রিমান্ডে দীপের দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখছে তদন্ত সংস্থা

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কেএম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তার আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কয়েক দফায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে তদন্ত সংস্থা। তবে সেসব তথ্যের বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তদন্তের স্বার্থে তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

গতকাল শনিবার দীপকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মনিরুল ইসলাম। রিমান্ড শেষে তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও নৌপুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন।

তদন্ত কর্মকর্তা আবেদনে উল্লেখ করেন, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ মামলার ঘটনা সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তবে তিনি অত্যন্ত কৌশলী প্রকৃতির হওয়ায় একাধিক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেছেন এবং কিছু বিষয়ে নীরবতা পালন করেছেন। তার দেওয়া তথ্যগুলো যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে সেগুলো এখনই প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, তাহসিফের মৃত্যুর আগের কয়েক ঘণ্টার চলাফেরা, তার সঙ্গে দীপ ও জেরিকা তাসনীম দিশার যোগাযোগ এবং টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যাওয়ার বিষয়টি তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের কললিস্ট এবং বিভিন্ন ব্যক্তির দেওয়া তথ্য মিলিয়ে ঘটনার আগের সময়ের একটি ধারাবাহিক চিত্র তৈরির চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।

তদন্তের শুরুতে দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।

তদন্তে উঠে এসেছে, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় তাহসিফকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে বের হন দীপ। এরপর তারা বিভিন্ন স্থানে ঘোরাফেরা করেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন তাহসিফের পরিচিত জেরিকা তাসনীম দিশাও। একপর্যায়ে দিশা বাসায় ফিরে যান। পরে গভীর রাতে দীপ ও তাহসিফ টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান।

দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা ওই বস্তির ভেতর দিয়ে হেঁটে তুরাগ নদের পাশের একটি মাঠের দিকে যান। সেখানে কয়েকজন লোককে দেখে দুজন আলাদা হয়ে যান। দীপ দাবি করেন, পুলিশের পোশাক পরা দুই ব্যক্তিকে দেখে তারা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। পরে তিনি নদীর তীরে একটি স্থানে আশ্রয় নেন। ওই ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলার পর তাকে চলে যেতে বলা হয়। এরপর তাহসিফের সঙ্গে তার আর দেখা হয়নি বলে দাবি করেন দীপ।

তবে তার এই বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনার সময় ও পরবর্তী যোগাযোগের তথ্য মিলিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। বিশেষ করে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, মোবাইল ফোনের অবস্থান এবং দীপের বাসায় ফেরার সময় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্যানুযায়ী, ওই রাতে ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ তার মায়ের মোবাইল ফোনে একটি ভয়েস বার্তা পাঠিয়ে বাসায় ফেরার কথা জানান। এর ৪ মিনিট পর রাত ১টা ৩৯ মিনিটে দীপ মোহাম্মদপুরে তাদের বাসার দারোয়ানকে ফোন করে বাসায় ফিরতে দেরি হওয়ার কথা জানান। পরে রাত আড়াইটার দিকে বাসায় ফেরেন দীপ। এ সময়ের মধ্যে কী ঘটেছিল, তা জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।

এদিকে তাহসিফের সঙ্গে দীপ ও দিশার চলাফেরার বিষয়ে বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তদন্ত কর্মকর্তার আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৃত্যুর আগে সর্বশেষ তাহসিফকে দীপ ও দিশার সঙ্গে দেখা গেছে। তাদের একসঙ্গে বিভিন্ন স্থানে ঘোরাফেরা ও রেস্তোরাঁয় যাওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। মোবাইল ফোনের কললিস্টসহ অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে মামলায় তাদের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি করেছে পুলিশ।

তদন্তকারীদের কাছে দীপের দেওয়া বক্তব্য এবং দিশার বক্তব্যের মধ্যে মিল-অমিল খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুজনকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদও করেছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের কললিস্ট এবং অন্যান্য আলামত মিলিয়ে দেখার কাজ চলছে।