তে প্রায় সব চিন্তাই ম্যোরসোকে কেন্দ্র করে এগোয়। তার নির্লিপ্ততা, কোনো রাখঢাক না রেখে সত্য বলার অদ্ভুত ক্ষমতা, মারীর সঙ্গে সম্পর্ক, অচেনা ও নাম না জানা এক আরব যুবককে হত্যা, আদালতের বিচার এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার উপলব্ধি—সবকিছুই তাকে ঘিরে।
তবে উপন্যাসের শুরুতেই যিনি মারা যান, যাকে খুব দ্রুতই পার্শ্বচরিত্র ভেবে ভুলে যাওয়া হয়, তিনি আসলে সারাক্ষণ পাঠকের সঙ্গে থাকেন। ম্যোরসোর মনেও তার উপস্থিতি থেকে যায়। উপন্যাসে মায়ের চেহারার কোনো বর্ণনা নেই, তার কোনো সংলাপ বা উক্তিও নেই। তার নিজের সম্পর্কে জানার সুযোগও সীমিত। তবে কথক ও অন্যান্য চরিত্রের বয়ানে ম্যোরসোর মা, মাদাম ম্যোরসোকে অনেকটা চিনে নেওয়া যায়।
উপন্যাসে মা চরিত্রটি না থাকলে কী হতো? মারী আছে, রেমন্ড আছে, সেলেস্ত আছে, সমুদ্র আছে, চোখ ও শরীর ধাঁধানো সেই সূর্য আছে। ম্যোরসোর গুলি করার ঘটনাটিও আছে এবং সে কারণে আদালত তার বিচারও করছে।
গল্পটি কি তখনো এমন হতো? না, একেবারেই তা হতো না।
মাদাম ম্যোরসোর মৃত্যুর মধ্য দিয়েই কামু ম্যোরসোকে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। সেই বিখ্যাত বাক্য—‘মা আজ মারা গেছে, হয়তো গতকাল, আমি জানি না।’ ম্যোরসো নিশ্চিত নয়, নিশ্চিত হতেও চায় না। মায়ের মৃত্যুকে সে নেয় নিতান্ত একটি ঘটনা হিসেবে। মৃত্যু যেন জীবনের চলমান স্বাভাবিকতারই অংশ। পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগে—এ কেমন ছেলে? মায়ের মৃত্যুর খবর জানার আগ্রহ নেই, মন খারাপও হয় না!
এরপর সে নার্সিং হোমে যায়। সেখানে মায়ের কফিনের পাশে বসেও কান্নাকাটি করে না। কফিন খুলে শেষবার মায়ের মুখও দেখতে চায় না। বরং গরমে অস্বস্তি বোধ করে, আলোর উজ্জ্বলতা সহ্য করতে পারে না, ঘুম পায়, কফি পান করে, সিগারেট খায়।
পাঠকের অস্বস্তির পাশাপাশি কৌতূহলও বাড়তে থাকে। এই পর্যায়ে বোঝা যায় না, কামু খুব সন্তর্পণে পাঠককেও বিচারের আসনে বসিয়ে দিয়েছেন। পাঠকই ম্যোরসোর বিচার করতে শুরু করে। ধরে নেয়, সন্তান মাকে ভালোবাসলে তার মৃত্যুতে কাঁদবে। শোকের ছাপ তার চেহারায় থাকতেই হবে, আচরণেও থাকতে হবে শোকের সামাজিকভাবে স্বীকৃত প্রকাশ।
ম্যোরসো সেই রীতি মানেনি।
এই পর্যায়েই মাদাম ম্যোরসো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। মৃত মা যেন সন্তানের মানবিকতা মাপার সামাজিক মাপকাঠিতে পরিণত হন। উপন্যাসের অনেক পরে যখন ম্যোরসোর বিচার শুরু হয়, তখনো এই মৃত মা বারবার ফিরে আসেন।
আদালতের বিচার করার কথা একটি হত্যাকাণ্ডের। কিন্তু তাদের আগ্রহ হত্যাকাণ্ডের চেয়েও বেশি অন্য বিষয়ে—মায়ের মৃত্যুর পর ম্যোরসো কেঁদেছিল কি না, কফিতে দুধ মিশিয়েছিল কি না, কফিনের পাশে বসে সিগারেট টেনেছিল কি না, পরদিন মারীর সঙ্গে সাঁতার কাটতে গিয়েছিল কি না। ম্যোরসো একজন মানুষকে খুন করেছে, কিন্তু হত্যাকাণ্ডের চেয়ে আদালতের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষটি কেমন। আর তা বোঝার জন্য আদালত ও সমাজ ফিরে যায় তার মায়ের কাছে, মায়ের মৃত্যুতে সে কেঁদেছিল কি না, সেই প্রশ্নে। যে সন্তান মায়ের মৃত্যুতে কাঁদে না, তার যেন ক্ষমা নেই।
এখানেই কামু একটি জটিল প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসেন। সমাজ কি মানুষের অপরাধের বিচার করে, নাকি অপরাধের চেয়ে তার আবেগের বিচারই বেশি করে? কেউ যদি অন্য কারও মৃত্যুকে মানবজীবনের স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হিসেবে মেনে নেয় এবং শোকের সময়ে না কাঁদে, তাহলে কি ধরে নিতে হবে সে মৃত ব্যক্তিকে পছন্দ করত না, ভালোবাসত না?
