রান্নায় বহুল ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল ও রান্নার পাত্র থেকে খাবারে মারাত্মক বিষাক্ত সীসা বা লেড মিশে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে এক গবেষণায়। খবর বিবিসি বাংলার।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এবং যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র, বিশেষ করে নতুন পাত্র ব্যবহারের প্রথম দিকে খাবারে অতিরিক্ত মাত্রায় সীসা ছড়িয়ে পড়ে। স্বাস্থ্যঝুঁকির এই ভয়াবহ দিকটি সামনে আসার পর জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র থেকে লেড বা সীসা সহজেই খাবারে মিশে যায়। এই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা মাথায় রেখে দীর্ঘদিন ধরেই অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র ব্যবহার না করার জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, 'অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র থেকে লেড বা সীসা মিশে বলেই অনেক দিন ধরেই অ্যালুমিনিয়াম পাত্র ব্যবহার না করার জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।'
তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশের অসংখ্য গৃহস্থালি ও খাবারের দোকানে রান্নার জন্য অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি হাঁড়ি-পাতিলসহ বিভিন্ন দ্রব্য ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়ে আসছে।
আইসিডিডিআর,বি ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্র থেকে রান্নার সময় খাবারে সীসা মিশতে পারে। বিশেষ করে একটি নতুন পাত্র যখন বাজারে আসে এবং তা প্রথম কয়েকবার ব্যবহার করা হয়, তখন খাবারে সীসার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় বলে আইসিডিডিআর,বির বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়, বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে পুরনো অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিলের পরিবর্তে নতুন পাত্র নেওয়া কিংবা পুরনো কাপড়ের সাথে এ ধরনের পাত্র বিনিময়ের একটি প্রচলিত সংস্কৃতি রয়েছে। কিন্তু গবেষণার ফল বলছে, নতুন বা দেখতে চকচকে হলেই একটি রান্নার পাত্র নিরাপদ হবে এমন ভাবার কোনো সুযোগ নেই। স্থানীয়ভাবে তৈরি অনেক অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র পুরনো স্ক্র্যাপ ধাতু গলিয়ে পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। এসব কাঁচামাল বা ধাতু ঠিকভাবে পরীক্ষা না করলে প্রস্তুতকৃত পাত্রে সীসা স্থায়ীভাবে থেকে যেতে পারে।
কারখানাগুলোতে স্ক্র্যাপ ধাতু যথাযথভাবে পরীক্ষা করার কোনো ব্যবস্থা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে গবেষক হারুনুর রশিদ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, 'নাহ, এমন যাচাইয়ের কোনো প্রক্রিয়া নেই। অ্যালুমিনিয়াম মেটাল রিসাইকেল করা হয়। লেড বা ক্ষতিকর কিছু আছে কি না তা যাচাইয়ের কোনো সিস্টেম নাই।'
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম অ্যালুমিনিয়াম শিল্প মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি একরামুল হক গণমাধ্যমকে জানান, বড় কিছু স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদনে গুণগত মান যাচাই করে থাকে। কিন্তু দেশের বহু প্রতিষ্ঠান অ্যালুমিনিয়াম তৈরিতে জাহাজের ক্ষতিকর স্ক্র্যাপ ব্যবহার করে থাকে। ছোট অনেক প্রতিষ্ঠান কোনো ধরনের নিয়ম-কানুন বা প্রটোকল মেইনটেইন করে না। এগুলোর খোঁজখবর নেওয়ার বা তদারকি করারও কেউ নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রান্নার পাত্রে সীসার মতো বিষাক্ত ভারী ধাতু থাকার ফলে তা নিয়মিত খাবারের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে স্নায়ুবিক জটিলতা, কিডনির ক্ষতি, মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হওয়া এবং ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও বেশি ভয়াবহ হতে পারে।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সচেতনতামূলক প্রচারণা চালিয়ে এই সংকট থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। এর জন্য শিল্প কারখানায় কাঁচামাল সংগ্রহ, স্ক্র্যাপ রিসাইক্লিং এবং মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইনি কাঠামো ও তদারকি বাড়াতে হবে।
একই সাথে ভোক্তাদেরও অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রের মোহ ত্যাগ করে মানসম্মত স্টেইনলেস স্টিল বা সিরামিকের নিরাপদ পাত্র ব্যবহারে অভ্যস্ত হতে হবে।