৩০ বছরেও ভোলায় গড়ে ওঠেনি গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানা

প্রাকৃতিক গ্যাসের বিপুল মজুদ, অথচ শিল্পায়নে পিছিয়ে দ্বীপজেলা ভোলা। তিন দশক আগে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পরও জেলাটিতে গড়ে ওঠেনি গ্যাসভিত্তিক শিল্পকারখানা। সারকারখানা, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের নানা আশ্বাস মিললেও বাস্তবায়ন হয়েছে সামান্যই। এমন পরিস্থিতিতে ভোলায় শিল্পপার্ক স্থাপনে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি নয়, এবার ঘোষণার বাস্তবায়ন দেখতে চান জেলাবাসী।

১৯৯৫ সালে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)। এ গ্যাসক্ষেত্রে মজুদ রয়েছে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস। আবিষ্কারের প্রায় ১৪ বছর পর ২০০৯ সালে শুরু হয় বাণিজ্যিক উত্তোলন। এ ছাড়া ২০১৮ সালে ভোলা নর্থ এবং ২০২৩ সালে ইলিশা-১ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। তবে এসব গ্যাসসম্পদের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করে বৃহৎ শিল্পায়নের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো বাস্তব রূপ পায়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত সরকারের সময়ে সারকারখানা, অর্থনৈতিক অঞ্চল, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) ও এলএনজি স্থাপনা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। বিভিন্ন সময়ে উদ্যোক্তারা আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত প্রায় কোনো উদ্যোগই বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে প্রাকৃতিক সম্পদ থাকার পরও জেলাবাসীর কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

গত ২৯ জুন জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভোলায় শিল্পপার্ক স্থাপনের  ঘোষণা দেন। এ ঘোষণাকে ঘিরে নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এর ধারাবাহিকতায় গত ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে সারকারখানা ও ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানান। ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে পাইপলাইনের মাধ্যমে নিতে প্রায় সাত বছর লাগতে পারে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী স্থানীয়ভাবে এ সম্পদ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন। ফলে ভোলায় গ্যাসভিত্তিক শিল্পায়নের সম্ভাবনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ভোলা জেলা শাখার সভাপতি  মো. সোলাইমান বলেন, এখানে শিল্পকারখানা স্থাপনের অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। অতীতেও অনেক উদ্যোক্তা এখানে এসেছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।

স্থানীয় কলেজ শিক্ষক মো. জুয়েল বলেন, গত ১৭ বছর অর্থনৈতিক অঞ্চল ও কলকারখানা স্থাপনের আশ্বাস শুনেছি। বিভিন্ন সময়ে কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শন করেছেন, উদ্যোক্তারাও আগ্রহ দেখিয়েছেন; কিন্তু বাস্তবে শিল্পায়নের নামে হয়নি কিছুই।  ভোলা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক গোলাম নবী আলমগীর বলেন, ভোলার গ্যাস বরিশাল পর্যন্ত নিতে প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এ অর্থ ব্যয়ের পরিবর্তে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে ভোলাকে গুরুত্ব দেওয়া হলে স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও উপকৃত হবে। তিনি বলেন, এখানে সারকারখানা, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, ইপিজেড, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন গ্যাসভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু স্থানীয় নয়, জাতীয় অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদস্য সচিব ও প্রবীণ ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম খান বলেন, প্রাকৃতিক সম্পদের তুলনায় উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে ভোলা পিছিয়ে রয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তনে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

জেলা প্রশাসক ডা. শামিম রহমান বলেন, গ্যাসভিত্তিক উন্নয়ন ভোলাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। এখানে ছোট ও ভারী দুই ধরনের শিল্প স্থাপনেরই সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

 ভোলাবাসীর প্রত্যাশা, পরিকল্পিত শিল্পায়নের মাধ্যমে গ্যাসসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতের মাধ্যমে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ। তারা বলছেন, প্রতিশ্রুতি  নয়, এবার চাই বাস্তব উদ্যোগ ও দৃশ্যমান অগ্রগতি।