ম্যোরসো চরিত্রটির বড় সমস্যা সম্ভবত এখানেই। সে অনুভূতিহীন নয়। কিন্তু যে অনুভূতির প্রকাশ তার মধ্যে নেই, তার অভিনয় সে করতে পারে না—লোকলজ্জার কারণেও নয়। সমাজের সঙ্গে তার বিরোধের জায়গাটি এখানেই। সামাজিক জীবনে অভিনয়ের শেষ নেই। কোথায়, কার সঙ্গে হেসে কথা বলতে হবে, কার সঙ্গে গম্ভীর হতে হবে, কখন সমবেদনা জানাতে হবে, কখন বলতে হবে ‘আমি তোমায় ভালোবাসি’—এসব করতে করতে মানুষ সংগতিপূর্ণ ভাষা ও শব্দ শিখে ফেলে।
ম্যোরসো সেই ভাষায় কথা বলতে পারে না, কিংবা চায় না। এটা কি তার দুর্বলতা? পাঠকের চোখে দুর্বলতা মনে হতে পারে। আর ঠিক এই বিষয়টি বুঝেই সমাজ তার মৃত মাকে তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সাক্ষী হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়।
তাহলে কি সমাজ ও আদালতের মতো পাঠককেও ধরে নিতে হবে, ম্যোরসো সত্যিই মাকে ভালোবাসত না? উপন্যাসটি মনোযোগ দিয়ে পড়লে উত্তরটি এত সহজ মনে হয় না। মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের ধরন বোঝা যায়। তাদের সম্পর্ক আবেগঘন মা-ছেলের সম্পর্ক নয়। ম্যোরসো মাকে নার্সিং হোমে রেখে এসেছিল, কারণ মায়ের দেখভাল করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না; আয়-রোজগারেও কুলোচ্ছিল না। সে মাকে খুব একটা দেখতেও যেত না। মায়ের মৃত্যুতে প্রকাশ্যে ভেঙেও পড়েনি।
কিন্তু এসব প্রকাশভঙ্গি কি ভালোবাসার অভাবের প্রমাণ? ম্যোরসোর ভালোবাসা প্রকাশের ধরন কি অন্যরকম হতে পারে না? মায়ের নার্সিং হোমের জীবনযাত্রাকে সে মেনে নিয়েছিল। বৃদ্ধ বয়সে মা যে নতুন একজন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন, সঙ্গ পেয়েছেন, নিজের মতো করে আবার জীবন শুরু করতে চেয়েছেন—এসব নিয়ে ম্যোরসোর কোনো আপত্তি দেখা যায় না। বরং সে খুশিই হয়েছিল। মায়েরও যে আলাদা একটি জীবন আছে, থাকতে পারে, নিজের আনন্দ ও সুখ আছে, নিজের মতো করে বেঁচে থাকার অধিকার আছে—ম্যোরসো তা মেনে নিয়েছিল।
এখানে মা ও ছেলের মধ্যে একটি অদ্ভুত মিল লক্ষ করা যায়। মাদাম ম্যোরসো জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নতুন করে জীবন শুরু করার কথা ভেবেছিলেন। ওল্ড হোম মানেই শুধু মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা নয়। সেখানেও বন্ধুত্ব হয়, সঙ্গী তৈরি হয়। সেই সঙ্গীর সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করতে ইচ্ছে হয়, তার পাশে বসে বিকেলের আলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে, কথা বলতে ইচ্ছে করে। মাদাম ম্যোরসোর জীবনের এই অধ্যায়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ উপন্যাসের শেষে ম্যোরসোর নিজেরও প্রায় একই উপলব্ধি হয়।
তখন সে কারাগারে। সামনে মৃত্যু কড়া নাড়ছে। এই পৃথিবীর সঙ্গে তার সম্পর্ক প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। মারী অনেক দূরে, তার সঙ্গে দেখা করতেও আর আসে না। ম্যোরসোর কাছে কোনো সমুদ্র নেই, সিগারেট নেই, কোনো ভবিষ্যৎও নেই। আছে শুধু অপেক্ষা—মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা। ঠিক এই মুহূর্তে তার মায়ের কথা মনে পড়ে। প্রথমবারের মতো সে মাকে বুঝতে শুরু করে। মা কেন নতুন করে বাঁচতে চেয়েছিলেন, তা উপলব্ধি করতে পারে।
মৃত্যুর খুব কাছে পৌঁছে গেলে হয়তো মানুষ জীবনকে আরও বেশি ভালোবাসতে শেখে। ম্যোরসো সম্ভবত বুঝতে পারে, মা মৃত্যুকে মেনে নিয়ে, মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করেও জীবনকে দূরে ঠেলে দেননি। এ সময়ে ম্যোরসো মায়ের মনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
মা তখন মৃত। ছেলেও মৃত্যুর অপেক্ষায়। আর ঠিক তখনই তারা যেন পরস্পরকে সবচেয়ে বেশি বুঝতে পারে। মা মারা যাওয়ার সময় ম্যোরসো তাকে যতটা বুঝেছিল, নিজের মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার চেয়ে অনেক বেশি বুঝতে পেরেছিল। আর এসব কারণেই মাদাম ম্যোরসোকে শেষ পর্যন্ত দ্য স্ট্রেঞ্জার-এর পার্শ্বচরিত্র হয়ে থাকেন না। তিনি নেই, অথচ উপন্যাসজুড়েই আছেন।
কামুর গল্প বলার সৌন্দর্য এখানেই।